‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা দেশটা কারো বাপের না’
১৭ জুলাই মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হলগুলো প্রথম কড়া নেড়েছিল, ভেসে আসা উত্তাল স্লোগান স্ফুলিঙ্গের মতো একে একে ছড়িয়ে পড়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য হলগুলোয়। ক্রমান্বয়ে তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে সারা দেশের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে সারা দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। এ স্লোগানের ভিত্তি ও আকাঙ্ক্ষা ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সমতা নিশ্চিত করা। একইভাবে আমরা যদি আরেকটা স্লোগানের কথা বলি
‘কে এসেছে কে এসেছে?
পুলিশ এসেছে পুলিশ এসেছে
কি করছে কি করছে?
স্বৈরাচারের পা চাটছে’
২৪-এর জুলাই বিপ্লবে ঝড় তোলা, সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সাহসী স্লোগানের একটি ছিল এটি। ঠাকুরগাঁওয়ের কলেজপড়ুয়া মেয়ে তামান্না প্রতিনিধিত্ব করেছিল এই আইকনিক স্লোগানের তারুণ্য এবং আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণের সুপার আইকন হিসেবে। আন্দোলনে আমরা দেখেছিলাম শহীদ ভাইয়ের লাশ কাঁধে নিয়ে দুই বোনের মিছিল, ভাইয়ের জন্য শোককে রূপান্তরিত করেছিল শক্তিতে ফ্যাসিবাদ পতনের প্রতিজ্ঞায়। আমার চোখে ভাসে প্রিজনভ্যানের সামনে স্কুলড্রেসে দুই হাত প্রসারিত করে বুক দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টারত বোনের মুখ, আবার সাদাকালো পোশাকে বৃষ্টিতে ভিজে হাত উঁচু করে স্লোগান দেয়া সেই মেয়েদের ছবি, কিংবা প্রিয়জনকে মাথায় পতাকা বেঁধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করা, কিংবা মিছিলের সম্মুখভাগে থাকা নারীদের, যাদের কোথাও আজ দেখি না। অনেকেই স্বীকার করেন জুলাই আন্দোলনে মেয়েদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, কিন্তু কাউকে প্রশ্ন করতে দেখি না তারা আজ কোথায়?
জুলাই আন্দোলনের পর দেশে অনেক কমিশন গঠিত হয়েছে, কিন্তু সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের হার তো দূরের কথা ন্যূনতম প্রতিনিধিত্বের অংশগ্রহণ দেখি না বেশির ভাগ ক্ষেত্রে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের প্রথম সারির অন্যতম নেত্রী, পরিচিত মুখ সামান্তা শারমিনকেও এখন বলতে শুনি সিস্টেমেটিক্যালি নারীদের সবখানেই মাইনাস করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্কার কমিশন গঠন করা হলো। এমন নয় যে এসব কমিশনের কার্যক্রম নারীর আওতামুক্ত, বরং অর্ধেক জনগোষ্ঠীর অংশ হওয়ার কারণে পলিসির সবখানেই তাদের উপস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো, মানুষ হিসেবে নারী বরাবরের মতোই চব্বিশেও উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
বলা যেতেই পারে নারীদের ব্যাপারে কথা বলার জন্য আলাদা করে নারী সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। অত্যন্ত সত্যি কথা, অথচ দুঃখজনক বিষয় হলো এ সংস্কার কমিশনেও দেশের নারীদের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়নি। এমনকি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলটিও সংস্কার কমিশনে নারীদের বিষয়ে কথা বলার জন্য তাদের সেই সিনিয়র নেতাদের বাইরে আসতে পারেনি। অথচ হতে পারত এ রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ নারীদের আনুপাতিক অংশগ্রহণ ভিত্তিক মতামত নিয়ে তারা তাদের সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে এবং সিনিয়র পুরুষ নেতাদের পাশাপাশি নারী নেত্রীরাও তা তুলে ধরতে পারছেন।
এবার আসি নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের ব্যাপারে, যেখানে কমিশন প্রস্তাব করেছে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং নারীদের সেই তিনশ আসনেই নির্বাচিত হয়ে আসতে হবে। সংবিধানের বর্তমান কাঠামোয় তিনশ আসনে নির্বাচনে নারীদের অংশ নিতে কোনো বাধা নেই। সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমানের সময় নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি এবং সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখার বিধান চালু করা হয়। ধারাবাহিকভাবে এটি সর্বশেষ ৫০টি আসনে এসে ঠেকেছে। এ আসনগুলোর বিন্যাস হওয়ার কথা ছিল সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারীর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে তার সমাজের নারীদের বিদ্যমান সমস্যা ও সমাধানের পথ নিয়ে কথা বলার জন্য। যদিও তা বেশির ভাগ আটকে গেছে ক্ষমতাসীন নেতাদের স্ত্রী, কন্যা ও প্রিয়পাত্রী বিবেচনায়।
সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রস্তাব দিয়েছে সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে বৃদ্ধি করে ১০০ করতে এবং আসনে নির্বাচনের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে আসতে হবে। যদিও এ নির্বাচন নিয়ে তারা কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। এখানে অনেকগুলো প্রশ্ন থেকে যায়। এ ১০০ আসনের সীমানা কীভাবে নির্ধারণ হবে? যদি সীমানা বৃদ্ধি পায় নির্বাচনের খরচ এবং সময়সীমা বাড়বে কি? কারণ সীমানা ও ভোটার সংখ্যার সঙ্গে খরচের নিবিড় সম্পর্ক আছে। যদি আয়তন ও খরচ না বাড়ে তাহলে আসনগুলো কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন করবে? কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীরা রাজনীতিতে খুব বেশি আগ্রহী হয় না। আর হলেও সেই সংখ্যা খুব বেশি নয়। একটা আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো একাধিক পুরুষ নেতৃত্ব তৈরি হলেও নারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। ৩০-৪০ বছর বয়সী একজন নারী বা পুরুষের কর্মক্ষমতা এবং ৫০-৬০ বছরের একজনের কর্মক্ষমতা সমান হয় না। নারীদের জন্য কোন ১০০ আসনে কখন, কীভাবে নির্বাচন হবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা দরকার। ভালো সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট নারীদের সঙ্গে কথা বলা দরকার, যার দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা আমার চোখে অন্তত পড়েনি।
একটা গণতান্ত্রিক দেশের সংসদে জনসাধারণের আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যদি সরকার সর্বস্তরের মানুষের জন্য কাজ করার আন্তরিক সদিচ্ছা পোষণ করে। এ সময়ের বাংলাদেশের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকা শক্তির একটা নারী, অন্যটি তরুণ। নারীদের মধ্যে রয়েছে প্রধানত গৃহিণী, কর্মজীবী, পেশাজীবী ও শ্রমিক। একজন নারী যখন পোশাক শ্রমিক আর একজন যখন নারী যখন পোশাক কারখানার মালিক, দুজনকেই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়, তবে সেখানে মিলের চাইতে অমিলটাই হয়তো বেশি থাকে। আইন প্রণয়ন করতে হলে সংসদে দুজনের কথাই শোনা দরকার। তবে আপনি যদি দুজনকেই নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় আনতে চান আপনাকে ভাবতে হবে উভয়ের সামর্থ্যের সুবিধা এবং সীমাবদ্ধতার কথা। নির্বাচনের প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ সবার জন্য সমান না। একইভাবে ভূমিবৈচিত্র্যের কারণে রয়েছে পাহাড় এবং সমতলের ব্যবধান, রয়েছে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যবধানের বাংলাদেশীরা, এদের কাউকে আপনি ফেলতে পারবেন না, কারণ সবাইকে নিয়েই বাংলাদেশ। স্বীকার করেন আর নাইবা করেন অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের মতো নির্বাচনকালীন চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশেও আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় কালো টাকার ব্যবহার। নির্বাচনকালীন ইলেকশন কমিশনের দেয়া আইন মান্য করে এদেশে নির্বাচন হয় না এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। তাহলে জেনেশুনে এ বাস্তবতার মধ্যে সংরক্ষিত আসনের নামে আপনি কাদের কোথায় ঠেলে দিচ্ছেন তা সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে অবশ্যই ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে চব্বিশের গণআকাঙ্ক্ষা ছিল ফ্যাসিবাদের পতন করে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলা, যেখানে মানুষ তার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে। সারা বিশ্বকে আমরা দেখিয়েছি কীভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নিজের অধিকারের কথা বলতে হয়, ভবিষ্যতের জন্য আমরা দেখাতে চাই কীভাবে ধ্বংসস্তূপের মধ্য দিয়ে রোল মডেল হয়ে ওঠা যায়। আমাদের সুযোগ আছে দেশের বর্তমান জনমিতিক লভ্যাংশ ব্যবহার করে আগামীর বাংলাদেশকে কার্যকর গণতান্ত্রিক ও কল্যাণকর দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক বিশ্বে আত্মমর্যাদার সঙ্গে মাথা উঁচু করে চলার। বাংলাদেশের সাফল্য অনেক, আগামীর জন্য চ্যালেঞ্জ যেমন আছে, তেমনি আছে অপার সম্ভাবনা। সম্ভাবনার জায়গাগুলোয় আমরা যেন ভুল পলিসির কারণে ব্যর্থ না হয়ে যাই, বরং সবার অংশগ্রহণে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, তাহলেই চব্বিশের অভ্যুত্থান সফল হবে। প্রত্যাশা করি গুটিকয়েক মানুষ ছাড়া চব্বিশ স্মৃতির পাতায় শুধু শূন্যতা আর অপ্রাপ্তির যোগফল হিসেবে না থেকে তুলনামূলক ভালো কিছু হয়েছে, অন্তত এ প্রাপ্তিটুকু নিশ্চিত হোক সবার কাছে।
সুলতানা জেসমিন জুঁই, সাবেক সহসভাপতি, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদ










