২০২৪ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে চীনের জিডিপি ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে ৫ দশমিক ৩ থেকে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়ে ৪ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা দেশটির বার্ষিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে থাকায় কিছুটা আশাবাদী হওয়া যায়।
কভিড-১৯ মহামারীর পর থেকে চীনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কিছুটা দুর্বল ছিল। বিষয়টি কিছুটা প্রত্যাশিত, অন্তত প্রথম দিকে তিন বছরব্যাপী লকডাউনের ফলে গৃহস্থালি, করপোরেট ও স্থানীয় সরকারের ব্যালান্স শিট চাপের মুখে ছিল। পাশাপাশি ফাইন্যান্স, রিয়েল এস্টেট সেক্টর ও সাংগঠনিক অর্থনীতিসংক্রান্ত কঠোর বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরো কঠিন করে তুলেছিল।
২০২১ সালের শুরুতে, যখন যুক্তরাষ্ট্র মহামারীর সবচেয়ে খারাপ পর্ব থেকে বেরিয়ে আসে, আমেরিকান পরিবারগুলো তাদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করতে শুরু করে। অন্যদিকে চীনের পরিবারগুলো লকডাউন শেষ হলেও তাদের সঞ্চয় বাড়াতে থাকে: ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত, চীনের ব্যাংক রিজার্ভ প্রায় ৬৫.৪ ট্রিলিয়ন ইউয়ান (৯ ট্রিলিয়ন ডলার) বেড়েছে, যার একটি বড় অংশ ছিল ধনাঢ্য মানুষের কাছে।
এ সময়ে চীনের সরকার কিছু সহায়ক নীতি প্রণয়ন করলেও অতীতের মতো আগ্রাসী প্রণোদনা নীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সরকারের বড় প্রণোদনা প্যাকেজ যেমন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়িয়েছিল, তেমনি এটি রিয়েল এস্টেট বাবল সৃষ্টি, স্থানীয় সরকার ঋণ বৃদ্ধি এবং দক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ হ্রাস করেছিল।
২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকের শেষে যখন স্পষ্ট হয় যে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার বাড়াতে আরো সহায়তা প্রয়োজন তখন সরকারের সব হিসাব পাল্টে যায়। সেপ্টেম্বরে, চীনের পিপলস ব্যাংকের গভর্নর প্যান গংশেং তিনটি ব্যবস্থা ঘোষণা করেন: ব্যাংকের রিজার্ভ রেশিও কমানো, নীতি-সুদহার হ্রাস এবং শেয়ারবাজারকে সহায়তা করার জন্য উপযুক্ত মুদ্রানীতি তৈরি।
এছাড়া ১২ অক্টোবর চীনের অর্থমন্ত্রী লান ফো’আন ঘোষণা করেন যে নতুন আর্থিক ব্যবস্থা স্থানীয় সরকারের ঋণ সমস্যার সমাধান, রিয়েল এস্টেটের বাজার স্থিতিশীল করা এবং কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করবে। তিনি নভেম্বরে স্থানীয় সরকারগুলোর জন্য ১০ ট্রিলিয়ন ইউয়ানের একটি ঋণ-বিনিময় পরিকল্পনার ঘোষণা করেন।
প্যান ও লান উভয়ই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আরো প্রণোদনা পরিকল্পনা ভবিষ্যতে আসছে, বিশেষ করে লান উল্লেখ করেছেন চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের এখনো ঋণ ও ঘাটতি বাড়ানোর মতো সুযোগ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক দ্রুত পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক সূচকগুলো ইঙ্গিত করছে যে সরকারের পদক্ষেপগুলো প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে ফলপ্রসূ হচ্ছে।
অক্টোবরে মোট "সামাজিক অর্থায়ন" (প্রকৃত অর্থনীতির জন্য মোট অর্থায়ন) ৭ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। খুচরা বিক্রির পরিমাণ ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে এবং পূর্ববর্তী মাসের তুলনায় সূচক ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। উৎপাদন খাতের ক্রয় ব্যবস্থাপক সূচক (পিএমআই) ৫০.১-এ পৌঁছেছিল, যা তিন মাস ধরে ৫০-এর নিচে ছিল এবং নভেম্বরে এটি আবার বেড়ে ৫০.৩-এ পৌঁছেছে।
আরো ভালো খবর হচ্ছে, শহুরে বেকারত্বের হার অক্টোবরে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এমনকি রিয়েল এস্টেট বাজারও কিছুটা উন্নতি করেছে, তবে ভূমি বিক্রি ও রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ এখনো দুর্বল রয়েছে। এ ইতিবাচক পরিবেশ জারি থাকলে ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে জিডিপি বৃদ্ধির হার ৫ শতাংশে ফিরে আসতে পারে।
তবে ২০২৫ সালের চিত্র অনেকটাই অস্পষ্ট। যদি চীন ২০২৫ সালে ৫ শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধি অর্জন করতে চায়—ধরে নেয়া যায় যে এটি সরকারের লক্ষ্য হবে—তবে নীতিনির্ধারকদের তিনটি প্রধান চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। প্রথমটি হলো রিয়েল এস্টেট সেক্টরকে স্থিতিশীল করা, যা জিডিপির প্রায় ২০ শতাংশ এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ের গৃহস্থালি সম্পদের ৭০ শতাংশ দখল করে আছে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে স্থানীয় সরকারের আর্থিক অবস্থা। সাম্প্রতিক সময়ে তহবিলের অভাবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ খরচ কমানোর চেষ্টা করছে। এর মাঝে রয়েছে কর্মকর্তাদের বেতন কাটছাঁট করা, রাজস্ব সংগ্রহের জন্য করপোরেটদের পুরনো কর বকেয়া আদায়, এমনকি অন্য অঞ্চলের ব্যক্তিগত উদ্যোক্তাদের আটক করা। এসব কিছুই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পক্ষে ইতিবাচক নয়।
মৌলিক সমস্যা হলো খরচের পরিমাণ এখন আয় থেকে অনেক বেশি, যা আর ভূমি বিক্রি করে এবং স্থানীয় সরকার বিনিয়োগের মাধ্যমে সামাল দেয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রীয় সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে রাজস্ব স্থানান্তর করতে হবে। সহজ ভাষায় বললে, চীনকে সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে খরচের ভারসাম্য পুনর্গঠন করতে হবে।
২০২৫ সালে চীনকে যে তৃতীয় প্রধান চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যিনি তার প্রথম বছরে চীন থেকে সব আমদানির ওপর ৬০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যেহেতু চীনের মোট জিডিপির ৩ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রে রফতানির মাধ্যমে আসে, তাই এ শুল্ক এবং এমনকি অনেক কম শুল্কও সামনের বছর চীনের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। উদাহরণস্বরূপ, দ্য ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক ইউবিএস এরই মধ্যে পূর্বাভাস দিয়েছে আগামী বছর চীনের জিডিপি বৃদ্ধি ৪ শতাংশে নেমে আসবে।
চীনে অনেক আলোচনা হচ্ছে যে অর্থনীতির জন্য কি গঠনমূলক সংস্কারের প্রয়োজন, নাকি আরো ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক প্রণোদনা দরকার। সত্য হলো দুটিই প্রয়োজন। প্রথমেই দরকার একটি শক্তিশালী প্রণোদনা প্যাকেজ, যা একটি শক্তিশালী আর্থিক নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আসবে কিন্তু প্যাকেজটি কার্যকর হলে সরকারকে গঠনমূলক সংস্কারের দিকে মনোযোগ দিতে হবে, যা গ্রাহক, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের মাঝে আস্থা বৃদ্ধি করবে।
গত এক বছরে চীনের সরকার বিভিন্ন নীতিগত দলিল প্রকাশ করার মাধ্যমে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। তবে বাজারের অংশীদাররা সম্পূর্ণভাবে আস্থা না আনা পর্যন্ত সরকারকে আরো সাহসী এবং দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ব্যক্তিগত বিনিয়োগের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ব্যবস্থা, স্থানীয় কর্মকর্তাদের পুরনো কর রেকর্ড থেকে অপ্রদেয় পাওনা খুঁজে বের করার মতো কাজগুলো ব্যবসার প্রতি আস্থা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা করবে।
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট থেকে অনুবাদ: ফাহাদ হৃদয়
হুয়াং ইপিং: পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ন্যাশনাল স্কুল অব ডেভেলপমেন্টের ডিন। পিপল’স ব্যাংক অব চায়নার মুদ্রানীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য










