বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের পথিকৃৎ ছিলেন এম সাইফুর রহমান ছিলেন। আমার বিবেচনায় তিনি দেশের সবচেয়ে সফল অর্থমন্ত্রী। তার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আমি যখন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে দেশে ফিরেছি। তখন এনবিআরে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে কাজ করতাম, বলা যায় সিনিয়র সহকারী সচিব। আমি তখন খুব নিচু পর্যায়ের কর্মকর্তা। সে সময় আমাদের চেয়ারম্যান ছিলেন ড. একরাম হোসেন। তিনি আমাকে একদিন বললেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের ওখানে একটা সভা হবে, তুমিও আমার সঙ্গে চলো।’ তিনি আমাকে ফাইল দিলেন। তখন এক্সটেন্ডেড স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটি নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে আমাদের একটা দর কষাকষি হচ্ছিল। তো এখনো যেমন হয়—আইএমএফ বলে, কর-রাজস্ব বাড়াতে হবে। তো এটার পরিপ্রেক্ষিতে সবাই বলল যে করহার বাড়াতে হবে। যদিও আমার বলার কথা না, তবু এক পর্যায়ে আমি মুখ ফসকে বলে ফেললাম, ‘এটা তো এত সহজ না। করহার বাড়ালে যে রাজস্ব বাড়বে, এমন তো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এটা তো নির্ভর করে ট্যাক্স ইলাস্টিসিটির ওপর এবং পণ্যটা কি নিত্যপ্রয়োজনীয় নাকি বিলাসপণ্য এসব বিষয়ের ওপর।’ আমি জুনিয়র অফিসার বলে আমাকে সবাই থামিয়ে দিল। তারপর আমিও ভাবলাম, ‘মন্ত্রীর সামনে কথাটা বললাম, এটা কি ঠিক হলো?’ কতক্ষণ পরে দেখলাম, সাইফুর রহমান সাহেব এনবিআরের চেয়ারম্যানকে সিলেটের ভাষায় জিজ্ঞাসা করছেন, ‘এই ছেলেটা কে?’ তখন নুরুল হোসেন খান সাহেব বললেন, ‘ও আমাদের সেকেন্ড সেক্রেটারি। সম্প্রতি পিএইচডি করে এসেছে।’

এরপর সাইফুর রহমানের সঙ্গে আরো অনেকবার দেখা হয় আমার। আমি ওই প্রথমবারের শিক্ষা থেকে মুখ ফুটে কিছু বলি না। উল্টো উনি আমাকে জিজ্ঞাস করেন, ‘তুমি কী বলো?’ তখন আমি আমার মত দিতাম।

যা-ই হোক, করহার তখন বাড়াতে হবে। আইএমএফের সঙ্গে আমাদের আলোচনা হলো। তখন আইএমএফ আমাদের বলেছিল, ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হাফ আ পার্সেন্টেজ বাড়াতে হবে এবং সর্বোচ্চ করহার বা শুল্ক ৭৫ শতাংশে আনতে হবে। তখন দুদিন ধরে আমি এক্সারসাইজ করলাম। তখন লোটাস ওয়ান, টু, থ্রি বলে একটা স্প্রেডশিট ছিল, সেটা দিয়ে কাজ করে আমি দেখলাম, এ দুটো টার্গেট অসংগতিপূর্ণ। আমি সর্বোচ্চ শুল্কহার যদি ৭৫ শতাংশ করি তাহলে ৫ শতাংশ জিডিপি বাড়ানো যায় না। আবার আমি যদি ৫ শতাংশ জিডিপি বাড়াই তাহলে সর্বোচ্চ শুল্কহার ৭৫ শতাংশ রাখা যাবে না। আমি এক্সারসাইজটা করে ভাবলাম যে মন্ত্রী মহোদয়কে জানাই। এর মধ্যেই আমার চেয়ারম্যান আমাকে জানালেন, মন্ত্রী আমাকে ডেকেছেন। আমি কাগজপত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিলাম তাকে বলার জন্য। কিন্তু যাওয়ার পরই তিনি বললেন, ‘আচ্ছা শোনো ফাওজুল, সর্বোচ্চ শুল্কহার ৭৫ করা যাবে না, ওটা ১০০ শতাংশ করতে হবে।’ আমি অবাক হলাম যে এ তো ভয়ানক ওস্তাদ লোক! আমি দুদিন ধরে সারা রাত-দিন খেটে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে এটা বের করেছি, আর তিনি তো একদম মাথা থেকে বলে দিলেন!

আমি অনেক মন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছি, কিন্তু সাইফুর রহমান সাহেবের একটা ‘গাটস’ ছিল। যেকোনো বিষয় তিনি খুব দ্রুত ধরতে পারতেন। তিনি আসলেই সবকিছু খুব দ্রুত বুঝতে পারতেন। আমি এ রকম অর্থমন্ত্রী কোনো সময় দেখিনি।

তারপর আমরা সাইফুর রহমানের নেতৃত্বে ট্যাক্স রিফর্ম করলাম, বাজার উদারীকরণ করলাম। আজকে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক গতিশীলতা, তিনিই এটার সূত্রপাত করেছেন। না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি কোনো অবস্থায়ই এতদূর এগোতে পারত না।

এরপর আমি এনবিআর ছেড়ে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডে চলে যাই। তখন আমরা সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি নিই। এ সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির সাফল্যের পেছনেও কিন্তু তার অবদান আছে। তাকে আমি একদিন বললাম, স্যার, আমরা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প করছি, আপনি একটু দেখেন, আমরা উৎসাহ পাব। আমরা রাজনগর অর্থাৎ স্যারের নির্বাচনী এলাকায়ই সেটা দেখালাম। তিনি খুবই প্রশংসা করলেন। কয়টা সোলার লাইট তার বাগানবাড়ি ও বাড়িতে লাগিয়ে দিতে বললেন। আমরা লাগালাম। তারপর তিনি সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় বললেন, ‘তোমরা যে এগুলা লাগিয়ে দিলে, টাকা তো নিলে না।’

তিনি জীবনে একবার আমাকে বকা দিয়েছিলেন। তিনি সবাইকেই বকাঝকা করতেন, খুব স্পষ্টভাষী ছিলেন। এনবিআরে থাকাকালীন আমি সিঙ্গাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার একটা চাকরি পাই। সাইফুর রহমান স্যারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুবাদে একদিন এক জায়গায় কথা প্রসঙ্গে তিনি এটা জানতে পারেন। তারপর সিলেটের ভাষায়ই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই শোনো তুমি কোন সনে আইছ?’ আমি জানালাম, আমি ’৮৯-এ এসেছি। তিনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কোন সন? আমি বললাম, ’৯১। উনি ভয়ানক রেগে গেলেন এবং খাস সিলেটের ভাষায় বললেন, ‘‌গভর্নমেন্টকে কি একটা টি স্টল পাইছনি, একবেলা চা খাইয়া যাইবা গিয়া?’ তারপর আমার চেয়ারম্যানকে বললেন, আমাকে যেন ওনার কাছে আর না নেন।

তারপর আমার অনেক দিন মন খারাপ ছিল। মনমরা হয়ে বাজেটের কাজ করতাম। বাজেট হয়ে গেল। এর মধ্যে একদিন তার পিএস জানাল, মন্ত্রী আমাকে ডেকেছেন। আমি সাধারণত সচিবদের সঙ্গে যেতাম, তাই সচিবকে জানালাম যে অর্থমন্ত্রী মহোদয় ডেকেছেন। তিনি বললেন, আমাকে তো ডাকেনি, তোমাকে ডেকেছে, তুমি যাও। তারপর আমি গেলাম। আমাকে তিনি বললেন, সিঙ্গাপুরের শিক্ষকতা বাদ দিতে, তিনি আমাকে ওয়াশিংটনে পাঠাবেন ইকোনমিক মিনিস্টার করে। আমি বললাম, স্যার সিঙ্গাপুরে বেতন অনেক বেশি। তাহলে আমার একটা সঞ্চয়ও থাকবে। নাসিমুদ্দীন সাহেব আবার এর মধ্যে বলেছিলেন, আমার ফাইল পিএসের কাছে দিয়ে রাখতে। আমি ফাইলটা দিয়ে রাখছিলাম। এবং ধরে নিয়েছিলাম এটা কখনো অনুমোদন হবে না। কারণ উনি তো আমার যাওয়ার ভাবনাটা তখন পছন্দ করেননি। তখন সরকারি হিসেবে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে যাওয়ার নজির নাই। তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে অনুমোদন নিয়ে এসেছিলেন।

আমাদের সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচি সফল হওয়ার অন্যতম কারণ ছিল, সবাই জানত এটার পেছনে অর্থমন্ত্রী আছেন। আমরা ৪৫ লাখ সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয় লাগাতে পেরেছিলাম।

সাইফুর রহমান খুব অতিথিপরায়ণ ছিলেন। আমরা তো তাকে খুব ভয় করতাম। দোয়া-দরুদ পড়ে তার রুমে ঢুকতাম যে কী না কী বলেন আবার! বাজেটের আলোচনার সময় তিনি নিজেই আমাকে মৌলভীবাজার যেতে বললেন। আমি গেলাম। রাতের খাবার বা দুপুরে খাওয়ার সময় তিনি ‘এটা আমার গাছের আদা, এটা আমার গাছের এলাচি, এটা অমুক হাওরের মাছ’ এসব বলে বলে পাতে খাবার তুলে দিতেন। খুবই স্নেহ করতেন আমাদের।

হাইল হাওরে ওনার আরেকটা বাগানবাড়ি ছিল। সেখানে আমরা গিয়েছিলাম। শীতকাল ছিল, তিনি নিজের হাঁসের ডিম সেদ্ধ করে খাইয়েছিলেন। আমি তার প্রায় সব বৈশিষ্ট্য দেখেছি—ব্রাইটনেস, শার্প, নেভার এইজড মাইন্ড যাকে বলে, স্পষ্টবাদিতা। এ রকম একজনের সঙ্গে কাজ করতে পারা পরম সৌভাগ্যের। তারপর অনেক মন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেছি, কিন্তু তার মতো মেধাবী কাউকে আমি অন্তত পাইনি।

সাইফুর রহমানের অবদান নিয়ে বলতে গেলে প্রথমেই আসে দেশের ক্লোজ ইকোনমিকে তার নেতৃত্বে আমরা ভেঙেছি। সে সময় তার পুরো দল একদিকে আর তিনি আরেকদিকে ছিলেন। তারপর আমরা অনেক কিছু রিফর্ম করেছি। তখন তিনি বললেন, ট্যাক্স নিয়ে তো অনেক কিছু করলাম, এখন গরিব মানুষের জন্য কিছু করা দরকার। সেই জায়গা থেকে তিনি সামাজিক নিরাপত্তার কাজ শুরু করেন। তবে এটাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন পরবর্তী অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া। সামাজিক নিরাপত্তার বীজটা সাইফুর রহমান রোপণ করেছিলেন।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান: উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়