খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয় ১৯৯১ সালে, আমি দেশে ফিরে আসার পর। সে সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তখন আমি কোনো সংগঠন বা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। তার দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতা আমাকে জানিয়েছিলেন যে তিনি আমার পরামর্শ চান। আমার কাছে পলিসিগত জায়গায় তখন যা সঠিক মনে হয়েছে, সে পরামর্শ দিয়েছি। তিনি আমার কথা খুব ইতিবাচকভাবে নিয়েছিলেন এবং প্রশংসাও করেছিলেন। তিনি যখন বিরোধী দলীয় নেত্রী, তখনো একবার সাক্ষাৎ হয়েছিল তার সঙ্গে। এ সময় অনেক বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত খালেদা জিয়া কোনোদিন রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং রাজনীতিতে আগ্রহীও ছিলেন না। কিন্তু তার সঙ্গে সাক্ষাতে তার চিন্তার স্পষ্টতা ও বলিষ্ঠতা দেখেছি আমি। যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে আমার সঙ্গে আলাপ করেছেন, তা আমাকে দারুণভাবে তার প্রতি আকৃষ্ট করেছে। তিনি আসলেই দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করেছিলেন। বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকা অবস্থায় তিনি আমাকে বলেছিলেন যে তিনি রাজপথে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে চান না; বরং সরকারকে সহায়তা করতে চান ও সরকারের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে চান। সবকিছু তিনি নিয়মতান্ত্রিকভাবে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে চেয়েছিলেন। বিরোধী দল, সরকারি দল কিংবা সরকারের অংশ—এ মানসিকতা তার মধ্যে আমি দেখিনি। বিষয়টি তার প্রতি আমার ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে আরো সহায়তা করেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে তিনি একজন শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি, যিনি ব্যক্তি নয় জনকল্যাণে রাজনীতি করেন। যদ্দূর মনে পড়ে তিনি প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেত্রী বলেছিলেন যে এ সরকারকে একদিনের জন্যও শান্তিতে থাকতে দেবেন না। কিন্তু খালেদা জিয়ার মধ্যে আমি এ ধরনের মানসিকতা কিংবা প্রতিশোধপরায়ণতা দেখিনি।

খালেদা জিয়ার সঙ্গে আমার তৃতীয়বার দেখা হয়েছিল ২০১৪ সালের পরে। যখন তিনি ও তার দল অনেক নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হচ্ছিলেন। তখন আমার পরামর্শ চেয়েছিলেন তিনি। বলেছিলাম, তারা যেন সহিংসতার পথে না গিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে থাকে। বিকল্প হিসেবে তারা যেন সংস্কারমূলক কর্মসূচি দেয়।

তার সঙ্গে আমার সবশেষ দেখা হয়েছিল জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিতে গিয়ে। ঐকমত্য কমিশনের জ্যেষ্ঠতম সদস্য হিসেবে এ দায়িত্ব পড়েছিল আমার ওপর। তিনি আমাকে বলেছিলেন যে জাতীয় সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে দেশে কিছু মৌলিক সংস্কার হবে—এজন্য তিনি খুব উৎসাহিত বোধ করছেন। সুস্থ থাকলে তিনি আমাদের সে অনুষ্ঠানে আসতেন।

এ মুহূর্তে আমরা একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভার অতিক্রম করার চেষ্টা করছি। এ সময়ে তার মৃত্যুতে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ দল ও জাতির জন্য বড় প্রয়োজন ছিল। জাতি হিসেবে আমরা সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম।

খালেদা জিয়ার ব্যাপারে সবচেয়ে সুখকর যে বিষয় তা হলো দলমত নির্বিশেষে অগণিত মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা নিয়ে তিনি বিদায় নিয়েছেন। এ ভাগ্য আমাদের দেশে বিরল। একটা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ সৃষ্টি, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নমুক্ত রাষ্ট্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আমরা নিজেদের নিয়োজিত করলেই তার প্রতি সত্যিকারের শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হবে।