দেশে বেশ কয়েক বছর ধরে রফতানি বৈচিত্র্যায়ণের কথা হচ্ছে। এমএসএমই খাতকে এখানে কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
বাংলাদেশের রফতানি আয়ে এমএসএমই খাতের অংশগ্রহণ সম্ভাবনাময় হলেও এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেনি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আমাদের উদ্যোক্তাদের পণ্যের গুণগত মান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে। আবার আমাদের রফতানিবান্ধব নীতি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবে। এক্ষেত্রে নতুন বাজার অনুসন্ধান ও আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মে অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। আর্থিক লেনদেন ও সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহারকে আরো বিস্তৃত করতে হবে। মোবাইল মানি অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট এবং ফিনটেকভিত্তিক সেবা বিশেষ করে প্রান্তিক উদ্যোক্তাদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের অভ্যাস তৈরি করা দরকার। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি গড়ে উঠবে।
এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক ঋণ জটিলতা রয়েছে। ট্রাস্ট ব্যাংক তাদের জন্য কী করছে?
বাংলাদেশের এমএসএমই খাতের একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে, বিশেষ করে প্রান্তিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তারা। তাদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে ট্রাস্ট ব্যাংক গ্রহণ করেছে একাধিক লক্ষ্যভিত্তিক ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি বিশেষায়িত ঋণপণ্য হলো—‘ট্রাস্ট একতা’ ও ‘ট্রাস্ট বুনন’। আমাদের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট—এমএসএমই খাতের প্রতিটি উদ্যোক্তা যেন সহজ, সাশ্রয়ী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ঋণ সুবিধা পান এবং এ উদ্দেশ্যে ব্যাংক ঋণের বাইরে থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য আমরা কয়েকটি বাস্তবভিত্তিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।
এমএসএমই উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও সীমাবদ্ধতা দূরীকরণে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
এমএসএমই খাতকে এগিয়ে নিতে হলে কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং একাধিক দিক থেকে সমন্বিত ও কাঠামোগত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য। এক. অর্থায়নের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। দুই. প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিন. ই-কমার্স ও ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় এসএমই উদ্যোক্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে হবে। চার. লাইসেন্স, নিবন্ধন ও করসংক্রান্ত প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাঁচ. বাজার প্রবেশে সহায়তা এবং রফতানিমুখী সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানো জরুরি। বিশেষ করে হস্তশিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হালকা প্রকৌশল, চামড়া ও পাটভিত্তিক পণ্য—এসব খাতে দেশীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে নজর দেয়া দরকার।
এমএসএমই খাতের কোন ধরনের প্রডাক্টকে আপনার সম্ভাবনাময় বলে মনে হয়?
বর্তমান বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির প্রসার এবং কর্মসংস্থানের কাঠামো বিবেচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস ও প্রযুক্তিভিত্তিক পণ্য বাংলাদেশের এমএসএমই খাতের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হতে পারে। বিশেষ করে স্মার্ট ডিভাইস, মোবাইল অ্যাকসেসরিজ, কম্পিউটার যন্ত্রাংশ, স্মার্ট হোম গ্যাজেট এবং আইওটি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী পণ্যের আন্তর্জাতিক চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তারা এরই মধ্যে এ খাতে কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করেছেন এবং তাদের মধ্যে প্রযুক্তি গ্রহণে আগ্রহ ও সক্ষমতা ক্রমেই বাড়ছে। নীতিনির্ধারকদের উচিত তাদের এ প্রচেষ্টাকে আরো কার্যকর করা।
এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তাদের অংশগ্রহণকে সহায়তা দিতে কী করছে ট্রাস্ট ব্যাংক?
বাংলাদেশের এমএসএমই খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যাগত দিক থেকে নয়, গুণগত দিক থেকেও ক্রমবর্ধমান। দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, দারিদ্র্য হ্রাস ও টেকসই উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অপরিসীম। এ উপলব্ধি থেকেই আমাদের প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। নারী উদ্যোক্তাবান্ধব আর্থিক পণ্য চালু, ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ওয়ার্কশপ, বিজনেস কনসালটেশন ও নেটওয়ার্কিং সেশন আয়োজন, বাজার সংযোগ ও ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহারে নারী উদ্যোক্তাদের উৎসাহিতকরণ ও শাখা পর্যায়ে ‘নারী উদ্যোক্তা সহায়তা ডেস্ক’ চালু করেছি আমরা। এছাড়া ট্রাস্ট ব্যাংকের ‘নন্দিনী’ নামক বিশেষ ঋণপণ্যটি নারী ব্যবসায়ীদের জন্য এক অত্যন্ত কার্যকর আর্থিক সমাধান হিসেবে কাজ করছে, যা তাদের ব্যবসা প্রসার ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করছে।
সাধারণ এমএসএমই খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণের সুবিধা নিশ্চিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেটওয়ার্ক বিশেষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছতে কীভাবে আপনাদের উপশাখা বা শাখাগুলো ভূমিকা রাখছে?
বাংলাদেশের এমএসএমই খাতের একটি বড় অংশ গ্রামীণ ও প্রান্তিক পর্যায়ে বিস্তৃত। এ খাতের টেকসই বিকাশে মাঠপর্যায়ে কার্যকর উপস্থিতি এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই ব্যাংকিং কাঠামোর প্রথাগত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা এমন এক বিকল্প ও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলেছি, যার মাধ্যমে উপজেলার বাজারাঞ্চল ও জনবহুল এলাকাগুলোর খুব কাছাকাছি আমাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। দেশের কিছু ব্যাংক বর্তমানে উপশাখা, এসএমই ইউনিট অফিস ও স্থানীয় এসএমই হাবের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আমরাও একইভাবে এসএমই হাবভিত্তিক সেবা কাঠামো তৈরি করেছি, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের কেন্দ্রীয়ভাবে ঋণ প্রদান ও তদারকি করা হচ্ছে। আমাদের প্রতিটি শাখা ও উপশাখায় এসএমই ঋণ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দুই থেকে চারজন করে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত ক্রেডিট অফিসার কাজ করছেন। শাখাগুলো এখন শুধু আর্থিক লেনদেনের কেন্দ্র নয়, বরং উদ্যোক্তাদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে উঠছে। সার্বিকভাবে বলতে গেলে শহরকেন্দ্রিক কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে আমরা এখন উদ্যোক্তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। কারণ তারাই এ অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি। তাদের সক্ষম করে তুলতেই আমাদের এ ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।





