এই যে অলৌকিক মনে হওয়া, তা কেবল জনাব মির্জা ফখরুলের মনে হয়নি। দেশের অনেকের কাছে তেমনটা মনে হয়েছিল। অর্থাৎ তার পতন অসম্ভব মনে করছিলেন অনেকে। কিন্তু এক স্বৈরাচারী শাসকের পতন হয়েছে। এ দেশের মানুষ সেটা সম্ভব করেছে। এই যে সম্ভব হলো তার ব্যাখ্যা কী? ব্যাখ্যায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয়েছে অর্থনৈতিক যুক্তি—চড়া মূল্যস্ফীতি, তরুণদের বেকারত্ব, কভিড-পরবর্তী চাপ, রিজার্ভ ও ব্যাংক খাতের সংকট। এসব বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক পাটিগণিত দিয়ে দুটি প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। প্রথমত, পতন কেন ঠিক এ মুহূর্তে—২০১৪ কিংবা ২০১৮-তে নয়? দ্বিতীয়ত, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের একটি সীমিত দাবি কীভাবে কয়েক সপ্তাহে ১৫ বছরের শাসন উৎখাতের গণআবেগে রূপ নিল? আন্দোলনের যে মাত্রা—নৈতিক ক্রোধ, আত্মসম্মানের প্রশ্ন, আবেগের তীব্রতা—তা নিছক অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতি বা র‍্যাশনাল যুক্তির হিসাবে ধরা পড়ে না। এখানেই একটি সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পাঠ জরুরি।

আমার প্রস্তাব সরল: বৈষয়িক কারণের পাশাপাশি অন্তত তিনটি স্তর এ পতনকে ব্যাখ্যা করে—ব্যর্থ আধিপত্য, অপমানের রাজনীতি এবং ক্ষমতাজনিত ঔদ্ধত্য।

প্রথমত, আধিপত্যের প্রশ্ন। প্রচলিত ভাষ্যে বলা হয়, স্বৈরাচারী শাসন ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ গড়ে তোলে। আমি বলব, বিষয়টা উল্টো দিক থেকে দেখা দরকার। উপমহাদেশের ইতিহাসবিদ রণজিৎ গুহ দেখিয়েছিলেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে দুই উপায়ে—জবরদস্তি ও সম্মতি। যখন সম্মতি জবরদস্তিকে ছাপিয়ে যায়, তাকে বলে ‘আধিপত্য’। আর যখন সম্মতি ফুরিয়ে জবরদস্তিই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়, তখন অবশিষ্ট থাকে কেবল ‘সম্মতিহীন প্রভুত্ব’। হাসিনা জমানার প্রকল্প ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ঘিরে জাতীয় সম্মতি নির্মাণ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চেতনা রূপ নেয় বিভাজনের হাতিয়ারে। ভিন্নমতকে দাগিয়ে দেয়া হতো ‘রাজাকার’, ‘স্বাধীনতাবিরোধী’, ‘ষড়যন্ত্রকারী’ বলে। এ ‘অপরায়ন’ কেবল দল বা সংসদের সীমানায় থেমে থাকেনি, তা ছড়িয়ে পড়েছিল দৈনন্দিন জীবনে। যেখানে সাংবাদিক, শিক্ষক, সাধারণ সমালোচক—যে কাউকেই মুহূর্তে ‘অপর’ বানিয়ে দেয়া যেত। ফলে দীর্ঘ ১৫ বছরে তৈরি হয়েছিল এক বিশাল জনগোষ্ঠী, যারা নিরবধি বহন করছিল অবমাননার এক অভ্যন্তরীণ ক্ষত। লক্ষণীয়, এ ‘অপর’ তৈরির প্রয়োজনই আধিপত্যের সাফল্য নয়, ব্যর্থতার প্রমাণ—কারণ যেখানে প্রকৃত সম্মতি থাকে, সেখানে প্রতিপক্ষকে অবিরাম শত্রু বানিয়ে রাখার দরকার পড়ে না।

দ্বিতীয়ত, অপমানের রাজনীতি। জার্মান দার্শনিক আক্সেল হনেথ যুক্তি দিয়েছেন, বহু সামাজিক বিদ্রোহের মূলে থাকে বণ্টনের অন্যায় নয়, বরং ‘অস্বীকৃতি’ ও ‘অসম্মান’—মানুষের আত্মমর্যাদায় সরাসরি আঘাত। যখন কোনো গোষ্ঠী অনুভব করে যে রাষ্ট্র তাকে অবমাননা করছে, সেই অপমানবোধই নৈতিক ক্রোধে পরিণত হয়ে প্রতিরোধের জ্বালানি জোগায়। ১৪ জুলাইয়ের সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সেই মন্তব্য ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা কোটা না পেলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’—ঠিক এই স্নায়ুতে আঘাত করেছিল। এ দেশে ‘রাজাকার’ নিছক একটি শব্দ নয়, একাত্তরের বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক এক গভীর কলঙ্ক। শিক্ষার্থীরা সেই অপমানকে উল্টো নিজেদের গায়ে তুলে নিয়ে স্লোগান তোলে—‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার; কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।’ অবমাননাকে ব্যঙ্গ ও অবাধ্যতায় রূপান্তরের এ মুহূর্তটিই ছিল বাঁকবদল। দাবিটা তখন আর কেবল কোটা নয়, আত্মমর্যাদার। আর এ ক্ষত কেবল ছাত্রদের ছিল না; বছরের পর বছর ‘অপর’ হয়ে থাকা বিস্তৃত এক জনসাধারণের অপমানবোধের সঙ্গে তা অনুরণিত হয়েছিল বলেই আন্দোলন এত দ্রুত সর্বজনীন রূপ নেয়। যারা এতকাল ভয়ে বা নিরাসক্তিতে চুপ ছিলেন, তারাও তখন কণ্ঠ মেলালেন।

তৃতীয়ত, ঔদ্ধত্য বা ‘হিউব্রিস’। এখানে সতর্ক থাকা দরকার ব্যক্তির দম্ভ দিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করা এক ধরনের ফাঁদ। তবু মনস্তাত্ত্বিক উপাদানটি অগ্রাহ্য করা যায় না। ব্রিটিশ চিকিৎসক-রাজনীতিক ডেভিড ওয়েন ‘হিউব্রিস সিনড্রোম’ ধারণায় দেখিয়েছেন, দীর্ঘদিন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করলে নেতৃত্বে জন্ম নেয় এক অর্জিত ঔদ্ধত্য, নিজের বিচারবুদ্ধিতে অতিরিক্ত আস্থা, সমালোচনার প্রতি অবজ্ঞা, বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতা। ওয়েনের ভাষায় এটি যতটা ব্যক্তির, ততটাই ‘পদের অসুখ’—নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, ন্যূনতম জবাবদিহি আর দীর্ঘ ক্ষমতাকাল একে জন্ম দেয়। টানা তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন, তোষামোদে ঘেরা অন্দরমহল আর তথ্যের একমুখী প্রবাহ হাসিনার চারপাশে ঠিক সেই আবহই তৈরি করেছিল, যেখানে ছাত্রদের ক্ষোভকে তুচ্ছ ভাবা এবং একটিমাত্র মন্তব্যে গোটা এক প্রজন্মকে অপমান করা সম্ভব হয়েছিল। গ্রিক পুরাণে হিউব্রিসের অনিবার্য পরিণাম নেমেসিস—পতন।

তবে এখানেই একটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই, নইলে বিশ্লেষণ একপেশে হয়ে পড়ে। সাংস্কৃতিক-মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার একটা বিপদ হলো অতিসরলীকরণ। অপমান বা ঔদ্ধত্য এককভাবে কোনো শাসনের পতন ঘটায় না; বহু শাসন যুগের পর যুগ মানুষকে অপমান করেও দিব্যি টিকে থাকে। এ তিনটি স্তর ছিল দাহ্য পদার্থ ও স্ফুলিঙ্গ—বিস্ফোরণ নয়। বিস্ফোরণের জন্য দরকার হয়েছিল আরো কিছু: আবু সাঈদসহ নিরস্ত্র শিশু-তরুণদের হত্যা যে নৈতিক ধাক্কা দিয়েছিল, দমন-যন্ত্রের অতিপ্রয়োগ, শেষ মুহূর্তে সেনাবাহিনীর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি, আর আন্তর্জাতিক পরিসরের হিসাব-নিকাশ। সংস্কৃতি ব্যাখ্যা করে কেন মানুষ রাস্তায় নামল এবং কেন এত তীব্রতায়; কিন্তু কেন শাসনটি শেষমেশ টিকল না, তার জন্য রাষ্ট্রের বলপ্রয়োগ-ক্ষমতা ও এলিটদের মধ্যে মতপার্থক্যের রাজনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবু মূল শিক্ষাটি সাংস্কৃতিক ও নৈতিক। কোনো শাসনের বৈধতা কেবল উন্নয়নের পরিসংখ্যানে নয়, নাগরিকের মর্যাদার স্বীকৃতিতেও নিহিত। যে শাসন সম্মতির বদলে ‘অপর’ নির্মাণ করে টিকে থাকতে চায়, সে নিজের হাতেই নিজের প্রতিপক্ষ গড়ে তোলে। ইতিহাসের এ পাঠ কেবল বিগত জমানার জন্য নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যেকোনো ক্ষমতার জন্যও সমান প্রযোজ্য। মর্যাদা অস্বীকারের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত নিজেরই বিরুদ্ধে ফিরে আসে।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়