দেশে বড় আকারের বিনিয়োগের গতি এখন ধীর। এমন অবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য আমাদের দেশের এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ ও সহায়তা প্রয়োজন আছে কি?
বাংলাদেশে এমএসএমই অর্থায়ন বেশকিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যার মধ্যে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক ঋণপ্রাপ্তিতে সীমিত প্রবেশাধিকার, সঠিক হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ না করা, ব্যবসায়িক পরিকল্পনার অভাব, অপর্যাপ্ত জামানত নিরাপত্তা, বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের উৎস সম্পর্কে জ্ঞানগত ঘাটতি, উপযুক্ত পণ্য/সেবাসহ প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতার সঙ্গে বাণিজ্যিক বাজারে প্রবেশের অভাব। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেখানে বৃহৎ আকারের বিনিয়োগের গতি মন্থর, সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য এমএসএমই খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ খাতে মনোযোগ দিলে একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, তেমনি দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কারণ এ খাতের উৎপাদন প্রক্রিয়া ও পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে বড় আকারের শিল্পের তুলনায় অনেক কম বিনিয়োগের প্রয়োজন হয়।
এমএসএমই খাতের অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণ সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করতে আপনাদের ভাবনা বা উদ্যোগ কেমন?
আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন স্কিমের অধীনে সিএমএসএমই উদ্যোক্তাদের মধ্যে কম সুদে ঋণ সুবিধা দিচ্ছি, যেমন ২৫ হাজার কোটি টাকার প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, কৃষি পণ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প স্থাপনের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম। অপ্রাতিষ্ঠানিক/প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, স্টার্টআপ, ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং ও গ্রুপ ফাইন্যান্সিং এনসিসি ব্যাংক পিএলসির মূল ফোকাসগুলোর মধ্যে অন্যতম।
দক্ষতা ও তথ্যের ঘাটতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা দেশের এমএসএমই খাতের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এসব সমস্যা দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ/উদ্যোগ প্রয়োজন?
এনসিসি ব্যাংক ব্যবসার পরিধি বৃদ্ধিতে জোর দিচ্ছে বিশেষ করে আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও অটোমেশনের ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে। আমরা এরই মধ্যে গ্রাহকদের জন্য এনসিসি অলওয়েজ অ্যাপ চালু করেছি, যাতে তারা ২৪/৭ ব্যাংকিং সুবিধা/সেবা গ্রহণ করতে পারেন। আমরা এমএসএমই ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য ব্যবসার নামে বিশেষ করে এসএমই বিজনেস ডেবিট কার্ড, এসএমই পণ্যের জন্য কিউআর কোড এবং আমাদের ব্যাংকের ওয়েবসাইটে লাইভ চ্যাটবট অফার করতে যাচ্ছি।
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে এমএসএমই খাতের। বাংলাদেশেও কীভাবে এমএসএমই খাতকে আরো বেশি রফতানি আয়ের অংশীদার করা যায়?
বাংলাদেশে এমএসএমই খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। এ খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এ খাতের রফতানি আয় এখনো তুলনামূলকভাবে কম। সরকার এমএসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন নীতিগত সহায়তা চালু করেছে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এমএসএমইগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী এ নীতিগত সহায়তা আরো বাড়ানো যেতে পারে, যেমন নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য কর সুবিধা, কম সুদ হারের সুবিধা, কম প্রিমিয়ামে বীমা কাভারেজের সুবিধা এবং গ্যারান্টি স্কিম।
এমএসএমই খাতের কোন ধরনের প্রডাক্টকে আপনি সম্ভাবনাময় মনে করেন?
এমএসএমই (ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোগ) খাতে স্থানীয় কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পোশাক, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, হস্তশিল্প, চামড়াজাত পণ্য, ইলেকট্রনিক ও আইটি-সংশ্লিষ্ট পণ্যগুলো (অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট ও ডিজিটাল মার্কেটিং) উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রাখে। এছাড়া পরিবেশবান্ধব এবং টেকসই পণ্য, যেমন জৈব সার ইকো-ফ্রেন্ডলি প্যাকেজিং সমাধান এবং পুনর্ব্যবহৃত সামগ্রীও ভালো সম্ভাবনা দেখাচ্ছে।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপনাদের কোনো পরিকল্পনা আছে কি?
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংকিং সেবা সুনিশ্চিত করতে আমাদের প্রধান কার্যালয়ে রয়েছে বিশেষ উইমেন ব্যাংকিং ইফনিট পরমা এবং শাখা পর্যায়ে রয়েছে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নিবেদিত ডেস্ক। নারী উদ্যোক্তাদের অনুপ্রাণিত করতে আমরা নিয়মিত আর্থিক শিক্ষা ও গ্রাহক সচেতনতা কর্মসূচি (এসএমই মেলা, ওপেন ক্রেডিট প্রোগ্রাম ইত্যাদি) আয়োজন করে থাকি। এছাড়া নারী পরিচালিত এমএসএমইগুলোর জন্য বিশেষ ঋণ ও আমানত পণ্য চালু করেছি। আমরা বিভিন্ন পুনঃঅর্থায়ন/প্রি-ফাইন্যান্স স্কিম এবং বিভিন্ন ফান্ডসহ নারী পরিচালিত এমএসএমই ব্যবসার জন্য তুলনামূলক কম সুদে ঋণ সুবিধা প্রদান করে থাকি।
সাধারণ এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের সুবিধা নিশ্চিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেটওয়ার্ক বিশেষভাবে ভূমিকা নিতে পারে। উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে আপনাদের উপশাখা বা শাখা কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সাধারণ এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের সুবিধা নিশ্চিত করতে আমাদের শাখা এবং উপশাখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে এনসিসি ব্যাংক ১৩০টি শাখা এবং নয়টি উপশাখা পরিচালনার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত গ্রাহকদের চাহিদা পূরণ করে যাচ্ছে। শাখা ও উপশাখাগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা তাদের বিশ্বাস ও আস্থা তৈরি করে সহজে ঋণ গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে। শাখা-উপশাখাগুলো উদ্যোক্তাদের ডকুমেন্টেশন ও আবেদন প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। এছাড়া শাখা-উপশাখার কর্মকর্তারা উদ্যোক্তাদের ব্যবসার উন্নয়নের জন্য পরামর্শ প্রদান করে থাকে এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ঋণ প্রদান এবং আমানত গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে।










