২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কথা বিশদ আকারে বলা দরকার। চব্বিশের আন্দোলনে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কৌশল, বোঝাপড়াসহ অনেক কিছু কাজে লাগাতে পেরেছি। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় সদ্য হলিক্রস কলেজ থেকে বের হয়েছি। সেখানে আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। সেই সময় শাহবাগ থানা পুলিশ গ্রেফতারও করে। সে জায়গা থেকেই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা। এরপর ২০২১-পরবর্তী সময়ে ছোট-বড় বিভিন্ন আন্দোলনে আমার অংশগ্রহণ ছিল। আমরা সবসময় চেষ্টা করেছি, ন্যায়ের পক্ষে থাকতে। কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে প্রথমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে সমাবেশ, ক্যাম্পাসে মিছিল-সমাবেশ এবং এরপর ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শুরু থেকেই আমার সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নৈতিক সমর্থন ছিল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের অংশগ্রহণের উদ্দেশ্য একটিই ছিল, আমাদের রাজনৈতিক বোধশক্তি হওয়ার পর থেকে একই সরকারের শাসনামল দেখেছি। বিগত সরকারের যে পরিমাণ নিপীড়ন ও দুঃশাসন দেখেছি, এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ হিসেবে কর্তব্য।

আমি মনে করি, কোনো আন্দোলন সমন্বয় করার জন্য সমন্বয়ক পদবির দরকার নেই। আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের সবারই হলে হলে নিজেদের কিছু গ্রুপ ছিল। আমরা যারা বিভিন্ন সংগঠনের সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম, তাদের অনেক আগে থেকেই অনেক বোঝাপড়া ও জানাশোনা ছিল। তারা প্রথমে চেষ্টা করেছে, আমাদের সার্কেলের মধ্যে বার্তাগুলো পৌঁছে দেয়া এবং সে বার্তা ধীরে ধীরে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেয়ার। ১৪ জুলাই প্রথমে এক হলের ছাত্রীরা রাস্তায় নামি। পরে সবগুলো হলের গেটে গেটে গিয়ে অন্য ছাত্রীদের ডেকে রাস্তায় নামিয়েছি। ‘‌দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ নামে ২০১৯ সালে আরেকটি আন্দোলন হয়েছিল, সেখান থেকে আমাদের অগ্রজদের কাছ থেকে ছাত্রীদের আন্দোলনে জড়ানোর কৌশল শিখেছিলাম। ছাত্রী হলের মাঠে গিয়ে ডাকলে ছাত্রীরা একতাবদ্ধ হয়ে মিছিলে আসত। সব হলের ছাত্রীরা একতাবদ্ধ হয়ে ১৭ জুলাই রাস্তায় নামেন। পরবর্তী সময়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগ যখন আমাদের ওপর আক্রমণ করে, তখন হল ভ্যাকেন্ট করে দেয় প্রশাসন। তার পরও আমরা কয়েকজন ছাত্রী হলে ছিলাম। তখন ইন্টারনেট বন্ধ ছিল। আমরা ফোন ও চিরকুটের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। যোগাযোগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সাংকেতিক ভাষাও ব্যবহার করেছি। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ফোন টেক্সটের মাধ্যমে টেক্সট চেইন তৈরি করেছিলাম। একজনকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল, পত্রপত্রিকা কিংবা টিভিতে যেসব তথ্য পাওয়া যাবে তা ৫০ জনের কাছে টেক্সটের মাধ্যমে পৌঁছে দেবে। সেই তথ্যটি যার কাছে যাবে সেও আরো ৫০ জনকে টেক্সট করত। এভাবে সব বার্তা ১০ মিনিটের মধ্যে এক হাজার জনের কাছে পৌঁছে যেত। এ ধরনের কৌশল আমরা জুলাইয়ে প্রয়োগ করেছি।

সরকারের এক বছর পূরণ হয়েছে। অপরাধীরা কিন্তু আইনের আওতায় আসছে না! নারীদের পোশাক নিয়ে কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে! ঢাকায়, লঞ্চঘাটে ও চট্টগ্রামে এগুলো হয়েছে! এ বিষয়গুলো গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে যায় না। আমরা জানি, এ সরকার এক বছরে গত ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে পারবে না। আমরা সেটি প্রত্যাশাও করি না। কিন্তু এ সরকার দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে পারত, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারত।

এক বছরেও যদি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায় সেটি হতাশার। এক বছরে এত নিয়োগ হলো, এত পরিবর্তন হলো, তার পরও এক বছরে যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায় তাহলে কোনোভাবেই বলা যায় না গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষায় আমরা আছি। ওই পথে হাঁটছি কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ আছে।

প্রাপ্তি তাপসী, জুলাই আন্দোলনের সংগঠক