গত বছরের পহেলা জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্লাটফর্মটি আত্মপ্রকাশ করে। এর পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোয় আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম। এ আন্দোলন ১৫ জুলাই পর্যন্ত ক্যাম্পাসগুলোয় সীমাবদ্ধ ছিল। তবে কিছু কিছু জেলা শহরেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। তখন পর্যন্ত এটি শুধু শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হিসেবেই ছিল। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এ হামলা চালানো হয় প্রথমে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর ও পরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। এর পরই সর্বস্তরের জনতা এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছে। মূলত জনতাই অভ্যুত্থানকে সফল করেছে।
১৫ বছর ধরে নির্যাতন, লাঞ্ছনা-বঞ্চনার অভিজ্ঞতা মানুষ আর নিতে পারছিল না। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গুম ও হত্যা। আমরা ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যক্ষ করেছি— এসব ঘটনার পর কেউই রাতে ঘুমাতে পারছে না, কেউই স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারছে না। তাই মানুষ মনে করেছে—এ সরকার যদি ক্ষমতায় থাকে, তাহলে আমাদের আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব নয়। সেই আকাঙ্ক্ষা থেকেই মানুষ গণ-অভ্যুত্থানটি ঘটিয়েছে ও শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে।
অভ্যুত্থানের মধ্যে সরকার দীর্ঘদিন কারফিউ জারি করেছিল এবং শাটডাউন চলছিল। গত বছরের ১৭ জুলাই পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব ছিল; এমনকি ১৮ তারিখ পর্যন্তও নাহিদ ইসলাম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছিলাম। তাদের কাছে বার্তা পৌঁছে দেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু যে মুহূর্তে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হলো, সঙ্গে সঙ্গে কাউকে আর ফোনে পাওয়া যাচ্ছিল না, সবার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল।
কুয়েত মৈত্রী হলের রাফিয়া রাহিম রুমা, শামছুন্নাহার হলের অদিতি—কয়েকজন নারী সমন্বয়কের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। এছাড়া অয়নের সঙ্গেও আমার কথা হয়। আমরা শুনছিলাম নয় দফা দাবি তৈরি হবে। কিন্তু ১৯ তারিখ যখন ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যায় এবং কারফিউ শুরু হয়, ওই সময় রাত ২টার দিকে আমি যখন টেলিভিশন চালু করি, দেখি একাত্তর টিভিতে আমাদের নামে আট দফা দাবি প্রচার হচ্ছে। একাত্তরে টিভিতে দেখানো দফার সঙ্গে আমাদের প্রকৃত নয় দফার কোনো মিল ছিল না। এটা টিভিতে দেখে আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।
পরদিন আমার সঙ্গে নাহিদা সরওয়ার নিভা ও ভূঁইয়া আসাদুজ্জামান যোগাযোগ করে। ভূঁইয়া আসাদুজ্জামান আমাকে একটা বিবৃতি লিখে দিতে বলে। এর আগের দিন ইন্টারনেট শাটডাউন তুলে নেয়া, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা ও বিশ্ববিদ্যালয় খুলে দেয়ার দাবিতে আমরা একটা খসড়া বিবৃতি লিখেছিলাম। তিনি যখন আমাকে তাৎক্ষণিক একটা বিবৃতি লিখতে বলেন, তখন অয়ন ও আসাদের সহযোগিতায় মোবাইল ফোনে আমরা একটা বিবৃতি লেখি। আসাদ আমাকে বিবৃতির কথাগুলো প্রস্তুত করে দেন। আর অয়ন তখন আমাকে আমাদের ৬৬ জনের নামের একটা তালিকা দেন। দ্য ডেইলি স্টারের তিথি আপু আমাকে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের ফোন নম্বর দেন। আমি ২০ তারিখ সন্ধ্যা থেকে তাদের কাছে বিবৃতি পাঠাতে থাকি। আমাদের পক্ষে অনেক বেশি সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন ছিল। কিন্তু তার পরও যতজনকে পেয়েছি তাদের কাছে বিবৃতিটা পাঠিয়েছিলাম।
এর আগের দিন মাহি (সাংবাদিক) ভাইয়ের সঙ্গে আমার কথা হয়। চাঁনখারপুলে থাকা একজনের কাছে আমি বিবৃতির একটা কপি দিয়ে সেটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির অফিসে পৌঁছে দিতে বলি। সে হেঁটে সাংবাদিক সমিতির অফিসে গিয়ে সেটা পৌঁছে দেয়। তারপর প্রথম আলোর আসিফ হিমাদ্রি ভাইয়ের কাছে গিয়ে আরমান ভাই বলেছে, ৬৬ জনের নামে এ বিবৃতি এসেছে। আপনারা প্রচার করুন। তখন এভাবে অর্থাৎ অ্যানালগ যুগের মতো করে আমরা তথ্য আদান-প্রদান করতাম। পরিস্থিতি এমন যে পারলে কবুতর দিয়েও আমরা বিবৃতি পাঠাই। ইন্টারনেট শাটডাউন থাকা অবস্থায় আমরা এভাবেই কাজ করছিলাম। আমি, অয়ন ও কাদেরের নামে তখন ছোট ছোট বার্তা পৌঁছানো হতো। কাদের তখন নয় দফার নামে বার্তা দিত। ইন্টারনেট বন্ধ থাকা পুরো সময়টায় আমরা এভাবেই বার্তা আদান-প্রদান করতাম।
টেলিভিশন মিডিয়ার ওপর আমাদের কোনো ভরসা ছিল না। ওই সময়ের একটা দিনের কথা বলি। ২০ তারিখ সন্ধ্যায় আমরা যখন আমাদের বিবৃতিটা সব জায়গায় প্রচার করছিলাম, তখন একজন টেলিভিশন সাংবাদিকের সঙ্গে আমার কথা হয়। ওই সাংবাদিক আমাকে বলেন, ‘আমাদের বিবৃতি টেলিভিশনে প্রচার না করার জন্য সরকার তাদের অনেক চাপ দিচ্ছে।’ তিনি আমাদের বিবৃতি কোনোভাবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় পাঠানোর পরামর্শ দেন। এরপর আরব নিউজের শিহাব ভাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়। তাকে আমি আমাদের বিবৃতিটি বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে অনুরোধ করি। এরপর কিছু পত্রিকার কাছে আমাদের বিবৃতিটি পৌঁছাই। এরপর প্রতিদিন সকালবেলায় আমি পত্রিকা খুঁজে দেখতাম, কোনো পত্রিকা আমাদের বিবৃতি ছেপেছে কিনা। ওই সময়ে আমাদের একটা কাজ থাকত, কোনো পত্রিকায় আমাদের একটা লাইনও এসেছে কিনা, সেটা খোঁজা।
এর মধ্যে নাহিদ ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়—একটা ভয়ের সময় ছিল। তবে এত লাশ পড়ে গেছে, আমাদের পক্ষে স্বাভাবিকভাবে আর কোনো কিছু চিন্তা করা সম্ভব ছিল না।
ইন্টারনেট শাটডাউনের ওই সময় খুব খারাপ ছিল। খারাপ ছিল এ অর্থে—আমার জীবনের ঝুঁকির চেয়ে বেশি, খারাপ লাগত যে আমার বার্তা কোথাও পৌঁছাচ্ছে না। আমি একটা ভুয়া বার্তা কেন দেখব? আমাদের কথা যে কোথাও পৌঁছাচ্ছে না, ওই খারাপ লাগাটা সবচেয়ে বেশি কাজ করত। ওই সময় আমাদের চেষ্টা থাকত—যেন একটা লাইন হলেও আমাদের কাছ থেকে প্রচার হোক।
ওই সময়ের শুরু থেকে প্রতিদিন আমি মাঠে ছিলাম। আমি নিজে সাক্ষ্য দিতে পারি—এটা একটা পিপলস রেভল্যুশন, গণ-অভ্যুত্থান ছিল। যারা আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘চিলেকোঠার সেপাই’ পড়েছেন, তারা এর সঙ্গে মিল পাবেন। ওই উপন্যাসের কাহিনীর সঙ্গে চব্বিশের অভ্যুত্থানের একটা বড় মিল রয়েছে। উপন্যাসে যখন হাড্ডি খিজির মারা যায় তখন ওসমান রাতে ঘুমাতে পারে না। উপন্যাসটি ঊনসত্তরের প্রেক্ষাপটে লেখা হয়েছিল। আমাদের গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। আমরা বইপত্র পড়ে বড় হয়েছি, আমরা বিষয়টাকে এভাবেই ব্যাখ্যা করি। এটা পুরোপুরি গণমানুষের অভ্যুত্থান ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আমাদের ঝুঁকি ছিল। আমরা আন্দোলনকে ধরে রেখেছিলাম, আন্দোলনকে একটা ভয়েস দিয়েছিলাম। জেলা শহরগুলো পর্যন্ত আমাদের কর্মসূচিগুলো পালিত হচ্ছিল। এর বাইরেও কিন্তু মানুষ আসছিল। যেমন মিরপুর ডিওএইচএসে মিছিল হয়েছে, স্কুল-কলেজ থেকে মিছিল বের হয়েছে। তারা পুরোপুরি স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলগুলো করেছে। কোথা থেকে কী নির্দেশনা আসছে, মানুষ তা ঠিকমতো জানতও না। তখন শুধু যে যেভাবে পারে, নিজের মতো করে মাঠে নামার চেষ্টা করছিল। এটা একটা গণ-অভ্যুত্থান; এ গণ-অভ্যুত্থান ১৯৬৯-এর পর এ বাংলার মাটিতে দ্বিতীয় অভ্যুত্থান।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের একটা কথা আছে—যখন কোনো আন্দোলনে নারীরা মাঠে নেমে আসে, তখন ওই আন্দোলন সফল হয়। কারণ নারীরা আন্দোলনের শুরুর দিকে থাকে না। যখনই তারা নামে তখন আন্দোলন সফল হবে—এটা নিশ্চিত। তাই যখন আমরা প্রথম কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছিলাম, আমরা মেয়েদেরকে হল থেকে সংগঠিত করে নিয়ে আসতাম। যখন মেয়েদেরকে সংগঠিত করে আনা শুরু করি তখন আমাদের ভূমিকা কী থাকত? আমরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিলেও আমাদের কাজ ছিল মূলত সংগঠকের। আমরা যখন একটা ডাক দিতাম তখন ওই ডাকের বিপরীতে কতজন মানুষ আসবে, এটা তার ইচ্ছা শক্তির ওপর নির্ভরশীল, আমার ওপর না। হলগুলোয় একটা ডাক দিলে প্রচুর শিক্ষার্থী একত্রিত হয়ে যেত। একেক দিন ২০০ জন, ২৫০ জন, এমনকি ৪০০ জনের মিছিলও আমরা করেছি। আমরা তখন বুঝে যাই যে এ আন্দোলন সফল হবে। তখন প্রত্যেক দিনই আমরা বড় বড় মিছিল করতাম। ইন্টারনেট শাটডাউনের পর আন্দোলনের গতি কোন দিকে যাবে সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত ছিলাম না। কিন্তু পরে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ বা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিছিল বের করেছে। তবে মেয়েদের ওপর সরাসরি গুলিবর্ষণ হচ্ছিল না। তাদের ওপর লাঠিচার্জ হচ্ছিল। আমাদের আন্দোলনের পদ্ধতি একটু ভিন্ন ছিল। মেয়েরা মাঝখানে থাকত আর ছেলেরা থাকত চারপাশে। যখন ছেলেরা চারপাশে থাকে তখন পুলিশ হামলা করলে ছেলেদের ওপর এটার একটা প্রভাব পড়ে। তারা হয়তো আহত হচ্ছে, আর নারীদের হয়তো পেটানো হয়, পিটিয়ে সরিয়ে দেয়া হয়।
শুধু ছেলেরা থাকলে এ আন্দোলন ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। কিন্তু মেয়েরা থাকায় আন্দোলনকে ধরে রাখা গেছে এবং একত্রিত করে রাখা গেছে। সে জায়গা থেকে বলা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটা প্রথম কোনো ঘটনা যেখানে নারীরা এত স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। এটা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত। একটা পর্যায়ে নারী আর পুরুষের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই, তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সমান কণ্ঠে সমানভাবে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছে। এটাকে স্বীকৃতি দিতে হবে। এখন প্রয়োজন নারীদের অংশগ্রহণকে স্বীকৃতি দেয়া এবং সমাজের নারীদের অবস্থানের পুনর্বিন্যাস করা।
উমামা ফাতেমা, জুলাই আন্দোলনের সংগঠক
ও সাবেক মুখপাত্র, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন










