১৬ জুলাই ২০২৪ বেলা ঠিক তিনটা, চট্টগ্রামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পূর্বঘোষিত সমাবেশ করার কথা ষোলশহর স্টেশনে। দুপুর গড়াতে না গড়াতে পুরো ষোলশহর দখলে নেয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। কিছুক্ষণের মধ্যে ছাত্রদের লক্ষ্য করে ভারী অস্ত্র হাতে গুলি করতে থাকে তারা। ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমাবেশ। থেমে থেমে গুলি উপেক্ষা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্ররা ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে ষোলশহরমুখী হতে থাকে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হাতে ক্যামেরা দেখার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সন্ত্রাসীরা আমার ক্যামেরা নিয়ে টানাহেঁচড়া শুরু করে। ক্যামেরা না দেয়ায় আমাকে কিল-ঘুসি মেরে তারা ক্যামেরা খুলে আমার মেমরি কার্ড নিয়ে নেয়।

ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে আমাকে নিরাপদে নিয়ে আসেন আরেক সহকর্মী আজম। আমার কাছে তখন দিনের কোনো ছবি ছিল না বললেই চলে।

১৮ জুলাই, বহদ্দারহাট এলাকায় দিনভর রণক্ষেত্র, মুহুর্মুহু গুলি আর পুলিশের টিয়ার শেল। ছবি তুলতে গিয়ে আবারো বাধার মুখে! কেন জানি ফটোসাংবাদিকরাই তাদের টার্গেট! ক্যামেরা দেখে আমার দিকে তেড়ে আসে অস্ত্রধারীরা। কোনো উপায় না দেখে আমি প্রাণের ভয়ে দৌড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নিই। সেখানেই আটকে গেলাম। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ওই ভবন থেকে বের হই। সেদিন কোনো রকম প্রাণে বেঁচে ফিরি।

৩ আগস্ট থেকে চট্টগ্রামের পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যায়। দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতা নিউমার্কেট এলাকায় বেলা ৩টায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সেদিন বিকালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ঘোষণা দেন ৪ আগস্ট অর্থাৎ ৩৫ জুলাই নিউমার্কেট এলাকায় সমাবেশ হবে। সেদিন সমাবেশ শুরুর ১ ঘণ্টা আগে পুরো নিউমার্কেট এলাকা দখলে নেয় চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী ও অস্ত্রধারীরা।

ঘড়ির কাঁটা ১১টা বাজতে না বাজতেই ভারী অস্ত্রধারীরা ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে থাকে। সেদিনই ১০০-এর বেশি ছাত্র গুলিবিদ্ধ হয়। দিনভর গুলির মুখে থেকে মাঠ ছেড়ে যায়নি ছাত্র-জনতা। ছাত্র-জনতা অস্ত্রধারী আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের প্রতিহত করতে পাথর নিক্ষেপ করতে থাকে।

হঠাৎ জানতে পারি যে তিনপোলের মাথায় একে-২২ অস্ত্র দিয়ে ছাত্রদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছে। একে-২২ ফিলিপাইনের তৈরি আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। মনে হলো এ অস্ত্রধারীর একটি ছবি তুলতে পারলে সেটিই হবে আজকের দিনের সেরা ছবি। আমার সিদ্ধান্তের কথা সহকর্মী দৈনিক পূর্বকোণের ফটোসাংবাদিক শরীফ ভাইয়ের সঙ্গে শেয়ার করি। তিনি সাহস নিয়ে বললেন, চলো চেষ্টা করে দেখি একটা ছবি তোলা যায় কিনা।

শরীফ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে তিনপুলের মাথায় যেতে না যেতে চোখ পড়ল একে-২২ দিয়ে গুলি করছে যুবলীগের এক সদস্য। শরীফ ভাই ক্যামেরা তাক করতেই আমাদের ঘিরে ফেলে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা। একপর্যায়ে শরীফ ভাইয়ের বুকে অস্ত্র তাক করে ওই অস্ত্রধারী। তখন আমার পেছন থেকে ছাত্রলীগের এক সদস্য চাইনিজ কুড়াল দিয়ে কোপ দিতে গেলে তার হাত ধরে ফেলেন পূর্বকোণের ক্রাইম রিপোর্টার নাজিম ভাই। ওই অস্ত্রধারী আমাদের বুকের ওপর অস্ত্র তাক করে বলছিল, ফটোসাংবাদিকরাই তাদের শেষ করছে! নাজিম ভাইয়ের সহযোগিতায় আমরা সেদিন বেঁচে ফিরি।

এর কিছুক্ষণের মধ্যে আমি, শরীফ ভাই ও নাজিম ভাই ওই স্থান ত্যাগ করি। এদিকে অফিস থেকে বারবার সতর্কবার্তা দিচ্ছে। দুপুর গড়াতে ছাত্ররা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ল। আওয়ামী লীগের কর্মীরা যেখানেই ছাত্রদের দেখছে সেখানেই হামলা করছে। তিনপুল থেকে স্থান ত্যাগ করে আমি গেলাম জামালখান। সেখানেও ছিল একই অবস্থা।

আজীম অনন, আলোকচিত্রী, বণিক বার্তা