গত এক বছরে সবচেয়ে বড় বিস্ময় হলো বিশ্বজুড়ে শেয়ারের দাম দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিয়ে খুব কমই চিন্তিত। শুধু এপ্রিলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘স্বাধীনতা দিবসে’ শুল্ক ঘোষণার পর অল্প সময়ের জন্য ভয় দেখা দিয়েছিল। এখন প্রশ্ন হলো, ২০২৬ সালে কি এ অবস্থা কাটবে?

টানা তিন বছর অস্বাভাবিক উচ্চ মুনাফার পর বাজারে সাধারণত ধসের আশঙ্কা বাড়ে। কারণ দীর্ঘ উচ্ছ্বাসের পর প্রায়ই আসে পতন। এআই অনেক সম্ভাবনাময়। কমপক্ষে কোম্পানিগুলোর জন্য। কিন্তু কর্মীদের জন্য সব সময় নয়। কিন্তু ইতিহাস বলে, বড় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে বুম ও ধস দুটোই আসে। রেলপথ, গাড়ির ইঞ্জিন, ইন্টারনেট—সব ক্ষেত্রেই তাই হয়েছে। শুরুর দিকের অনেক প্রতিষ্ঠান ভয়াবহভাবে ধসে পড়ে। পরে আসে নতুন প্রজন্মের কোম্পানি যারা কাজটা ঠিকভাবে করে। কিছু প্রতিষ্ঠান প্রভাবশালী হয়, যেমন একসময় কম্পিউটিংয়ে আইবিএম। কিন্তু তাতেও অনিশ্চয়তা কমে না। কারণ দীর্ঘস্থায়িত্বের কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এআই প্রযুক্তি অর্থনীতি ও মুনাফায় কী প্রভাব ফেলবে—এটা বোঝা বিনিয়োগকারীদের জন্য কঠিন। এ অনিশ্চয়তার কারণে আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে ধসের ঝুঁকি বেশ বেশি। তাই বলে শেয়ার কি এখনই বিক্রি করে দেয়া উচিত? অবশ্যই না। কারণ সতর্কসংকেত জ্বলার পরও শেয়ারের দাম অনেক দিন বাড়তে পারে। ১৯৯৬ সালে এমনটাই হয়েছিল। তখন ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান অ্যালান গ্রিনস্প্যান ‘অযৌক্তিক উচ্ছ্বাস’-এর কথা বলেন। তিনি ভবিষ্যৎ নোবেলজয়ী রবার্ট শিলারের গবেষণার ওপর ভর করেছিলেন। গ্রিনস্প্যান ও শিলারের কথা শেষ পর্যন্ত সঠিকই প্রমাণিত হয়েছিল, কিন্তু তাদের সময় নির্ধারণে ভুল ছিল: ডটকম বুদ্বুদটি (ইন্টারনেট কোম্পানির শেয়ারের কৃত্রিমভাবে ফুলে ওঠা দাম) ২০০০ সালের মার্চ পর্যন্ত ফাটেনি। তার আগেই শেয়ারবাজারের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গিয়েছিল।

এখনো একই ঘটনা ঘটতে পারে। তবে ২০২৬-এর দিকে যেতে যেতে চাপগুলো উপেক্ষা করা কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও ইউরোপের পূর্ব সীমান্তে উত্তেজনা থাকবে। এটি বহু বছর চলতে পারে। এদিকে চীন খুব দ্রুত নৌবাহিনী শক্তিশালী করছে। যুক্তরাষ্ট্র যত ড্রোনই কেনার পরিকল্পনা করুক—সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, চীন সম্ভবত এক মিলিয়ন বা আরো বেশি উন্নত ড্রোন তৈরি করবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে প্রত্যাবর্তন গভীরভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তার স্বাস্থ্যগত কোনো অসুবিধা না হলে ২০২৬ সালেও তিনি ২০২৫ সালের মতোই সমানভাবে উচ্চাভিলাষী—অথবা কারো মতে, সমানভাবে কঠোর ও একচেটিয়া হতে পারেন।

ট্রাম্পের পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নিজেকে রুজভেল্টের মতো রূপান্তরমুখী নেতা বললেও তার গৃহীত অর্থনৈতিক নীতিগুলো ছিল মোটামুটি পূর্বানুমেয়; খোলা সীমান্ত নীতি বাদ দিলে তার সময়ের মূল বিতর্ক ছিল এসব নীতি প্রবৃদ্ধি বাড়াবে নাকি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে—এসব নিয়ে।

এর বিপরীতে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রতিটি দিনই নিয়ে আসে নতুন চমক, যা দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত অস্থিরতার মঞ্চ তৈরি করছে। এ অনিশ্চয়তাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে জেরোম পাওয়েলের মেয়াদের অবসান। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি থাকলেও তিনি আশা করেন পাওয়েলের উত্তরসূরি সুদের হার কমাবেন।

২০২৫ সালে বাজারের অস্থিরতা থেকে মুনাফা করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কারণ ঝুঁকি কমানোর দাবি করা অনেক বিনিয়োগ পণ্যই কাজে আসেনি বা সফল হয়নি। ২০২৬ সালটি আরো অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ও শেয়ারবাজারের মূল্যায়ন ক্রমেই অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তির সঙ্গে বেমানান হয়ে পড়ছে।

এছাড়া ট্রাম্পের শুল্ক ও অভিবাসন নীতির নেতিবাচক প্রভাব ২০২৬ সালে আরো তীব্রভাবে অনুভূত হবে। কাঠামোগত সংস্কারের সুফল পেতে সাধারণত বহু বছর লাগে। এ কারণেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনীতিকরা প্রায়ই এসব সংস্কার এড়িয়ে যান। কিন্তু এ বাস্তবতা উল্টো দিকেও কাজ করে; গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ভেঙে ফেলা বা দুর্বল করে দেয়া দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। যখন বাজার বুঝতে শুরু করবে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, তখন আজকের উচ্ছ্বাস দ্রুত মিলিয়ে যেতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামনে ২০২৬ সালে নিজের সত্য-মুহূর্তের মুখোমুখি হতে হবে। সর্বোত্তম পরিস্থিতিতে, অন্তত কিছু সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে হলেও একটি শক্তিশালী রাজস্ব ইউনিয়নের দিকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। তা না হলে যেকোনো গুরুতর সংস্কারের জন্য বড় ধরনের চুক্তি সংশোধন প্রয়োজন হবে। এটি শুরু করতে হবে সর্বসম্মতির সেই নিয়ম বাতিলের মাধ্যমে, যা জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে অচল করে রেখেছে। কল্পনা করুন, যদি যুক্তরাষ্ট্র ক্যালিফোর্নিয়া, মিসিসিপি ও টেক্সাসের সর্বসম্মতি ছাড়া কোনো আইন পাস করতে বা যুদ্ধ চালাতে না পারত তাহলে কী হতো?। আমার সাম্প্রতিক বই ‘আওয়ার ডলার, ইউর প্রবলেব’-এ যেমন যুক্তি দিয়েছি, ইউরোপ যদি শেষ পর্যন্ত তার ভূরাজনৈতিক সক্ষমতাকে গুছিয়ে নিতে পারে, তবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইউরোর ভূমিকা অনেক বড় হতে পারে।

জাপানও আরেকটি অনিশ্চিত উপাদান। সুদের হার বাড়ানোর ক্ষেত্রে জাপানের ব্যাংক কতদূর যাবে, তা অজানা। সম্ভাব্য একটি স্থিতিশীলকারী উপাদান হতে পারে ডলারের মূল্যহ্রাস। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি প্রধান বাণিজ্য অংশীদারের বিপরীতে সামান্য পতন হলেও ডলার এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে অতিমূল্যায়িত। দুর্বল ডলার সাধারণত বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে সহায়তা করে।

তবু সম্ভাবনা প্রবল যে নতুন বছরের প্রথম দিনেই বিনিয়োগকারীরা এমন এক বৈশ্বিক অর্থনীতির মুখোমুখি হবেন যা ২০২৫ সালের তুলনায় অনেক বেশি অস্থির। আর সেই পরিস্থিতি যখন হঠাৎ আঘাত হানবে, তখন এ অস্থিরতা নিজেই নিজেকে আরো বাড়িয়ে তুললে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ: নীরব হাসান

কেনেথ রগফ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও জননীতি বিষয়ে অধ্যাপক