দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এসএমই খাত কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে? দেশের এসএমই খাত এখন কেমন করছে?
যখন বড় শিল্পে বিনিয়োগ কমে যায়, তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান ধরে রাখতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আরো সক্রিয় করতে হয়। বর্তমানে এমএসএমই খাত দেশের ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান ও জিডিপিতে ২৫-৩০ শতাংশ অবদান রাখছে। এ খাতে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বৃদ্ধি ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। বর্তমানে বড় আকারের বিনিয়োগে স্থবির থাকলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলো অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ অর্থনীতিতে নতুন গতি এনেছে। কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিতে এসএমই খাতের বিকাশ এখন সময়ের দাবি। তাই সামগ্রিকভাবে টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য এসএমই খাতের প্রতি বাড়তি মনোযোগ ও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
এসএমই খাতের অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক বিনিয়োগ সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য বিনিয়োগের সুবিধা নিশ্চিত করতে আপনাদের উদ্যোগ আছে কি?
আমাদের ব্যাংক ১২০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ১৪১টি শাখা ও পাঁচটি উপশাখার মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সাক্ষরতা কর্মসূচি চালু করে বিনিয়োগ গ্রহণের সক্ষমতা তৈরি করছি। ২০২৫ সালে এক হাজার নতুন নারী উদ্যোক্তাকে এ কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্যমাত্রা নেয়া হয়েছে এবং এরই মধ্যে ৪৮৫ জন অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।
এসএমই খাতের অর্থায়নে আমাদের অবদানের কিছু উদাহরণ—আমাদের একটি ডেডিকেটেড এসএমই ব্যাংকিং বিভাগ রয়েছে। এছাড়া আমরা এসএমই গ্রাহকদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, পরামর্শ ও আর্থিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করি।
দক্ষতা ও তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা দেশের এসএমই খাতের জন্য বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এসব সমস্যা দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ/উদ্যোগ প্রয়োজন?
পেশাগত প্রশিক্ষণ বা ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অভাব, পর্যাপ্ত তথ্য না থাকা এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমাবদ্ধতায় এ খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এসব সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে কিছু সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। যেমন আর্থিক সাক্ষরতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেন শেখানো, প্রযুক্তিনির্ভর হিসাব-পরিচালনা প্রশিক্ষণ, ব্যবসা পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন।
আমাদের ব্যাংক এরই মধ্যে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে নারী উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করছে।
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে রফতানি আয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা আছে এমএসএমই খাতের। বাংলাদেশেও কীভাবে এ খাতকে আরো বেশি রফতানি আয়ের অংশীদার করতে পারে?
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো উন্নয়নশীল ও মধ্যম আয়ের দেশে রফতানি আয়ের বড় একটি অংশ আসে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ খাত থেকে। উদাহরণস্বরূপ চীনে রফতানির প্রায় ৭০ শতাংশ এসএমই থেকে, থাইল্যান্ডে ৪০ শতাংশের বেশি এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৪৩ শতাংশেরও বেশি রফতানি এসএমইদের মাধ্যমে হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশে জিডিপিতে বড় অবদান থাকলেও রফতানি আয়ে এসএমই খাতের অংশগ্রহণ মাত্র ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে এসএমই থাকলেও এর সিংহভাগই অভ্যন্তরীণ বাজারে সীমাবদ্ধ। হস্তশিল্প, চামড়া, কৃষিভিত্তিক পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, আইটি ও ই-কমার্স পণ্যসহ বহু খাত রয়েছে যেগুলো এসএমইদের মাধ্যমে বৈশ্বিক বাজারে পৌঁছতে পারে।
উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও রফতানি আয়ে এসএমই খাতের অংশীদারত্ব বাড়াতে কিছু পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে, যেমন রফতানিমুখী পণ্য উৎপাদনে সহায়তা বৃদ্ধি; প্যাকেজিং, ব্র্যান্ডিং, আন্তর্জাতিক মান অর্জনে কার্যকরী প্রশিক্ষণ; এক্সপোর্ট ফাইন্যান্স ও রফতানি প্রণোদনা সহজলভ্য করা; কার্যকরী ব্যবসায়ী নেটওয়ার্ক গঠন ও সরকারি-বেসরকারি সংযোগ বৃদ্ধি।
এসএমই খাতের কোন প্রডাক্টকে আপনার সম্ভাবনাময় মনে করেন?
পশ্চিমা দেশগুলোয় হস্তশিল্প ও হ্যান্ডিক্রাফটস, হোম টেক্সটাইল, জুট প্রডাক্টস এবং চামড়াজাত সামগ্রী ও স্যুভেনির, ইকো-ফ্রেন্ডলি পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব প্রক্রিয়া ও টেকসই ডিজাইন নিশ্চিত করে এ খাতে রফতানি বৃদ্ধি সম্ভব।
এসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে আপনাদের কী ধরনের পরিকল্পনা আছে?
বর্তমানে দেশের এসএমই উদ্যোক্তাদের প্রায় ২৩-২৫ শতাংশ নারী যাদের অধিকাংশই কুটির শিল্প, ফ্যাশন, কৃষিপণ্য, হস্তশিল্প বা হোমবেজড প্রডাকশনমুখী উদ্যোগের সঙ্গে জড়িত। অনেকে উদ্যোক্তা হলেও আর্থিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পান না। তাই এসএমই খাতে নারীদের অংশগ্রহণ বিষয়ে শুধু স্বীকৃতি নয়, সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি কৌশলগত রোডম্যাপ প্রয়োজন।
নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণে সহায়তা দিতে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যেমন—আমরা প্রতি বছর এক হাজার নারী উদ্যোক্তাকে আর্থিক সাক্ষরতা ও বিনিয়োগ সহায়তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করি। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ পণ্য এবং দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ সুবিধা চালু আছে।
নারী উদ্যোক্তাদের সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুসারে প্রতিটি শাখা/উপশাখায় উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউর ডেডিকেটেড ডেস্ক রয়েছে। মেলা, সেমিনার ও বাজার সম্প্রসারণে শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার প্রদান করে।
উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে আপনাদের এজেন্ট, উপশাখা বা শাখা কীভাবে ভূমিকা রাখছে?
আমাদের ১২০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট, ১৪১টি শাখা ও পাঁচটি উপশাখা দেশের সব জেলা ও উপজেলার প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছেছে। এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আমরা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ আবেদন গ্রহণ, প্রশিক্ষণ, ব্যবসায়িক পরামর্শ ও সাশ্রয়ী শর্তে ঋণ বিতরণ করছি।










