দেশে বৃহৎ আকারের বিনিয়োগে মন্দা চলছে। এমন অবস্থায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রগতির জন্য এমএসএমই খাতে বাড়তি মনোযোগ ও সহায়তা প্রয়োজন আছে কি?
বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে এবং বেসরকারি বিনিয়োগপ্রবাহও নিম্নমুখী। এ অবস্থায় এমএসএমই খাত হতে পারে অর্থনীতির বিকল্প ইঞ্জিন বা চালিকাশক্তি।
প্রিমিয়ার ব্যাংক মনে করে, সরকারের বাজেট সহায়তা, ব্যাংকিং সেবা ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে এ খাতকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে নেয়ার উত্তরোত্তর সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
এমএসএমই খাতে অনেক উদ্যোক্তা ব্যাংক সুবিধার বাইরে আছেন। তাদের জন্য ঋণের সুবিধা নিশ্চিত করতে আপনার ভাবনা বা পরিকল্পনা কী?
ব্যাংক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকা উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্তি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রিমিয়ার ব্যাংক কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পরিচালনা করছে:
এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাকিং: প্রান্তিক এলাকায় আর্থিক সেবা পৌঁছে দেয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল কেওয়াইসি ও ই-কেওয়াইসি: সহজে অ্যাকাউন্ট খোলার প্রক্রিয়া চালু হয়েছে, যার ফলে নতুন উদ্যোক্তারা খুব অল্প সময়েই অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন।
ক্লাস্টারবেজড ফাইন্যান্সিং: চামড়া শিল্প, গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিস, কৃষিভিত্তিক শিল্পে ক্লাস্টার-ভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে গ্রুপ ফাইন্যান্সিংয়ের সুবিধা চালু হয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন বা আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি: যারা এখনো ব্যাংকিং সম্পর্কে সচেতন নন, তাদের জন্য সচেতনতামূলক সভা, ট্রেনিং ও পরামর্শ সেবা চালু রয়েছে।
দক্ষতা ও তথ্যের ঘাটতি, প্রযুক্তি ব্যবহারে দুর্বলতা দেশের এমএসএমই খাতের জন্য বড় সমস্যা। এ সমস্যা দূর করতে কী ধরনের পদক্ষেপ/উদ্যোগ আছে?
বাংলাদেশে এখনো অধিকাংশ এমএসএমই প্রতিষ্ঠান ট্র্যাডিশনাল ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে পরিচালিত হয়। ফলে এক্ষেত্রে দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা কম হয়। এ সমস্যা নিরসনে আমাদের উদ্যোগ:
এমএসএমই স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম: প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল লেনদেন, ই-কমার্সে অন্তর্ভুক্তি, ব্র্যান্ডিং ইত্যাদি বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
ডিজিটাল লিটারেসি ক্যাম্পেইন: উদ্যোক্তাদের মধ্যে মোবাইল অ্যাপ, ই-পেমেন্ট, ক্লাউড-ব্যাংকিং নিয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
টেক পার্টনার্স অ্যান্ড কনসালট্যান্টস: ব্যাংক নির্ধারিত প্রযুক্তি পার্টনারদের মাধ্যমে কম খরচে সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিসহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
চীন, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে এমএসএমই খাতে ব্যাপক ভূমিকা আছে। বাংলাদেশ কীভাবে এমএসএমই খাতকে আরো বেশি ফলপ্রসূ করতে পারে?
ওই দেশগুলোয় সরকারি নীতি, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বাজার সংযোগের কারণে এমএসএমই খাত খুব শক্তিশালী।
চীন ও ভারত এমএসএমইগুলোকে ট্যাক্স সুবিধা, রফতানি সহায়তা ও বিটুবি সংযোগ প্রদান করে। দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তিনির্ভর এসএমই রফতানি প্ল্যান তৈরি করে।
বাংলাদেশে আমরা নিচের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে গুরুত্বারোপ করছি:
এমএসএমই এক্সপোর্ট ফ্যাসিলিটেশন সেল: রফতানি সক্ষম ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আলাদা হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে।
অনলাইন-মার্কেটপ্লেস ইন্টিগ্রেশন: উদ্যোক্তাদের দারাজ, আলীবাবা, অ্যামাজনের মতো অনলাইন মার্কেটপ্লেসে সংযুক্ত করার প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এসএমই ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কস: সরকার নির্ধারিত এসএমই ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে বিভিন্ন ব্যাংক কর্তৃক সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে।
এমএসএমই খাতে কোন ধরনের প্রকল্পকে আপনি সম্ভাবনাময় মনে করেন?
বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নোক্ত খাতগুলো অত্যন্ত সম্ভাবনাময়:
কৃষি প্রক্রিয়াকরণ ও ভ্যালু অ্যাডেড ফুড প্রসেসিং; হস্তশিল্প, চামড়া ও জুতা শিল্প; ফ্রিল্যান্সিং ও ডিজিটাল সার্ভিস; পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ; নারী উদ্যোক্তার ঘরোয়া শিল্প (পোশাক, কসমেটিকস, খাদ্য)।
প্রিমিয়ার ব্যাংক এসব প্রকল্পে স্বল্পসুদের ঋণ, বিনিয়োগ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেয়ার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা রাখছে।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ ও সহায়তা বিষয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
প্রিমিয়ার এসএমই উইমেন অন্ট্রাপ্রেনিউর নামে আমাদের একটি ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম আছে, যা নারীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করে: জামানতবিহীন ঋণ স্কিম (মাত্র ৫ শতাংশ সুদে); ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় নারী উদ্যোক্তা সেল ও হেল্প ডেস্ক চালু করা হয়েছে; নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে; ই-কমার্স সংযুক্তি ও অনলাইন মার্কেট প্লেসে অ্যাকসেসের জন্য উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
আমাদের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যাংকিং সেবায় নতুন ৫০ হাজার নারী উদ্যোক্তাকে অন্তর্ভুক্ত করা।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমএসএমই উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে আপনার ব্যাংকের শাখা বা উপশাখা কীভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখছে?
প্রিমিয়ার ব্যাংকের উপশাখা, এজেন্ট আউটলেট ও এসএমই হেল্প ডেস্ক এরই মধ্যে প্রায় সবক’টি জেলায় সক্রিয়:
স্থানীয় উদ্যোক্তা চিহ্নিতকরণ ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিং; অ্যাপভিত্তিক সেবা গ্রহণ (পিমানি); প্রতিটি উপজেলায় ‘উদ্যোক্তা দিবস’ উদযাপন করে সরাসরি ব্যাংক সংযোগ।
আমরা মনে করি, বাজেটে প্রণোদনার পাশাপাশি ব্যাংকের মাঠ পর্যায়ের কর্মসূচিও উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এমএসএমই খাত একটি অপরিহার্য চালিকাশক্তি। তাই প্রিমিয়ার ব্যাংক এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের পাশে থেকে অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির পথকে আরো সুদৃঢ় করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।










