সাংবাদিকতা নিছক চাকরি নয়। দেশে গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, সব ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং বৈষম্য দূর করায় সাংবাদিকরা ভূমিকা রাখেন। গণমাধ্যম যদি উচ্চকণ্ঠ না থাকে, তাহলে সমাজে অনেক ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়ে। সাংবাদিকতা স্বাধীন ও শক্তিশালী না হলে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা যায় না। বাংলাদেশের সংবিধানে স্বাধীন বিচার বিভাগের পাশাপাশি স্বাধীন গণমাধ্যমকে আলাদা করে সুরক্ষা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা মামলা, নির্যাতন ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। সংবাদপত্রের অফিসে হামলা হয়েছে। গণমাধ্যমের সুরক্ষার পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার তাগিদ দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম সম্পাদক, প্রকাশক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা বলেছেন, স্বাধীন ও মুক্ত সাংবাদিকতা করতে না পারলে দেশ ও গণতন্ত্রের উন্নয়ন সম্ভব নয়। একই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে সাংবাদিক সুরক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ গণমাধ্যমে হামলা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর আক্রমণ নয়; এটি গোটা সমাজের কণ্ঠরোধের চেষ্টা।
গতকাল রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’-এ এসব কথা বলেন সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক নেতা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর সংগঠিত হামলার প্রতিবাদ এবং স্বাধীন, দায়িত্বশীল ও সাহসী সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে যৌথভাবে এ সম্মিলনের আয়োজন করে সংবাদপত্রের মালিকদের সংগঠন নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদ।
সম্মিলনে দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন সংবাদপত্রের সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক সংগঠনের নেতা, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা অংশগ্রহণ করেন। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এ সম্মিলন। এরপর সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ইতিহাস ও দেশের গণমাধ্যমের পরিস্থিতি নিয়ে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সম্পাদক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং বণিক বার্তা সম্পাদক ও প্রকাশক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের সঞ্চালনায় সম্মিলনে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর। তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকতার মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কোনো অপরাধের আকাঙ্ক্ষা হতে পারে না। এ গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে মাধ্যম হিসেবে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, সেগুলোকে অনেকেই রাষ্ট্র, সরকার, আইন কিংবা পেশিশক্তি ব্যবহার করে স্তব্ধ করে দিতে চায়। তাদের এসব প্রয়াসের বিরুদ্ধে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতেই গণমাধ্যমকর্মীদের সংঘবদ্ধতা প্রয়োজন।’
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলার বিষয়টি উল্লেখ করে নূরুল কবীর বলেন, ‘প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারে হামলা ও আগুন দেয়া কারো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়। পৃথিবীর সভ্যতা বিকাশের এ পর্যায়ে, কতগুলো সাংবাদিককে ওপরে রেখে, চারদিকে আগুন দিয়ে, দমকল বাহিনীকে বাধা দেয়ার অর্থ হচ্ছে তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলার মধ্যযুগীয় একটা বর্বরতার বহিঃপ্রকাশ।’
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান বলেন, ‘সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য থাকাটা জরুরি। যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো সময়, যেকোনো বিরোধই ক্ষতিকারক।’
সম্মিলনে পত্রিকা, অনলাইন, টেলিভিশন, সাংবাদিক ইউনিয়নের এক জায়গায় উপস্থিত হওয়ার বিষয়টিকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখেছেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘এটা বিগত ৫৫ বছর বলেন, ১৫ বছর বলেন, এ সময়ের মধ্যে এটা একটা বড় অগ্রগতি, বড় ভাবনা, বড় চিন্তা।’
প্রথম আলো সম্পাদক আরো বলেন, ‘এটা আমাদের ভাবার কোনো কারণ নেই, আগামী সরকার, নির্বাচিত সরকার আসলেই আমাদের সবকিছু আমরা পেয়ে যাব। অতীতেও হয়নি, এখনো হবে না।’
সরকারকে একমাত্র স্বাধীন সাংবাদিকতাই সত্য কথা বলে, আমলাতন্ত্র বা গোয়েন্দা সংস্থা নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। সরকারের উদ্দেশে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘সরকার, আপনি মনে রাখবেন, আপনাকে কেউ সত্য কথা বলবে না। আপনার দলীয় লোকরা বলবে না ভয়ে, আপনার সরকারের ব্যুরোক্রেসি (আমলাতন্ত্র) বা ইন্টেলিজেন্স কমিউনিটি (গোয়েন্দা সংস্থা) বলবে না। তারা সবসময় আপনাকে প্রশংসার জগতে আবদ্ধ রাখবে। স্বাধীন সাংবাদিকতা হচ্ছে একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যারা আপনাকে সত্য কথা বলবে।’
জুলাই অভ্যুত্থানের ফলে গণতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠার সুযোগ এসেছে উল্লেখ করে মাহফুজ আনাম বলেন, ‘একইভাবে সাংবাদিকতারও একটা নতুন গণতান্ত্রিক, বলিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ এথিক্যাল জার্নালিজম বা নৈতিক সাংবাদিকতা করার সময় এসেছে। আসুন, আমরা সবাই মিলে এ পেশাকে আরো বেশি জনগণের কাছে নিয়ে যাই।’
যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান বলেন, ‘সাংবাদিকতা শুধু চাকরি নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব, যেখানে স্বাধীনতা বজায় রাখতে হলে আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্বনির্ভরতা অর্জন করতে হবে।’
সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সাংবাদিকতা এখনো বাংলাদেশে পূর্ণ মর্যাদার পেশা হয়ে ওঠেনি। তবে এ মর্যাদা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সাংবাদিকদেরই। সেজন্য তিনি পত্রিকার জন্য একটি স্ট্যান্ডার্ড কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন, যা সম্পাদনা ও পেশাগত নীতিমালার মান নির্ধারণ করবে।
জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ বলেন, ‘জুলাই চেতনার নামে সহিংসতা, মধ্যরাতে পত্রিকা অফিসে হামলা, অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনা নজিরবিহীন এবং দেশের জন্য কলঙ্কজনক। এসব ঘটনায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে জুলাই চেতনাকে সম্মান জানিয়ে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে এগিয়ে নিতে হবে। এ চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক দল বা সরকারের নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্ব।’
চট্টগ্রামভিত্তিক দৈনিক আজাদীর সম্পাদক এমএ মালেক বলেছেন, ‘প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে তথ্যের শূন্যস্থান তৈরি হয়। আর এ শূন্যস্থান দখল করে নেয় ফেক নিউজ বা ভুয়া সংবাদ, যা মানুষকে বিভ্রান্ত করে, সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। এ পরিস্থিতি কখনো মঙ্গল বয়ে আনে না, কখনো আনেনি।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যারা আজ এখানে সমবেত হয়েছি, আমরা কারো বিরুদ্ধে নই। আমরা শুধু সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার পথটা মুক্ত রাখার আহ্বান জানাতে এসেছি।’
বাংলাদেশে সুস্থ, পেশাদারত্বসম্পন্ন গণমাধ্যম থাকলে জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করেন ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রকাশক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর। তিনি বলেন, ‘আমি আপনার সাথে একমত নাও হতে পারি; কিন্তু আপনি আমার বা আরেকজনের সম্পর্কে যা বলছেন, তা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি লড়ব আপনার পক্ষে। এ চিন্তা ও মন-মানসিকতা আমাদের তৈরি করতে হবে। আমরা যারা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা যারা বাংলাদেশে ব্যবসা করি তারা চাই যে বাংলাদেশে একটা সুস্থ, পেশাদারত্বসম্পন্ন গণমাধ্যম কাজ করুক। এটা হলেই জবাবদিহি বাড়বে।’
সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ। তিনি বলেছেন, ‘আমরা আমাদের জন্য যেমন দায়িত্ব পালন করব নিজেদের সুরক্ষার জন্য...এ সরকার চলে যাবে, নতুন যে দল আসবে, রাজনৈতিক দল যে দলই হোক, সেটা জাতীয় সরকার হোক বা একক সরকার হোক, আমরা তাদের কাছ থেকেও সেই সুরক্ষা আদায়ের জন্য সংগ্রামটা চালিয়ে যাব।’
সামনের দিনে বাংলাদেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য ঐক্যের খুব প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক করতোয়া পত্রিকার সম্পাদক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, ‘মালিক, সম্পাদক, সাংবাদিক—সবাই যদি ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তাহলে সংবাদপত্রের ভূমিকা, সাংবাদিকদের উন্নয়ন ও সংবাদপত্রের উন্নয়ন সম্ভব।’
কোনো সরকারই স্বাধীন গণমাধ্যম দেখতে চায় না বলে মন্তব্য করেন ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) সভাপতি ও মাছরাঙা টিভির প্রধান সম্পাদক রেজওয়ানুল হক। তিনি বলেন, ‘কোনো সরকারই আসলে স্বাধীন সাংবাদিকতা বা স্বাধীন মিডিয়া দেখতে চায় না। অতীত অভিজ্ঞতা তা-ই বলে। তবে দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক বিষয় হচ্ছে, বর্তমান সরকার যারা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বা নতুন রাষ্ট্রের সংস্কারের কথা বলে ক্ষমতায় আছে, তারাও এ কাজটা করতে পারল না। তারা গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন গঠন করল, কিন্তু সে সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন ফেলে রেখেছে।’
ঢাকা ট্রিবিউন সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘সাংবাদিক ও সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় ধরেই কোনো না কোনোভাবে ভুক্তভোগী। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শুরুতেই স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা এল। চব্বিশের ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে এ সরকারের অনেক কাজ করার সুযোগ ছিল। কিন্তু তারা সেটা করেনি।’
স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে না পারলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন নোয়াব সভাপতি এবং সমকালের প্রকাশক এ কে আজাদ। সম্মিলনে প্রদর্শিত ডকুমেন্টারিতে দেয়া বক্তব্যে এ কে আজাদ বলেন, ‘সরকার যেকোনো সময় ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সুইচ অফ করে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে এটা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন ধরনের নিবর্তনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। যেমন তথ্য মন্ত্রণালয় আমাদের সরকারি বিজ্ঞাপন কমিয়ে দেয়। এছাড়া অতীতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে বিজ্ঞাপন না দেয়, তার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি কোন সংবাদ যাবে, কোন সংবাদ যাবে না তার জন্য গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘সরকার যদি গণমাধ্যমের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করে তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। স্বাধীন সাংবাদিকতা করতে না পারলে দেশের উন্নয়নও সম্ভব নয়।’
গণমাধ্যম সম্মিলনের মঞ্চে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘আজকে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ঐক্যের। সাংবাদিকরাই সাংবাদিকতাকে বাঁচাতে পারে। আমাদের বাঁচার একমাত্র পথ সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া, এক শামিয়ানার তলে সমবেত হওয়া।’
আমার দেশের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আবদাল আহমেদ বলেন, ‘আমাদের ঐক্য থাকলে গণমাধ্যমের ওপর সাম্প্রতিক হামলা হতো না। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যদ্দূর জেনেছি তথ্য মন্ত্রণালয় এখানে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
সাংবাদিক সম্মিলনে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ‘সাংবাদিকতা পেশাটি অভ্যন্তরীণভাবে ও নানানভাবে ঘুণে জর্জরিত হয়েছে। এখন বাইরের আক্রমণের সামনে এসে আমরা বুঝতে পারছি যে আমাদের দুদিকেই পুনর্গঠন ও পুনরুজ্জীবন দরকার।’
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘গণমাধ্যমের বিরোধিতা শুরু থেকে ছিল, এখনো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। এটি সত্য। এ বিরোধিতা থেকে আমরা মুক্ত হতে পারব না কোনোদিনই। কিন্তু আমরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে যারা ছোটখাটো অজুহাতে গণমাধ্যমের ওপর হামলা করে, সে সাহস আর তারা করবে না।’
বাংলাদেশ নারী সাংবাদিক কেন্দ্রের সহসভাপতি মুনিমা সুলতানা বলেন, ‘সাংবাদিকতায় পেশাদারত্ব বজায় রাখা ও রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে বের হয়ে আসার কথা বলা হয়। তবে সবকিছুর মূলেই আমাদের নিজেদের দেখার বিষয়টা অনুপস্থিত। গণমাধ্যম সংস্কার প্রতিবেদন হয়েছে, কিন্তু আমরা বসে আছি সরকার তা করে দেবে। গণমাধ্যমের নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের কি দরকার নেই এ বিষয়গুলো দেখার?’
রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক যুগের আলো পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশক মমতাজ শিরীন ভরসা বলেন, ‘সরকার ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদরা অনেক সময় আমাদের দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়। সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ রাখতে হবে।’
দৈনিক সিলেট মিররের সম্পাদক আহমেদ নূর বলেন, ‘আঞ্চলিক কাগজের সম্ভাবনা অনেক। তবে মফস্বলের সবাই সবসময় একটা ভয়ের মধ্যে থাকে। এ ভয় অতীতেও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু আমরা যখন নতুন বাংলাদেশ ও নয়া বন্দোবস্তের কথা বলছি, তখন ভয়ের মধ্যে থাকাটা আরো ভীতিকর। আমরা সবসময় স্বাধীনভাবে লিখতে ও কাজ করতে চাই। সেজন্য আমাদের ঐক্য বজায় রাখতে হবে।’
যশোর সংবাদপত্র পরিষদের সভাপতি এবং স্থানীয় দৈনিক কল্যাণের সম্পাদক ও প্রকাশক একরাম-উদ-দৌলা বলেন, ‘আজকে দীর্ঘদিন পরে আমরা একটি ঐক্যের সম্মেলনে এসে পৌঁছেছি। অতীতে আমরা হামলা-মামলার শিকার হয়েছি। যশোরে দুজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে আজও বিচার পায়নি। কারণ আমাদের ভেতরে অনৈক্য। সুতরাং ভয়হীন, বাধাহীন ও মামলাবিহীনভাবে যদি আমরা সাংবাদিকতা করতে চাই তাহলে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
লক্ষ্মীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি আ হ ম মোশতাকুর রহমান বলেন, ‘মব ভায়োলেন্সের পর আমাদের ঐক্যের যে উপলব্ধি হয়েছে, তা আদৌ অর্জন করতে পারব কিনা, প্রশ্ন থেকে যায়। অন্তত সাংবাদিকদের নির্যাতন ও সমস্যার বিষয়ে কখনো মতাদর্শ লালন করা উচিত নয়। জাতীয় পর্যায় থেকে এ কাজটা করতে পারলে আমরা সফল হব বলে আশাবাদী। এছাড়া মফস্বল সাংবাদিক নানা সমস্যায় জর্জরিত। সে বিষয়গুলোও দেখা দরকার।’
গাজীপুরের শ্রীপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহফুল হাসান হান্নান বলেন, ‘ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। আরেকটি কথা হলো অধিকার কেউ কাউকে বিলিয়ে দেয় না; আদায় করে নিতে হয়। আমাদের অধিকার আমাদেরই আদায় করে নিতে হবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কালের কণ্ঠের আঞ্চলিক প্রতিনিধি গৌরাঙ্গ দেবনাথ অপু বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকার বাইরে সাংবাদিকতা করি তারা ২৪ ঘণ্টা একটি অনিরাপদ পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছি।’
সম্মিলনে সম্পাদকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সংবাদের আলতামাশ কবির, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ইনাম আহমেদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের আবু তাহের, চর্চার সোহরাব হাসান, সমকালের শাহেদ মুহাম্মদ আলী, দেশ রূপান্তরের কামাল উদ্দিন সবুজ, আজকের পত্রিকার কামরুল হাসান, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের শামসুল হক জাহিদ, ডেইলি সানের রেজাউল করিম, কালবেলার সন্তোষ শর্মা, ঢাকা স্ট্রিমের গোলাম ইফতেখার মাহমুদ, সুপ্রভাত বাংলাদেশের রুশো মাহমুদ, বাংলাদেশ টাইমসের জসিম আহমেদ ও ইলিয়াস খান, গ্রামের কাগজের মবিনুল ইসলাম, যুগের চিন্তার মোরছালিন বাবলা, ইউএনবির মাহফুজুর রহমান। উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক শাহরিয়ার করিম।
বিশিষ্ট সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এমএ আজিজ, সাজ্জাদ শরিফ, আনিসুল হক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূইয়া, দৌলত আক্তার মালা, মামুন আব্দুল্লাহ, বিবিসির কাদির কল্লোল, উদিসা ইসলাম, রুমা পাল, মির্জা মেহেদি তমাল, শেখ সাবিহা আলম, তাসনীম খলিল, হারুনুর রশীদ, জুলহাস আলম, মিরাজ আহম্মেদ চৌধুরী কদরউদ্দিন শিশির।
গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও কলাম লেখকদের মধ্যে ছিলেন আলতাফ পারভেজ, মানজুর আলম মতিন, অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর ও হাসিবুর রহমান। টেলিভিশন চ্যানেলের শীর্ষ সাংবাদিকদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল হাই সিদ্দিকী, জহিরুল আলম, ফাহিম আহমেদ ও জাহিদ নেওয়াজ জুয়েল।
সম্মিলনে সমাপনী বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর বলেন, ‘সাংবাদিকতার মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে কিছু কথা এসেছে। এগুলোর বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠন, সহকর্মী ও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কাজ করে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করব। ভবিষ্যতে এ যোগাযোগগুলো আরো বাড়বে। আঞ্চলিক পর্যায়েও আরো কিছু সভা-সম্মেলন করার চিন্তা করছি আমরা। শুধু সংবাদমাধ্যম বা সম্পাদকের নয়, সংবাদকর্মীদের আচরণবিধি ও যোগ্যতা নিয়েও আমরা কাজ করার চেষ্টা করছি।’
সম্মিলন আয়োজনের উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘মুক্ত গণতান্ত্রিক সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে যারা আছে, তাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বার্তা দেয়ার উদ্দেশ্য নিয়েই আজকের এ সম্মিলন আয়োজন করা হয়েছে। আমাদের গণতান্ত্রিক সাংবিধানিকতার প্রতিপক্ষ, সামাজিক শক্তিগুলো ও রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি এ বার্তা না পেয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই শুধু ঘরের ভেতর সেমিনার কিংবা সম্মেলনের মধ্যে আমরা আটকে থাকব না।’










