তবে আলিফ আহমেদ সিয়ামের শূন্যতা এখনো তার পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়ায়। দুই বছর পেরিয়ে গেছে। জীবন স্বাভাবিক হয়েছে। তাও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ছেলের মৃত্যুর শূন্যতা কোনোভাবেই মানিয়ে নিতে পারছে না চব্বিশের অভ্যুত্থানে নিহত শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের পরিবার।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকেই ‘ছাড়তে হবে ক্ষমতা, ঢাকায় আসো জনতা’ স্লোগানটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাড়তি উত্তেজনা জাগিয়েছিল। আলিফও সে উত্তেজনা অনুভব করছিলেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ইসলামনগর এলাকায় পরিবারের সঙ্গে থাকতেন আলিফ আহমেদ সিয়াম। সাভার ডেইরি ফার্ম উচ্চ বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান বিভাগের দশম শ্রেণীর এ শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল পাইলট হওয়ার। খেলাধুলায়ও ছিল সমান আগ্রহ। প্রাণবন্ত এ কিশোরের জীবনে অভ্যুত্থানের সাক্ষী হওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন পরিবেশের ভূমিকা ছিল। তাই লংমার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে যোগ দেয়ার জন্য ৫ আগস্ট সকালে মার কাছে অনুমতি চাইলেন। আলিফের মা তানিয়া বেগম ছেলেকে বাধা দিয়েছিলেন। মায়ের সমর্থন না পেলেও আলিফ লংমার্চে যোগ দেয়।

জুলাই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে ঐতিহাসিক মুহূর্ত অর্থাৎ স্বৈরাচারের পতনের যে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলিফ গিয়েছিলেন, সেটি স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি। ওইদিন দুপুরে ঢাকার দিকে যাওয়ার পথেই সাভার বাসস্ট্যান্ডে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন আলিফ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে নেয়া হয় এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চেতন-অচেতনের মাঝে দুদিন লড়াই করে অবশেষে ৭ আগস্ট শহীদ হন তিনি। উদযাপনের পরবর্তী সময়ে সেটি এক বড় বিষাদে রূপ নেয়। আলিফের মা আর বাবাকে কাটাতে হয়েছে সবচেয়ে দুর্বিষহ মুহূর্ত। দুদিনের অনিশ্চয়তা শেষে যে ভয়াবহ শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। তা আজও মেটেনি।

ইসলামনগরে আলিফের ছোট ঘরটাই এখন স্মৃতি। পড়ার টেবিলটা সাজানো-গোছানো। অনেক দিন কেউ বই উল্টেপাল্টে দেখেনি তা স্পষ্ট। পরিপাটি করে রাখা বিছানা আর গোছানো ঘরে সন্তানকে খুঁজে বেড়ান তানিয়া বেগম। সন্তানের কথা বলতে গিয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে বলেন, ‘ছেলেটাকে তো খুঁজে পাই না। ঘরটা এখনো আগের মতোই আছে। সবকিছুই আছে। শুধু আমার ছেলেটা নেই। ও যে আমাকে এভাবে ছেড়ে চলে যাবে, ওইদিন তো বুঝিনি। তাহলে যতই জেদ করুক আটকে রাখতাম।’

আলিফের বাবা বুলবুল কবির আবেগ কিছুটা সংযত রাখতে চান। সন্তানের ত্যাগকে বরং গর্বের স্মারক হিসেবে প্রকাশ করতে চান। তিনি বলেন, ‘কেউ কি কখনো ভাবে স্বাধীন একটা দেশে কেউ এভাবে সন্তান হারাবে? এমনটা যেন আর না হয়। কষ্ট আছে। কিন্তু ছেলেকে ফিরে পাওয়ার দাবিটাই করতে পারি না। অভ্যুত্থানে অনেকের ত্যাগের মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে আমরা মুক্তি পেয়েছি। আমার সন্তানকে আর ফিরে পাব না। অনেকেই এমন কষ্ট নিয়ে বাঁচছেন। আমাদের এখন একটাই দাবি, শহীদ হত্যার বিচার দ্রুত করতে হবে। আহতদের চিকিৎসার স্বাভাবিক ব্যবস্থা রাখতে হবে। এটাই এখন আমাদের চাওয়া।’