অভ্যুত্থানের সময় যে নারীরা সামনের সারিতে ছিলেন, নেতৃত্বে ছিলেন সেটা আমি দুটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নির্দিষ্ট করে ব্যাখ্যা করতে চাই। প্রথমটি হলো গত দেড় দশকে নারীরা গ্রেফতার-নির্যাতনের শিকার হলেও মোটাদাগে যত রকমের গুম-খুন হয়েছে সব পরিবারগুলোর পুরুষ সদস্যদের ঘিরে। সুতরাং আমাদের দেশের পুরুষ জনসংখ্যার ওপর দিয়ে ১৫ বছরের জুলুমটা গেছে।
বিগত ১৫ বছর অপহরণ-গুম-খুনের শিকার হওয়া পুরুষদের পরিবারের নারী সদস্যদের আমরা অসংখ্যবার দেখেছি যে প্রেস কনফারেন্সে এসে কান্নাকাটি করছেন। তারা তাদের পরিবারের সদস্যদের খুঁজে পাচ্ছেন না, খুঁজে পেতে চাচ্ছেন—এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রেস কনফারেন্সে কথা বলতে দেখেছি। রিপোর্টের ফলোআপেও দেখেছি যে তাদের কী রকম মানবেতর অবস্থায় জীবন কাটাতে হচ্ছে পরিবারকে নিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ব্যক্তিকেই গুম করা হয়েছে। ফলে পুরো পরিবারই অসহায় হয়ে পড়েছে। তো এভাবে জাতিগতভাবে নারীদের ওপর ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলেছে। এ বিষয় লোকেরা সাধারণত লক্ষ করে না বা কোনো ডাটায়ও তেমন উঠে আসে না। তাই বলে অস্বীকার করার উপায় নেই যে নারীদের ওপরও বিশেষভাবে নিপীড়ন চলেছে। তো সংজ্ঞায়িত রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বাইরেও সম্পর্কিত একটা জায়গা থেকে দেখলে দেখা যাবে যে এসব নির্যাতন-নিপীড়নের দুঃসহ স্মৃতি কিন্তু আমাদের সব নারীর মধ্যে আছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া যে নারী শিক্ষার্থীরা বের হয়ে এলেন তাদের মাথায় এ স্মৃতি বা তথ্যটা ছিল। আবার গণরুম বা গেস্টরুম কালচারে পুরুষ শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত বেশি নিপীড়নের শিকার হয়। সে ক্ষেত্রে নারীদের যে একটি মাতৃসুলভ বা ভ্রাতৃসুলভ সাহায্য করা বা রক্ষা করার সহজাত প্রবৃত্তি আছে এটাও আন্দোলনে আমাদের কাজে এসেছে।
যখন ১৪ জুলাই আমরা দেখলাম যে নারী শিক্ষার্থীরা স্লোগান নিয়ে হল থেকে বের হলো—তুমি কে, আমি কে? রাজাকার, রাজাকার! আর আমরা জানি যে আওয়ামী লীগের একমাত্র বয়ান হলো ‘রাজাকার’ বা ‘জঙ্গি’ বানিয়ে কণ্ঠ রুদ্ধ করা। যেটা দিয়েই তারা ১৫ বছরের ফ্যাসিজমকে কায়েম করতে সক্ষম হয়েছিল। তাহলে যখন ‘রাজাকার’ ন্যারেটিভটা কেউ উপহাসের মাধ্যমে হলেও নিজের বলে দায়িত্ব নিয়ে নিচ্ছে তখন আর আওয়ামী লীগের ন্যারেটিভ বলতে কোনো কিছুই থাকে না। এটা যদি নারীরা না করে পুরুষ শিক্ষার্থীরা করতেন তাহলে তাদের ধরপাকড় করা হতো। এরপর গণরুম-গেস্টরুমে তাদের মারধর করা হতো এবং নিপীড়নের মাত্রা অনেক বেড়ে যেত। কিন্তু আমাদের নারী হলগুলোয় অপেক্ষাকৃত একটা সুস্থ ও মোটামুটি একটা ভালো পরিবেশ আছে, যেখানে মেয়েরা হয়তো নিজেদের মন খুলে কথা বলতে পারে। আর সেই জায়গাটা কাজে লাগিয়ে মেয়েরা যখন সেই ‘রাজাকার’ স্লোগানটা ধরল তখন কিন্তু আর আওয়ামী লীগের ‘ন্যারেটিভ’ বলতে কিচ্ছু রইল না। এক্ষেত্রে আমরা যদি এটাকে শুধু সামনের সারির যোদ্ধা বা নেতৃত্বে থাকা সেনাপতি হিসেবে নারীকে ধরি তাহলে যথাযথ মূল্যায়ন হবে না। তখন সময়ের প্রয়োজনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটা করার দরকার ছিল, সবচেয়ে বেশি সাহসিকতার সঙ্গে সেটা নারীরাই করেছেন। এ সংবেদনশীল মোমেন্টামটাই যদি আমরা না ধরতে পারতাম তাহলে সত্যি বলতে গণ-অভ্যুত্থান আরো পরে হতো।
এছাড়া আন্দোলন করার সময় সামনে বসে স্লোগান দেয়া বা সম্মুখযুদ্ধটাও তারা করেছেন শুধু এ কারণে নয় যে নিজের অধিকার আদায় করতে হবে বা নিজের প্রতিবাদের ভাষা জানানোর তাগিদ থেকে। এর পাশাপাশি সহযোদ্ধা ছেলেদের বাঁচানোর বা রক্ষা করার একটা তাগিদ ছিল। কেননা তারা সামনে থাকলে পুলিশ বাহিনী, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের থেকে পুরুষ সহযোদ্ধাকে নিরাপদ রাখতে পারবেন, কেননা নারীরা সামনে থাকলে গুলিটা কম চালাবে বা চালাবেই না বা মারধর করবে না।
মেয়েদের এই যে আশ্রয় দেয়ার মনোবৃত্তি; সেখান থেকেই কিন্তু তারা সামনে লড়াইটা করেছেন এবং এক্ষেত্রে তারা কোনো বাছবিচার করেননি। পেছনে কোন মতাদর্শের পুরুষ সহযোদ্ধা আশ্রয় নিচ্ছেন নারীরা বাছবিচার করেননি। সব নারী সামনে এগিয়ে এসেছিলেন।
আমরা অভ্যুত্থানের পরবর্তী দৃশ্যকল্পে বিভিন্ন দলে নারী নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখেছি। আবার কিছু কিছু নারীর পক্ষ থেকে এ অভিযোগও উঠেছে কাউকে কাউকে সাইডলাইন করা হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে নারীদের কোণঠাসা করার এক ধরনের প্রচেষ্টা অতীতেও চলেছে, এখনো চলছে। যদি একটু শুরু থেকে দেখি, তাহলে আমাদের বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ যে অধ্যায়গুলো বা বাঁকগুলো যেখানকার পরিকল্পনা বা আশা-আকাঙ্ক্ষার যথাযথ রূপান্তরের মাধ্যমে যুগ পরিবর্তনের উদ্দীপনাগুলো তৈরি হয় সেই জায়গাগুলোর মধ্যে আসলে নারীদের ভূমিকা খুবই কম।
এমনকি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্বে পুরুষের সঙ্গে নারী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগ্রাম করলেও আমরা দেখিনি কোনো নারীকে মুখ্য চরিত্র হতে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে সূর্য সেন, যোগেন মণ্ডলের নাম উঠে এসেছে, সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলার নাম বা মওলানা ভাসানীর নাম উঠে এসেছে। কিন্তু এদের মতো শক্তিশালী কোনো নারী ক্যারেক্টার দেখতে পাচ্ছি না।
কিন্তু এটা তো আমরা জানি যে মুক্তিযুদ্ধ বলেন বা জুলাই অভ্যুত্থান বলেন নারীদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি মনে করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের কেন্দ্রে নারীদের ভূমিকা খুবই কম করে দেখানো হয়েছে। শুধু প্রান্তিক পর্যায়ে তাদের যুক্ত রাখার প্রচেষ্টা আছে। সেটার নিয়ত নিয়ে আমি খুব বেশি প্রশ্ন করতে চাই না। আমি চাই যে এই প্রশ্নগুলোর মধ্য দিয়েই নারীদের ইনক্লুড করার প্রসেসটা শুরু হোক।
সম্প্রতি ৬৪ জেলায় এনসিপির পদযাত্রা হলো। সেখানে জুলাই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। অনেকে হয়তো এনসিপিতেও নেই, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে। অনেক নারী নেতৃত্ব আমাদের কাছে এসেছেন। জেলা পর্যায়ে সম্মুখভাগের নারী সহযোদ্ধা এখন নিজেদের অনেকটা বিচ্ছিন্ন মনে করেন। যেসব পুরুষ সহযোদ্ধার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা যুদ্ধ করেছেন, নিজেদের প্রাণের ঝুঁকিও নিয়েছেন সেসব পুরুষ সহযোদ্ধাই তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে, যাতে তারা বিভিন্ন কমিটিতে আসতে না পারেন।
আমি ঝুঁকি নিয়েই বলছি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে এনসিপি পর্যন্ত আমাদের নারী সহযোদ্ধাদের আমরা খুব সচেতনতার সঙ্গে সামনে রাখি। কিন্তু জেলাভিত্তিক কমিটিগুলোয় সে বিষয়টি এগোয়নি। জেলাগুলোয় বরং নারীদের রাজনীতিতে না আসতে, দমিয়ে রাখতে কাজ করা হচ্ছে।
অভ্যুত্থানে সরাসরি অংশগ্রহণকারী নারীরা রাজনৈতিকভাবে এখনো তাদের ন্যায্য হিস্যাটা পাচ্ছেন না। দ্বিতীয়ত, অভ্যুত্থানের পরে আমরা কিন্তু চেয়েছিলাম, রাজনৈতিক দলগুলোয় একটা প্যারাডাইম শিফট/কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন ঘটবে। রাজনৈতিক দলগুলো আগে যে প্রক্রিয়ায় কাজ করত এগুলোর মধ্য থেকে বের হয়ে আসবেন। এখন যদি এমনই হয় যে আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, টাকার লেনদেন এবং পারিবারিক প্রভাবের মতো ব্যাপারগুলোই যদি এখনো গুরুত্বপূর্ণ থাকে তাহলে এখানে নতুন নারী নেতৃত্ব উঠে আসবে না।
সামান্তা শারমিন, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)










