প্রতি বছর ডিসেম্বরে প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের বিশ্লেষকরা আগামী বছরের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নীতিসংক্রান্ত ঘটনাগুলো চিহ্নিত করেন। ২০২৪ সালের শুরুতেও পিএস বিশ্লেষকরা গণতন্ত্র, নির্বাচন, উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাত ও ধ্বংসপ্রবণ প্রযুক্তির উদ্ভাবন প্রভৃতি কারণে এক উত্থান-পতনময় বছরের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। যেহেতু আমরা ২০২৫ সালে পদার্পণ করতে যাচ্ছি, লেখকরা মনে করছেন যে নতুন বছরটি জলবায়ু পরিবর্তন ঘিরে বহুপাক্ষিকতা ও পরিস্থিতির উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করতে পারে

রাবাহ আরেজকি

ডোনাল্ড ট্রাম্প পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় ‘অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি রাজনৈতিক মূলধারায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব বলতে বোঝায় কোনো দেশের স্বাধীনভাবে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে ধারণাটি জনপ্রিয়তা লাভ করে। অবশ্য এর জন্য প্রায়ই অভিবাসী ও সংখ্যালঘুদের দায় দেয়া হয়। আর এ প্রতিক্রিয়া যত তীব্রতর হবে অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের দিকে তত ঝোঁক বাড়বে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, মূলধনপ্রবাহ ও অভিবাসনের ধরনে গভীর প্রভাব ফেলবে।

শ্লোমো বেন-অ্যামি

বিশ্বের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দুটি সংকট হলো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত। সম্ভবত ২০২৫ সালেও এসব সংকট অব্যাহত থাকবে। দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছলেও ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত সমাধান অনেক বেশি দুরূহ। তবে ইসরায়েলের সামরিক সাফল্য ট্রাম্পকে একটি রূপান্তরিত মধ্যপ্রাচ্য উপহার দিয়েছে, যেখানে ইরানের প্রভাব বলয় থেকে বিভিন্ন ঘাঁটি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কিন্তু এখনো ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী জোট ফিলিস্তিন সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে অন্যতম অন্তরায়। এদিকে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম বছরে ইসরায়েল-সৌদি আরব সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দিকে মনোযোগী হতে পারেন। পাশাপাশি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত যুদ্ধ এড়ানোর জন্য সচেষ্ট থাকতে পারেন। কিন্তু আশঙ্কা রয়েছে যে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ইরান অতিসত্বর পারমাণবিক বোমার প্রয়োগ করতে পারে।

আবার যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরো এবং ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচনের ফলে বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রশমিত করার একটি পথ দেখাতে পারে। এ ধরনের সমঝোতা চুক্তি রাশিয়ার দখলকৃত অঞ্চলের স্বীকৃতির বিনিময়ে ইউক্রেনকে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। সেই সঙ্গে ন্যাটোর তরফ থেকে নিরাপত্তা প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে পারে। আর এশিয়ার ক্ষেত্রে যদি বলি, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন-চীন সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা না করে তাইওয়ান আক্রমণ করবেন বলে মনে হচ্ছে না। বরং চীনের বর্তমান অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের কারণে তিনি তার সীমানা বাড়ানোর মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে দমিয়ে রাখতে বাধ্য হতে পারেন।

লরা কারভালো

জলবায়ুবিষয়ক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজেকে প্রত্যাহার করা নেয়া আগে থেকেই অনুমেয় ছিল। এ ঘটনা এবং পশ্চিমা দেশগুলোয় রক্ষণশীলতার পুনরুত্থান জলবায়ুসংক্রান্ত বহুপক্ষীয় উদ্যোগ এবং টেকসই উন্নয়ন ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এর সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে। পরবর্তী জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করতে যাচ্ছে ব্রাজিল। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা হতে যাচ্ছে জি২০ শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনকারী প্রথম আফ্রিকান দেশ। এ দুটি ঘটনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃত্বে নতুন অর্থনৈতিক সহযোগিতার সূচনা করবে। প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে উন্নয়নশীল দেশের সরকার জলবায়ু রূপান্তরের দ্বারা সৃষ্ট সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে। এভাবে বহুপক্ষীয় বাণিজ্যের পথ আরো সুগম হতে পারে, যেখানে সব দেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকবে।

ফাওয়াজ এ জেরজেস

ইসরায়েল ও হামাস শিগগিরই যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে। তবে হামাসের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধ ২০২৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে এবং এটি ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে রূপ নিতে পারে। নেতানিয়াহুর জন্য ইসলামী প্রজাতন্ত্রই চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যপ্রাচ্যের সহিংসতার চক্রে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা আরো জোরদার করবেন। ট্রাম্পের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবই একমাত্র বিষয় যেটি তার কট্টর বিদেশনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টাদের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যারা তাকে ইরানের পরমাণু ঘাঁটিতে আক্রমণ চালানোর জন্য প্রভাবিত করতে পারে।

অন্তরা হালদার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী উদ্ভূত বৈশ্বিক ব্যবস্থা উদার গণতন্ত্র এবং নব্য শাস্ত্রীয় অর্থনীতি—এ দুই স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি শান্তি এবং দলবদ্ধ হয়ে সমৃদ্ধি অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় ৮০ বছর পর এ ব্যবস্থা ভঙ্গুর প্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসন বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার অনেক মূল উদ্দেশ্য—যেমন মুক্ত বাণিজ্যকে টিকিয়ে রাখা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপকে উৎসাহিত করা প্রভৃতি কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ প্রায় নিশ্চিতভাবেই বৈশ্বিক নেতৃত্বে এক প্রকার শূন্যতা তৈরি করবে, যা ভূরাজনীতিতে বিশৃঙ্খলা বাড়াবে। ক্ষয়িষ্ণু ওয়াশিংটন কনসেনসাস এবং যুদ্ধ-পরবর্তী উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে গড়ে ওঠা ইতিবাচক শাসন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করতে পারবে, যাতে সাধারণ মানুষ সেবাবঞ্চিত না হয় এবং বৈশ্বিকভাবে পপুলিজমের উত্থান ঘিরে বেড়ে চলা জন-অসন্তোষ মোকাবেলায় সক্ষম হবে?

জেমস লিভিংস্টোন

প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ সাংবিধানিক সংকটে রূপ নিতে পারে। শুরুতেই এটি প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের ক্ষেত্রে মার্কিন সংবিধানের আর্টিকেল ২, অনুচ্ছেদ ২-এ উল্লেখিত সিনেটের”পরামর্শ ও সম্মতি নেয়ার প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে। ট্রাম্প সিনেটকে এড়িয়ে পিট হেগসেথকে প্রতিরক্ষা সচিব এবং কাশ প্যাটেলকে এফবিআই পরিচালক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভা পদে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এটি করতে হলে ট্রাম্পকে সিনেট ফিলিবাস্টার বিলোপ করতে হবে বা সুপ্রিম কোর্টের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে। এটি তার কর্তৃত্বের সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। কিন্তু এসব রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশৃঙ্খলায় পর্যবসিত হতে পারে।

কার্লোস লোপেস

২০২৫ সালে জেনারেটিভ এআই এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও সিন্থেটিক বায়োলজির মতো ক্ষেত্রে বহুমাত্রিক ভাষার সংযোজন দ্বারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন সম্পূর্ণ নতুন পর্বের সূচনা করবে। এসব প্রযুক্তি প্রথাগত মেধাস্বত্ব কাঠামো অতিক্রম করে সহযোগিতামূলক উদ্ভাবন এবং সমস্যার সমাধানে অভূতপূর্ব সমন্বয় তৈরি করবে। আফ্রিকান দেশগুলোয় প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের পথে প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য উপযোগী সমাধান তৈরি করবে। এটি সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত ও মালিকানার সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ করবে এবং বৈশ্বিক জ্ঞান বিনিময়ে বিপ্লব ঘটাবে।

রবার্তো পাতিনো

২০২৫ সালে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হবে ‘অভিবাস’। কারণ উন্নত অর্থনীতি একদিকে বিদেশী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীলতা এবং অন্যদিকে অভিবাসনের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়ার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে ঝুঁকির সম্মুখীন হবে। একই সময়ে জলবায়ু দুর্যোগ, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিশ্বজুড়ে অভিবাসনের হার বাড়াবে। আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের রক্ষণশীল অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে শ্রম সংকট তৈরি প্রকট হতে পারে। অন্যদিকে ইউরোপীয় নেতারা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সংঘাত নতুন করে অভিবাসনের জোয়ার সৃষ্টি করতে পারে।

ভেনিজুয়েলাও একটি সম্ভাব্য সংঘাতের ক্ষেত্র হিসেবে রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যদি ক্ষমতা থেকে অপসারিত হন, তাহলে হয়তো লাখো অভিবাসী তাদের দেশে ফিরতে পারবেন। এটিই কেবল হতাশাজনক পরিস্থিতিতে আশা সঞ্চার করতে পারে। তবে মাদুরো যদি সহিংসভাবে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকেন, তাহলে বৈশ্বিক অভিবাসন সংকট আরো প্রকট হবে।

স্টিফেন এস রোচ

ট্রাম্পের ইলোন মাস্কের প্রতি আকর্ষণ তার জীবনসায়াহ্নের “ব্রোমান্সের” প্রবণতাকে প্রকাশ করে। ট্রাম্প যাকে তার অভিষেকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলে জানা যায়, সেই শি জিনপিং তার পরবর্তী কূটনৈতিক মনোযোগের কেন্দ্র হতে পারেন। ফলে ট্রাম্প চীনের ওপর শুল্কচাপ কমাতে পারেন এবং রাশিয়ার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টায় একযোগে কাজ করতে পারেন। তবে কোণঠাসা ভ্লাদিমির পুতিন পূর্ব ইউরোপকে অস্থিতিশীল করতে পারেন, যা পশ্চিম ইউরোপের ভঙ্গুর অর্থনীতির জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। এ পরিস্থিতি বৈশ্বিক অর্থনীতির ভাঙনকে আরো ত্বরান্বিত করতে পারে।

ভেরা সঙওয়ে

২০২৫ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ওপর চাপ থাকবে। ব্যাংকগুলোকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য কাজ করতে হবে। দীর্ঘ বছরের মুদ্রার মান অবক্ষয় এবং সামাজিক অস্থিরতার মধ্যে কীভাবে মন্দা এড়ানো যায় সেটিই এখন বৈশ্বিক অগ্রাধিকারের বিষয়। উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষত আফ্রিকা এর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখবে যেন দেশটির ওপর আর্থসামাজিক অনিশ্চয়তার কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।

ক্রিপ্টোকারেন্সি বুম সম্পদ মূল্যায়নে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ বড় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো বাজারে প্রবেশ করছে। আফ্রিকার দেশগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে এ খাতে সক্রিয়। আসন্ন বছরে কি এ বাজারগুলো নিয়ন্ত্রণের জন্য বৈশ্বিকভাবে সমন্বিত প্রচেষ্টা নেয়া হবে? নীতিনির্ধারক ও নিয়ন্ত্রকদের এ পরিবর্তনশীল প্রেক্ষাপটের মধ্য দিয়ে সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি এবং হঠাৎ সৃষ্ট অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কী করণীয় সেই নীতিকৌশলও নেয়া প্রয়োজন, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

পাওলা সুবাচ্চি

২০২৫ সাল বহুপাক্ষিকতার জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর হবে। জি২০ আয়োজক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকাকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে সংলাপ চলমান রাখার গুরুতর চ্যালেঞ্জটি মোকাবেলা করতে হবে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে উন্নত দেশের মধ্যেও সংলাপ চলমান রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন নিয়ে জাতিসংঘের চতুর্থ আন্তর্জাতিক সম্মেলন, যা গুরুতর বিভাজন এবং জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য কাজ করবে। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংককে তাদের প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো যুক্তরাষ্ট্রের (তাদের সবচেয়ে বড় শেয়ারহোল্ডার) সরাসরি বিরোধিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েই পুনর্বিবেচনা করতে হবে। অর্থনৈতিক বিভাজন এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের কারণে ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে থাকা বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার এ প্রচেষ্টাগুলো বৈশ্বিক সহযোগিতার গতিপথ বছরের পর বছর ধরে প্রভাবিত করবে।

ইসাবেলা এম ওয়েবার

২০২৫ সাল নানা কারণে কট্টর ডানপন্থী মতাদর্শের পুনর্জাগরণের জন্য একটি মোড় পরিবর্তনের বছর হবে। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে চরম ডানপন্থী দলগুলোর সাহস জোগাবে এবং তার ‘বাণিজ্য যুদ্ধ ২’-এ আবারো বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এ অবস্থায় গণতন্ত্রকামীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে ফ্যাসিবাদবিরোধী অর্থনৈতিক নীতিকৌশল নেয়া, যা জাতীয়তাবাদ, জেনোফোবিয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংশয়বাদকে প্রতিহত করে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করবে।

উচং উম

২০২৫ সালে উন্নত দেশগুলোকে ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তির অধীনে দেয়া জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের মুখোমুখি হতে হবে। এরই মধ্যে নতুন বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা এবং শুল্ক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির খরচ ও প্রাপ্যতার ওপর প্রভাব ফেলছে। যদিও বাকুতে অনুষ্ঠিত কোপ২৯-এর ফলাফল অনেককে হতাশ করেছে। তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলার জলবায়ু অর্থায়ন দেয়ার প্রতিশ্রুতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটি একটি ন্যায্য সবুজ রূপান্তরকে উৎসাহিত এবং জ্বালানির অভাব দূর করার প্রয়োজনীয়তাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সেই স্থানগুলোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থায়ন করা, যেখানে এটি সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—আফ্রিকা, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও সম্প্রদায়গুলোয়। এক্ষেত্রে সরকার-বেসরকারি খাত এবং বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করার পাশাপাশি এমন একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সব দেশই জলবায়ু পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক প্রভাব থেকে নিজেদের রক্ষা করতে সক্ষম হয়।

অ্যাঞ্জেলা হুয়ুয়ে ঝাং

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউজে ফিরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি আবারো গণমাধ্যমের শিরোনাম অধিকার করে থাকবেন বলেই ধারণা করা যাচ্ছে। তার প্রথম মেয়াদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থেকে অনুমান করা যায়, তিনি আগের চেয়েও বেপরোয়া এবং অবাস্তব পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। আর তাকে প্রতিহত করতে পারে কেবল বাজার প্রতিক্রিয়া। তবে এবার পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে। প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণহীনতা এবং কংগ্রেস ও সুপ্রিম কোর্টের আরো পাকাপোক্ত সমর্থনের কারণে ট্রাম্প এবার আগের চেয়ে বেশি ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

এটি একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন উত্থাপন করে: বাজারের প্রতিক্রিয়া ছাড়া ট্রাম্প কি কিছু ভয় পান? যা-ই হোক না কেন, তার অপ্রত্যাশিত আচরণ এবং প্রতিষ্ঠিত নিয়মের প্রতি অবহেলা ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। তার প্রথম মেয়াদ যদি বিশৃঙ্খল হয়, তবে দ্বিতীয় মেয়াদ আরো বেশি বিশৃঙ্খলতাকেই নির্দেশ করছে।

[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ২০২৪]

অনুবাদ: সাবরিনা স্বর্ণা