বাংলাদেশের প্রয়াত প্রবীণ রাজনীতিবিদ এম সাইফুর রহমানের স্মৃতি বহুবিধভাবে স্মরণ করা যায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিপ্রণেতা এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের একজন অগ্রপথিক হিসেবে তিনি সর্বদাই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে যেসব কৃতবিদ্য পেশাজীবী ও সফল রাজনীতিবিদের উত্তরণ হয়েছে, তাদের মধ্যে সাইফুর রহমানের নাম সর্বাগ্রে গণ্য হবে। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শুরুর দিনগুলোয়‌ রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর শক্তিশালী ভিত তৈরি করে নিয়মতান্ত্রিক হিসাব ব্যবস্থার ওপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে একজন হিসাববিদ হিসেবে বড় ধরনের অবদান রেখেছেন তিনি।

এরপর জিয়াউর রহমানের আহ্বানে তিনি রাজনীতিতে এলেন এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিলেন। সে দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতে তার তুলনা হয়ে থাকবেন কেবল তিনিই। বাংলাদেশে তার ব্যক্তিগত উদারনৈতিক রাজনীতি চিন্তার সঙ্গে তিনি একটি উদারনৈতিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনাকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন। বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের শিথিলীকরণ, রাষ্ট্রের ভূমিকার জায়গায় বাজার ব্যবস্থার যে আবির্ভাব সেটা তার হাত ধরেই হয়েছে। শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার উদারীকরণ নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তার অবদান আছে।

তিনি ২০০১ সালে যখন তৃতীয়বার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন, তখন ২০০২ সালের দিকে টাকার নমনীয় বিনিময় হার প্রচলনের উদ্যোগ নেন। তখন আমাদের মতো অর্থনীতিবিদরা অনেকেই কিন্তু সংশয় প্রকাশ করেছিল যে এর জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত কিনা কিংবা এতে আমাদের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে কিনা। কিন্তু সেবারও নিজের নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞার প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন তিনি। আমরা আজকে সফলভাবে সেটি প্রয়োগ করতে পেরেছি।

সাইফুর রহমানের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও কিছু কথা বলতে হয়। তার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক ছিল, সেটা নিঃসন্দেহে অম্লমধুর। আমি যখন তার বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করেছি, সেটায় তিনি বিরক্ত হয়েছেন নিঃসন্দেহে কিন্তু ব্যক্তিগত আচরণের ক্ষেত্রে তাকে বিচলিত হতে দেখিনি। অনেক সময় তিনি আমার সমালোচনা পড়ে রাস্তায় গাড়ি থেকেই ফোন করেছেন। ফোন করে বুঝতে চেয়েছেন, কেন আমি এগুলো বলেছি।

সরকারি তথ্য-উপাত্তের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের যে সংশয় ছিল, তা এখনো আছে। আমার মনে আছে, তিনি একবার সিপিডিসহ আমাদের সবাইকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর ফখরুদ্দীন সাহেব এবং বিবিএসের লোকজনকে ডেকে আমরা যেসব সমালোচনা করছি, সেগুলোকে বিবেচনায় নেয়ার জন্য তাদের প্রতি নির্দেশ, উপদেশ ও পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। সেখানেও আমরা লক্ষ করেছি, সরকারের বাইরে যেসব নীতি বিশেষজ্ঞরা থাকেন, বিশ্লেষকরা যারা মন্তব্য করেন তাদের শত্রু মনে না করে সহায়ক শক্তি হিসেবে দেখার প্রজ্ঞা ও উদার মনোভাবের প্রতিভূ ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস যতদিন লেখা হবে, সাইফুর রহমানের নাম নীতি সংস্কারক, একজন উদার রাজনীতিবিদ ও মানবতাবাদী ব্যক্তি হিসেবে আমরা সর্বদাই স্মরণ রাখব।

তার সঙ্গে আমার একটা মজার স্মৃতি আছে। সে সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ছিল এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমালোচনা আমরা করছি। হঠাৎ করে সাংবাদিকরা এসে বললেন, আপনি তো বলছেন মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কিন্তু অর্থমন্ত্রী বলছেন মূল্যস্ফীতি কমে গেছে। আমি ভালো করে আবার তথ্য-উপাত্ত মিলিয়ে দেখলাম যে ১২ মাসের গড়ে বেড়েছে কিন্তু এক বছরের সঙ্গে আরেক বছরের ওই এক মাসের তুলনা করলে মূল্যস্ফীতি কমেছে। তিনি তার প্রজ্ঞা দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে যেটা কমেছে সেটাই বলেছেন, আর যেটা বেড়েছে সেটা আমি বলেছি।

পরের মাসে যখন আবার মূল্যস্ফীতি হলো, আমি ভাবলাম, তিনি যেহেতু বলেছেন মাসের সঙ্গে মাসের তুলনা, তাহলে এবার আমি এটা ব্যবহার করি। করে আমি বললাম, তিনি গতবার যে হিসাবটা বলেছিলেন, সেটার হিসাবে এবার বেড়ে গেছে। সাংবাদিকরা বললেন, অর্থমন্ত্রী তো বলেছেন, কমেছে। এবার দেখি, গড় ১২ মাসেরটা কমেছিল, তিনি সেটা বলেছেন।

এটা হলো মিথ্যা না বলে এমন একটা ব্যাখ্যা দেয়া যেটা আপনার রাজনীতির পক্ষে যায়! আর আমাদের মতো মানুষের দায়িত্ব থাকে, সে ফাঁদে না পড়া।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য: সম্মাননীয় ফেলো, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)