ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগরে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ মিছিলেও হামলা চালিয়েছিল ছাত্রলীগ। আমি তখন ক্যাম্পাসে ছিলাম না। এ হামলার খবর পেয়ে মনে কুডাক দিচ্ছিল। মনে হয়েছিল ১৫ জুলাইও শিক্ষার্থীদের ওপর বড় ধরনের হামলা হতে পারে। এজন্য তড়িঘড়ি আবার ক্যাম্পাসে ফেরার উপায় খুঁজতে শুরু করি। এক বন্ধু আমার অস্বস্তির সময়ে নিজের গাড়ি চালিয়ে এগিয়ে এলেন। ক্যাম্পাসে ফেরার এ সুযোগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করি।
১৫ জুলাই শিক্ষার্থীরা ভিসির বাসভবন অবরুদ্ধ করে। সেখানে রাত ১০টার দিকে ভয়াবহ হামলা চালায় ছাত্রলীগ। ভিসি আর প্রক্টরকে তখন ক্যাম্পাসে থাকা কয়েকশ পুলিশের মাধ্যমে নিরাপত্তার কথা জানাই। কিন্তু প্রক্টর একাধিকবার জানালেন, তাদের সীমাবদ্ধতা আছে। এদিকে নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর শিলাবৃষ্টির মতো কাচের বোতল, পেট্রল বোমা এমনকি ককটেল ঝরছে। উপাচার্যের বাসভবনে আশ্রয় নিয়েও তারা আক্রমণ থেকে রেহাই পায়নি। শিক্ষার্থীরাই নয়, শিক্ষকদেরও নিরাপত্তা ছিল না। বরং অনেক শিক্ষককে লাঞ্ছনার শিকার হতে হয়। পুরোটা সময় পুলিশ ছিল নীরব দর্শক। ভাগ্যিস ওইদিন কেউ মারা যায়নি, এটাই স্বস্তি।
এল ১৭ জুলাই। সকাল ১০টার দিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট বসলে ছাত্র-ছাত্রীরা সেখানে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, সারা ক্যাম্পাস পুলিশে ভরে গেল। দুপুরে হল ভ্যাকেন্টের ঘোষণা এল। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদের বোঝালাম, ‘আন্দোলন আমরা করব, কিন্তু তোমাদের জীবন আগে, আপাতত ফিরে যাও’। কিন্তু ওদের ফেরানো যায়নি। রেজিস্ট্রার ঘোষণাপত্র পাঠের সময় শিক্ষার্থীরা জুতা নিক্ষেপ করল এবং ভাংচুর শুরু করল। তারা হল ছাড়বে না এ সিদ্ধান্তে অটল রইল। বিকালে শুরু পুলিশের আক্রমণ। ক্যাম্পাসে পুলিশের নির্বিচার গুলি চালানো আমাদের হতবাক করেছিল। আমাদের জন্য আরো অস্বস্তি। কাউকে উদ্ধার করতে পারছি না। খোঁজ পাচ্ছি না। মেডিকেলের সামনে রীতিমতো কাঁদছিলাম।
১৮ জুলাই আন্দোলন আরো কঠোর রূপ নেয়। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন দুবার-তিনবার ক্যাম্পাসে মিছিল নিয়ে হাইওয়েতে যেত। আমি সব মিছিলেই ছিলাম। ততদিনে এনাম মেডিকেলে অনেক শিক্ষার্থী আহত এ খবর পাচ্ছিলাম। কিন্তু তাদের গিয়ে দেখব সুযোগটা মিলছিল না। ২৯ জুলাই এক শিক্ষার্থী ফোন করে জানায় তারা বিকালে একটা বিক্ষোভ সমাবেশ করবে। বেলা ৩টায় ক্যাম্পাস থেকে মিছিল করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক হয়ে আবার ক্যাম্পাসের শহীদ মিনারে এসে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো।
সমাবেশের শুরুতে ভাবছিলাম, এ পরিস্থিতিতে আমি কেমন ভূমিকা রাখতে পারি? মানুষকে এ যন্ত্রণা থেকে বের করতে হবে। নাহলে নির্বিচারে এ হত্যা থামানো যাবে না। স্বৈরাচারের পতন হবে না। কিন্তু কী বললে হবে বিস্ফোরণ? মঞ্চে আমরা চার-পাঁচ জন শিক্ষক। সামনে শখানেক শিক্ষার্থী। বক্তব্যে কিছু বলতে হয়। আমি প্রথমেই বলি, ‘একজন শিক্ষক হিসেবে এ স্বাধীন দেশে আমার শিক্ষার্থী হত্যার বিচার চাই। যাদের গুম করা হয়েছে তাদের ফেরত চাই। যাদের ধরে নিয়ে গিয়েছে, তাদের পরিবারে ফেরত চাই। যে শিক্ষার্থীরা ঘরে ঘুমাতে পারছে না, তাদের ঘরে ঘুমানোর পরিবেশ চাই। সব নির্যাতন বন্ধ করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার আহ্বান জানাই। যেসব অভিভাবক, পেশাজীবী, শিক্ষক এখনো নীরব আছেন তাদের জন্য একটি বার্তা আছে আজকের দিনে।’
বার্তাটা আমি তুলে আনার জন্য নিজের কিছু বলিনি। বরং কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতাই মনে পড়েছিল। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কবিতার কয়েকটি চরণ থেকে তুলে আনি আমার সেই বক্তব্য। কবিতা আবৃত্তি করতে গিয়ে ভীষণ আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। বক্তব্য শেষে তাকিয়ে দেখি সামনে উপস্থিত শিক্ষার্থীরাও আবেগতাড়িত হয়েছে। আমার এ বক্তব্যের প্রভাব কতটা জানি না। তবে এটি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ায় যেভাবে হাজারো মানুষ জাহাঙ্গীরনগরে আসতে শুরু করেন, তখন সত্যিই বুক ভরে ওঠে। আমরাও যে আন্দোলন করছি সে বার্তা মানুষ বুঝতে পেরেছিল।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










