এবছরে বিশ্ববাজার সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে অস্থিতিশীল হতে পারে। বিশেষত পণ্যবাজারের ক্ষেত্রে এটি অপরিহার্য বাস্তবতা হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শাসনকালে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসে নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না তাকে। এতে অবশ্যম্ভাবীভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে বাধা তৈরি হবে।

তদুপরি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও পণ্যের প্রধান ক্রেতা চীনের অর্থনীতি এখনো অনিশ্চয়তার দোলাচলে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ট্রাম্পের অস্বীকৃতিমূলক মনোভাব, ইউরোপে অতিডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বাড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের ভবিষ্যৎও আরো সঙ্গীন হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি কার্বনভিত্তিক জ্বালানি এড়িয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উচ্চ ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এসব নিয়ামক এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে যেখানে পণ্যবাজার আরো অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে। তবে সে পরিস্থিতিতেও বাজার পূর্বাভাসের বাইরে চিন্তা করা ব্যবসায়ীরা সম্ভাবনা খুঁজে পেতে পারেন। অবশ্য তার জন্য প্রয়োজন বাজার সম্পর্কে গভীর অনুধাবন ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ। এ নিবন্ধে ২০২৫ সালের এমনই পাঁচটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা ব্যবসায়ী ও বাজার পর্যবেক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। স্পষ্ট করে বলতে গেলে, এগুলো পূর্বাভাস নয়, বরং চিন্তার সূত্র তৈরি করতে পারে—

ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত ইতিবাচকতা

শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বিশ্বজুড়ে রীতিমতো হইচই তৈরি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তার এ ঘোষণা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইতিবাচকতাও বয়ে আনতে পারে। বিশেষত আগের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, বৈশ্বিক এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ভালো করতে পারে। ট্রাম্পের শুল্ক-হুমকির কারণে বড় বাণিজ্যিক অংশীদাররা করহ্রাসসহ নানা ধরনের নীতিগত ছাড় দিতে পারেন। ফলে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর হওয়ায় লাভবান হতে পারবেন ব্যবসায়ীরা।

মুদ্রাস্ফীতি কমা ও মুদ্রানীতি শিথিলায়নের কারণে বিশ্ব বাণিজ্যের শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে গতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের বাকি দেশগুলোর অর্থনীতিতেও গতি সঞ্চার হয়। অন্যদিকে চীনা সরকারি উদ্দীপনার কারণে এশিয়ার অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হতে পারে। অর্থনীতি ভালো থাকলে সাধারণত পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়।

তবে সরবরাহ বাড়ায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে যেতে পারে। ট্রাম্পের চাহিদা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদকরা উল্লেখযোগ্যভাবে উৎপাদন বাড়ালে এ পরিস্থিতি আরো তীব্র হতে পারে।

এছাড়া ট্রাম্প রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করলে এটিও পণ্যের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে রাশিয়া থেকে সরবরাহ পুনরায় চালু হলে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ট্রাম্পের অভাবনীয় নেতিবাচকতা

ওপরের বিপরীত অবস্থা তৈরি হবে যদি ট্রাম্পের নতুন প্রশাসন শুল্কহার বাড়িয়ে দেয়। এতে বিশ্বজুড়ে বড়সড় বাণিজ্য বাধা তৈরি হবে। ট্রাম্পের ইত্যাকার স্বভাবে আন্দাজ করা যায়, তিনি প্যারিস জলবায়ু চুক্তি বা নর্থ আটলান্টিক ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (ন্যাটো) মতো আন্তর্জাতিক চুক্তি থেকে সরে আসতে পারেন কিংবা সংগঠনগুলোকে দুর্বল করে ফেলতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে বাণিজ্যপ্রবাহ ও সাপ্লাই চেইনের সমস্যায় পড়বে দেশগুলো। পরিণতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া মুদ্রাস্ফীতি বৈশ্বিকভাবে বাড়তে পারে এবং অনেক প্রধান অর্থনীতিতে আর্থিক নীতি কঠোর হয়ে উঠতে পারে।

এ অবস্থায় সম্পর্কিত পণ্য যেমন তামা ও আকরিক লোহার দাম কমে যেতে পারে। একইভাবে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চাহিদা কমে গেলে সেগুলোর দামও কমতে পারে। যেমন মার্কিন নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের পর লন্ডনের ফিউচার মার্কেটে এক সপ্তাহের মধ্যে তামার দাম ৭ দশমিক ৭ শতাংশ কমে গিয়েছিল।

ট্রাম্প শুল্ক বাড়ানোর সঙ্গে করছাড় দিলে বন্ড ভিজিলান্টিরা (বাজারের কড়া পর্যবেক্ষক) ট্রেজারি বন্ড বিক্রি করে দিতে পারেন। ফলে বন্ডের মূল্য কমে যেতে পারে। তবে ইল্ড (মুনাফা) বেড়ে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কেননা ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীরা বুঝে ফেলতে পারেন, করছাড়ের ফলে সাময়িকভাবে বাজার স্ফীত হলেও শুল্ক বাড়ানোর ফলে তা দীর্ঘমেয়াদে স্থবির হয়ে পড়তে পারে।

চীনের পুনরুদ্ধার

অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক এখন চীনকে এশিয়ার ‘দুর্বল দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাই চীনের অর্থনীতিতে পুনরুদ্ধার ঘটলে তা অনেকের জন্যই বিস্ময়ের কারণ হবে। তবে অনেকে মনে করেন, ২০২৪ সাল চীনের অর্থনীতির পতনের বছর হিসেবে নয়, বরং আবাসন খাত ও স্থানীয় সরকারের দুর্বল আর্থিক অবস্থার মতো সমস্যাগুলোর সমাধান বছর হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এরই মধ্যে দেশটি অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়া শুরু করেছে। এ প্রচেষ্টা ২০২৫ সালে ফল দিতে শুরু করতে পারে, যা দেশটিকে গ্রাহক আস্থা ফেরানো ও ব্যয় বাড়ানোর ওপর আরো বেশি মনোযোগ দেয়ার সুযোগ করে দেবে।

চীন নতুন ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিগুলো সফলভাবে মোকাবেলা করতে সক্ষম হলে তা ইউরোপের সঙ্গে আরো গঠনমূলক সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে দেশটি গ্লোবাল সাউথের (এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশ) সঙ্গেও ভালো অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে চীন তার জ্বালানি রূপান্তরের প্রযুক্তি ও পণ্যের জন্য নতুন বাজার তৈরিতে সক্ষম হতে পারে।

চীনের এ পুনরুজ্জীবন তামা, আকরিক লোহা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। অর্থাৎ শীর্ষ ভোক্তা দেশের উত্থানে এসব পণ্যের বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারে। তবে বিদ্যুচ্চালিত যানবাহনে (ইভি) রূপান্তরের কারণে দেশটিতে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের চাহিদা কমতে পারে।

ওপেক প্লাসের ভাঙন

বিগত কয়েক বছরে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজারে ওপেক প্লাস ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠনটি উত্তোলন কমিয়ে পণ্যটির দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারের আশপাশে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সংগঠনটির কিছু সদস্যদেশের জন্য এ দাম তেমন লাভজনক নয়। তবে উত্তোলন না কমালে দাম এর চেয়ে কমে যেতে পারত।

তবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের চাহিদা ক্রমবর্ধমান হারে কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের উত্তোলন বাড়াতে ট্রাম্পের নতুন প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রচেষ্টা ওপেক প্লাসভুক্ত দেশগুলোর সংহতিতে ফাটল ধরাতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কিছু সদস্য মনে করতে পারে, মজুদ থেকে উত্তোলনের মাধ্যমে শিগগিরই আয় করা উচিত। তারা এমনও বিশ্বাস করতে পারে, চীন-নেতৃত্বাধীন ইভির বাজার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে উত্তোলন বাড়লে জ্বালানি পণ্যটির দাম কমতে পারে।

ত্বরান্বিত জ্বালানি রূপান্তর, পশ্চাতে যুক্তরাষ্ট্র

বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য সম্পৃক্ততা বাড়ানো চীনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত বাণিজ্য বাধা মোকাবেলার প্রধান উপায়। এটি বাস্তবায়নের একটি কার্যকর উপায় হলো চীনা ইভি, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও উইন্ড টারবাইনের মতো তৈরি পণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা। নতুন বছর তুলনামূলক সাশ্রয়ী দাম ও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ক্রেতাদের ব্যয়বহুল জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার ইচ্ছার ফলে জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত হতে পারে। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ (সবার আগে আমেরিকা) নীতি কার্যত ‘আমেরিকা অ্যালোনে’ (আমেরিকা একা)’ পর্যবসিত হতে পারে।

জ্বালানি রূপান্তর ত্বরান্বিত হলে তামা, লিথিয়াম ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ধাতুর বাজার ইতিবাচক হতে পারে। সোলার প্যানেল তৈরির জন্য ব্যবহৃত রৌপ্যের দামও বাড়তে পারে।

২০২৫ সাল: এক অনিশ্চিত বছর

মোটাদাগে বৈশ্বিক পণ্যবাজারের জন্য ২০২৫ সাল অনিশ্চয়তায় ঘেরা। তবে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় এ বাজার নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে। পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে, প্রাথমিক মূল্য ও পরিমাণের অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বরং পণ্যবাজার নতুন বাস্তবতায় চমৎকারভাবে মানিয়ে নিতে সক্ষম।

রয়টার্স থেকে অনুবাদ: মো. নাসিমুল হুদা

ক্লাইড রাসেল: রয়টার্সের এশীয় পণ্য ও জ্বালানিবিষয়ক কলামিস্ট