সাইফুর রহমান আমার কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। তার সঙ্গে অর্থ সচিব হিসেবে কাজ করেছি প্রায় পাঁচ বছর। এছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়ে থাকাকালে এবং বিশ্বব্যাংকে কাজ করার সময়ও তার সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল গভীর। সাইফুর রহমান সম্পর্কে বলতে গেলে দুই-তিনটা বিষয় আলাদা করে বলতে হয়। প্রথমত, সাইফুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্বান ও পেশাদার মানুষের একজন। সরকারের বিভিন্ন কাজে তার ছিল ব্যাপক অভিজ্ঞতা। তার ব্যক্তিত্ব মূলত এ দুটো বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। রাজনৈতিক জীবনে ও সরকারে দায়িত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রী হিসেবে বহাল থাকা অবস্থায় তার যত অর্জন, তার ভিত্তি এর ওপরই। তার মতো অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি বাংলাদেশে খুব বেশি ছিল না। অভিজ্ঞতা বলতে আমি একাডেমিক ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার কথা বলব। প্রতিটি মন্ত্রণালয়, দেশের সরকার কীভাবে চলে, কোনটা করলে বাংলাদেশের জন্য ভালো সে বিষয়ে তার পেশাদারত্ব গভীর। তিনি নিজে একজন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছিলেন, প্রথিতযশা ছাত্র ছিলেন।

যেকোনো মন্ত্রণালয় সম্পর্কে সাইফুর রহমান সাহেব যা জানতেন, তা হয়তো ওই মন্ত্রণালয়ের অনেকেই জানত না।

সরকার কীভাবে চলে কিংবা কীভাবে চলা উচিত, মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কেমন হওয়া উচিত; এসব বিষয়ে তার সম্যক ধারণা ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল তার দূরদর্শিতা। দেশের ও জনগণের ভবিষ্যৎ ও দেশের স্বার্থকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে দেখতেন না। তিনি আজকে যেটা চিন্তা করতেন, সেটা দীর্ঘমেয়াদে কী প্রভাব ফেলবে, তা নজরে রাখতেন। তিনি সত্যিকার অর্থেই একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন।

উন্নয়ন বলতে তিনি শুধু অবকাঠামো, রাস্তাঘাট ও ভবন নির্মাণ বুঝতেন না। বরং উন্নয়ন বলতে তিনি মানবসম্পদের উন্নয়ন বুঝতেন। এজন্য শিক্ষা খাতের বাজেটে এবং বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক কিছু করে গেছেন। বিশেষ করে নারী শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন করেছেন সত্য, তবে আপাতত কাজে আসবে না, এমন কোনো মেগাপ্রজেক্ট হাতে নেয়ার বিষয়ে তিনি সংযত থাকতেন।

অনেকের ধারণা তিনি অনেক রাশভারী। অথচ সাইফুর রহমানের ব্যক্তি হিসেবে চরিত্র ছিল অন্যরকম। সেটা যারা মিশেছেন তারা জানেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি খুবই সদালাপী মানুষ ছিলেন। মানুষকে তিনি ভালোবাসতেন। আমি দেখেছি কোনো অফিসার সম্পর্কে তিনি খারাপ কথা বলেননি। আগের আমলে যখন তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তখন সাক্ষী দিতে ওনার সঙ্গে কাজ করা অনেকেই গিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও তিনি মন খারাপ করেননি।

দেশকে বর্তমান অবস্থায় আনতে সাইফুর রহমানের অবদান কী, এটা অনেকেই হয়তো দেখেন না। তিনি দেশের জন্য যেটা করেছিলেন, যেটা ভারতের জন্য মনমোহন সিংও প্রথম দিকে করতে পারেননি। ১৯৯১ সালে ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) সূচনা করেন তিনি। ভ্যাট শুরু করার পর দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়ল। উন্নয়ন খরচের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আমরা নিজেরাই সংস্থান করতে সক্ষম হই। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে বিরাট পরিবর্তন আনেন। ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্সের কথা উঠলেই মানুষ সাইফুর রহমানের কথা স্মরণ করেন। কোনো দেশেই এটা সহজে হয়নি। এটা যখন হয়, তখন মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা ও নীতিনির্ধারকরাও বিরোধিতা করেছিলেন। সংসদে এটা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু একা হাতে তিনি করেছেন। এটা সূচনা হওয়ার পর সবাই দেখল ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। সাইফুর রহমানের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত। এ কারণেই সবাই এটাকে মেনে নিয়েছে। তিনি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে এটা অসম্ভব ছিল। পরে অবশ্য সবাই এটার প্রশংসা করেছে। দেশ-বিদেশে সব জায়গায় এ উদ্যোগ সমাদৃত হয়েছে।

এছাড়া সাইফুর রহমান রাজস্ব প্রশাসনে নতুন নতুন অনেক প্রকল্প নিয়েছিলেন। আমরা এখন স্বয়ংক্রিয়করণ ও ডিজিটাইজেশনের কথা বলি, এগুলো শুরু হয়েছে সাইফুর রহমানের সময়ই। সংস্কার হয়েছে সরকারি ব্যয়ের পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও। বাজেট প্রণয়ন, বাজেট বক্তৃতা, বাজেট তৈরি, ব্যয়ের অগ্রাধিকার নির্ধারণ, আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এমন অনেক কিছুরই উদ্যোক্তা ছিলেন সাইফুর রহমান।

ওনার সবসময় মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন। এ উন্নয়নের জন্য যেটা দরকার সেটা হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাজায় রাখা। আমি কোথা থেকে টাকা আনছি এবং কোথায় টাকা খরচ করছি। কত ধার করছি এটার ওপর নির্ভর করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। সাইফুর রহমান সাহেব সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা যেভাবে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলেন, সেটায় অনেক কষ্ট হয়েছিল তার। আমি তখন তার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছি। এখন আমরা শুনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভালো অবস্থায় নেই। এ পর্যায়ে যাওয়ার আগেই তিনি এগুলো ধরে ফেলতেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল তার কাছে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধার করে টাকা এনে খরচ করব, কিন্তু ধার ফেরত দেব কীভাবে সেটা চিন্তা করব না, এটা উনি কোনোদিন করেননি। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এটা ছিল সাইফুর রহমানের সবচেয়ে বড় সাফল্য।

প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে যখনই যা করতেন কিন্তু ওনার সামষ্টিক অর্থনীতি ঠিক রাখতেন। কারণ এটা যদি নষ্ট হয় সবকিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। এটা কোনোদিন হতে দেননি। আমার মনে হয় এ রকম সাকসেসফুল ঘটনা সব দেশে নেই। ওই সময় তিনি রাজনৈতিকভাবেও প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন, এটা আমরা সবাই জানি। প্রধানমন্ত্রীসহ ওনার কথার মূল্য সবাই দিতেন।

সাইফুর রহমান সাহেব আগে দেশের স্বার্থ দেখতেন। এটা নিয়ে শুধু দেশে নয়, বিদেশেও তাকে ঝগড়া করতে দেখেছি। আমি বলব তিনি দাতাদের কাছে সবসময় অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। বিদেশে স্পেশালি ওনাকে ফোকাস করা হতো। উনি যেখানে যেতেন সেখানে আমাদের উন্নয়নে যা দরকার তা করতেন।

সাইফুর রহমানের সবকিছু পড়ার দরকার ছিল না। তিনি অফিসে ঢুকলেই বলতে পারবেন এ অফিস কেমন চলে। তার সঙ্গে কাজ করাটা আমার জন্য একটা চমৎকার সুযোগ ছিল। অনেক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা ওনার কাছ থেকে পেয়েছি। অনেক জটিল জিনিস তিনি ভালো বুঝতেন।

রাজনৈতিকভাবে আমরা দেখি কোনো সরকার কোনো কাজ করলে এর পরের সরকার সেটা অব্যাহত রাখতে চায় না, কিন্তু সাইফুর রহমান এমন ছিলেন না। আওয়ামী লীগের আমলে তখন সোশ্যাল সেফটিনেটের প্রোগ্রাম চালু ছিল। যেমন বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, যা এখনো আছে। তখন আমি দেখলাম এগুলো কেমন চলছে, কারণ এগুলো আমাকে ডিফেন্ড করতে হবে। অ্যাসেসমেন্টের পর আমি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে উনি বললেন এখানে টাকা দিতেছ। আমি বললাম হ্যাঁ, উনি বললেন ঠিক হবে কি? আমি বললাম কেন ঠিক হবে না, এটা একটা ভালো প্রভাব ফেলবে। তারপর উনি বললেন তাহলে টাকা বাড়িয়ে দাও। তারপর আমি বললাম আপনি বললে বাড়িয়ে দেব। এরপর সোশ্যাল সেফটিনেটের নতুন দুইটা প্রোগ্রামের সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা হলো শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য কর্মসংস্থান। আরেকটা যারা প্রাকৃতিক দুর্যোগে খুব খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সাহায্য করা।

সাইফুর রহমান একজন মহৎ মানুষ ছিলেন। আমি ওনার কবর জিয়ারত করেছি। ওনার বাড়িতে যেখানে তার কবর হবে সে জায়গাটা উনি দেখিয়েছিলেন। উনি কোনোদিন একটা চাকরি, পদোন্নতি, ঋণ বা কিছুর জন্য তদবির করেননি। দেশ-বিদেশে, দাতাদের মহলে ওনার যে অবদান সেটা অদ্বিতীয়। দেশের ভবিষ্যৎ ও ভাবমূর্তি বিবেচনায় নিয়ে তিনি বিদেশীদের সঙ্গে কাজ করতেন।

তিনি একজন অসাধারণ লার্নার ছিলেন। একবার নেদারল্যান্ডসের রানী ও তাদের অর্থ সচিব এসেছিলেন। আমিও তখন অর্থ সচিব। তাদের সম্মানে এক ডিনারে আমরা দুই অর্থ সচিব পাশাপাশি বসেছিলাম। সাইফুর রহমান একটু দূরে রানীর পাশে বসা। আমি সেই সচিবের সঙ্গে তাদের দেশের রাজস্ব সংগ্রহ নিয়ে কথা বলছিলাম। সাইফুর রহমান তার আসন থেকেই আমাদের এ আলাপ শুনছিলেন। একটু পরেই উনি উঠে এসে বললেন, জাকির তুমি একটু পাশে বসো, আমি ওনার সঙ্গে কথা বলব। উনি সেই অর্থ সচিবের সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের রাজস্ব নিয়ে আলাপ করলেন। পরের দিন অফিসে গেলাম, উনি আমাকে ডেকে বললেন, গতকাল তো ওদের সঙ্গে কথা বললাম। বিষয়টা আমার পছন্দ হয়েছে, দেখো তো করা যায় কিনা। উনি সে বাজেটেই বিষয়টি যুক্ত করেছিলেন। এভাবে তিনি শিখতেন। ক্রস কান্ট্রি অভিজ্ঞতার একটা ভাণ্ডার ছিলেন তিনি। তিনি পিয়নদের কথাও শুনতেন। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতেন। এটা অবশ্য অনেকে বুঝতেন না।

ওনার সততার কোনো ঘাটতি ছিল না। তিনি রাজনীতিবিদ অবশ্যই। তার চেয়েও বেশি ছিলেন পেশাদার। এজন্যই তিনি কাজে সার্থকতা দেখাতে পেরেছেন।

জাকির আহমেদ খান: সাবেক অর্থ সচিব ও

চেয়ারম্যান, পিকেএসএফ