স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে দেশের বেশির ভাগ তরুণ-তরুণী ছোটেন চাকরির পেছনে। যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়ার কারণে তাদের মধ্যেও কাজ করে হতাশা। তবে সাবেকুন্নাহার মিতুর গল্পটি একটু অন্য রকম। শুরু থেকেই স্বপ্ন ছিল উদ্যোক্তা হওয়ার। যার ফলে অনার্স তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায়ই প্রতিষ্ঠা করেন । পাট, কচুরিপনা ও হুগলা পাতা দিয়ে তৈরি পণ্য পাইকারি দরে বিক্রি করছেন দেশের সব বড় বড় সরবরাহকারীর কাছে। মাসে বিক্রি করছেন ২৫-৩০ লাখ টাকার পণ্য।
উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন ছিল ছোট থেকেই। পরিবারের অন্য সদস্যরাও ব্যবসায়ী। যার কারণে এ যাত্রায় পাশে পেয়েছেন পরিবারকে। পাশে ছিলেন স্বামীও। কীভাবে এ কাজের প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হলো তা জানতে চাইলে তিনি জানান, একদিন ঘুরতে গিয়ে মাঝপথে বৃষ্টি শুরু হয়। তখন একটি কারখানার নিচে আশ্রয় নেন। সেই সুবাদে কারখানাটি ঘুরে দেখেন তিনি। কারখানায় ঘুরতে যান। সেখান থেকেই এ কাজের প্রতি আগ্রহ আসে।
সেই আগ্রহ থেকেই ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন লাম ক্রিয়েশন। হোগলা পাতার ঝুড়ি, প্লানেট বাক্স (এটা বিভিন্ন শেপের হয়), ফ্রুট বাস্কেট, ফ্লোর ম্যাট, টেবিল ম্যাট, ব্রাশ হোল্ডার, গ্লাস ম্যাট, লন্ড্রি বাস্কেট, কনিকেল শেপ বাস্কেট, টিস্যু বক্স ইত্যাদি তৈরি করা হয়। প্রারম্ভিক মূলধন পরিবারের অন্য সদস্যদের সহায়তায়, জমানো টাকায় এবং নিজের সোনার গয়না বন্ধক দিয়ে জোগাড় করেন। কাজ শুরু করার আগে তিনি ফরিদপুরের বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখেন। এর কাঁচামাল কী লাগবে এবং তা কোথা থেকে সংগ্রহ করা লাগবে—এসব নিয়ে অনলাইনে বিভিন্ন ভিডিও দেখেন তিনি। এরপর কাঁচামাল কোন কোন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা লাগবে সে সম্পর্কে পড়াশোনা করেন। মিতু বলেন, ‘এসব পণ্য তৈরির কাঁচামাল আমরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করি । যেমন হুগলা পাতা ফরিদপুরে পাওয়া যায় না। বরিশাল-ভোলা অঞ্চল থেকে আনা লাগে। ঢাকার ইমামগঞ্জ থেকে সুতা আনা হয়। এ ধারণাগুলো ছোট ছোট কারখানা পরিদর্শন করার মাধ্যমে হয়েছে।’
তবে শুরুর পথটি মোটেও মসৃণ ছিল না। কারখানা দেয়ার পরপরই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। যার কারণে প্রথমদিকে পণ্য উৎপাদন করলেও পাননি কোনো ক্রেতা। মজুদ রাখতে হয়েছিল সব পণ্য। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের তৈরি পণ্যগুলো বেশির ভাগ ইউরোপের দেশগুলোয় রফতানি করা হতো। প্রথমদিকে আমি যখন বেচাকেনা শুরু করি তখন অনেক হতাশাগ্রস্ত ছিলাম। কারণ ব্যবসা শুরু করার পরপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় তৈরি করা পণ্য মজুদ করে রাখি। এ পরিস্থিতিতেও কারখানা শ্রমিকের বেতন বন্ধ করিনি। তখন কোনো সরবরাহকারীও পণ্য নেয়নি। তবে এখন এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। লোকসংখ্যা বাড়াতে পারলে, মেশিন সংখ্যা বাড়াতে পারলে এ ব্যবসার আরো প্রসার ঘটানো যাবে।’
মাত্র ১২টি মেশিন ও তিনজন শ্রমিক দিয়ে এ ব্যবসা শুরু করেন তিনি। এখন দুটো কারখানায় প্রায় ৮০টি মেশিন সচল রয়েছে। কারখানার ভেতরে ২০০ লোক কাজ করেন। এছাড়া বিভিন্ন গ্রামে এ কাজের মাধ্যমে আরো ৩০০ জন লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। চার-পাঁচটি গ্রামে প্রায় ৩০০ জন কাজ করছেন। নামিদামি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। পাইকারি মূল্যে তাদের পণ্য সরবরাহ করে আসছেন। যেমন গোল্ডেন জুট, বিডি ক্রিয়েশন দুই-তিনটি কোম্পানির কাছে পণ্য সরবরাহ করে থাকেন। সেসব প্রতিষ্ঠান অন্যান্য দেশে পণ্য রফতানি করে। তবে তার ইচ্ছা সরাসরি রফতানির সঙ্গে যুক্ত হওয়া। চাহিদার তুলনায় লোকবল ও মেশিন কম থাকায় তার প্রতিষ্ঠান সরাসরি নিজেদের পণ্য রফতানি করতে পারছে না। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমরা দেশের বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠানকে পণ্য সরবরাহ করি। যাদের মাধ্যমে আমাদের বিভিন্ন পণ্য বাইরের দেশেও যায়। আমাদের থেকে কেনা পণ্য এখন অন্যদের মাধ্যমে বিদেশে রফতানি হয়। আমাদের ইচ্ছা আমরা সরাসরি বাইরের দেশে রফতানি করব। আমাদের মেশিনের সংখ্যা কম, তা আরো বাড়াতে পারলে চাহিদাও বাড়বে। আমাদের আরো ২০টি মেশিন থাকলে আমরা বাইরে রফতানি করতে পারতাম। আমরা এখনো বাইরের দেশের ক্রেতা ধরতে পারছি না। গ্রাহক হিসেবেই কাজ করছি।’










