অধ্যাপক ডা. মরিয়ম ফারুকী স্বাতী
গাইনি কলসালট্যান্ট এবং ইনচার্জ
ল্যাবএইড ফার্টিলিটি সেন্টার
বন্ধ্যাত্বের বিষয়ে আমাদের দেশে স্বামী বা স্ত্রীর সমস্যা নির্ণয় না করে ধরে নেয়া হয় সমস্যা স্ত্রীর। এছাড়া অনেক কুসংস্কার রয়েছে। এ জায়গায় আমাদের দেশ কতটুকু এগিয়েছে?
এ বিষয়ে কুসংস্কার কিছুটা দূর হচ্ছে। যাদের ছেলে-মেয়ে হয় না তাদের নিয়ে আমি অনেক বছর প্র্যাকটিস করছি। এটা সত্য যে কুসংস্কারের জন্য আমরা এগোতে পারছি না। যেমন যখন কাউকে বিভিন্ন চিকিৎসার কথা বলি, তখন তারা বলে আমরা গ্রামে গিয়ে আমাদের দাদা-দাদি বা মা-বাবার সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেব। এ আলাপ পর্ব পার করে রোগী আবার আসতে দেরি করে ফেলেন। এখানে কুসংস্কারটা কাজ করে। কারণ সেখানে তাদের অনেক কথা বলা হয়। তবে এখন এটা কাটিয়ে ওঠার পর্ব চলছে। একটা নতুন চিকিৎসা নেয়ার ব্যাপারে আগে যেমন ৬৮ শতাংশ কুসংস্কার কাজ করত, এখন সেটা ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।
কুসংস্কারটা শুরু হয় কখন?
একটা মেয়ের বিয়ের ছয় মাস পর যখন বাচ্চা হচ্ছে না, তখন থেকেই এটা শুরু হয়। বলা হয়, তোমার কেন বাচ্চা হচ্ছে না। তোমার কি কোনো সমস্যা আছে নাকি। এখানে দম্পতি সন্তান গ্রহণের প্রস্তুতির ব্যাপারটি গুরুত্ব দেয়া হয় না। আবার ছয় মাস পর একই কথা শুরু হয়। এজন্য মেয়েকেই দায়ী করা হয়। তারপর বলা হয়, যাও তুমি গিয়ে ডাক্তার দেখাও। মেয়েদের জন্য এটা একটা মানসিক চাপ। আরেকটা বিষয় এখন তো কেস স্টাডিতে দেখা যাচ্ছে ৫০ শতাংশ ছেলে এবং ৫০ শতাংশ মেয়ের সমস্যার কারণে সন্তান হচ্ছে না। কিন্তু আগে শুধু মেয়েকেই দায়ী করা হতো।
বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যা বাংলাদেশে দিন দিন বাড়ার কারণ কী?
এখন সন্তান না হওয়ার পেছনে অনেক আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। বন্ধ্যাত্বজনিত সমস্যাটা জানা যাচ্ছে। আরেকটি বিষয় হলো বয়সের ফ্যাক্টর। এখন মানুষের আর্থসামাজিক উন্নতি হয়েছে। মেয়েরা দ্রুত বিয়ে করছে না। ভাবে আগে ক্যারিয়ার গড়ে নিই। তারপর ভাবে এখন সন্তান নিলে লালনপালন করতে পারব কিনা। এসব ভাবতে ভাবতে বয়সটা বাড়িয়ে ফেলে। আগে আমরা বলতাম, মেয়েদের বয়স ৩৫ পেরিয়ে গেলে সন্তান হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। কিন্তু এখন পৃথিবীব্যাপীই বলা হচ্ছে, ৩০ বছরের পর থেকেই বাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
এখানে ছেলেদের বয়সও ফ্যাক্টর। ছেলেদের বয়স বেশি হলে যে সিমেন দিয়ে গর্ভধারণ করবে তার কোয়ালিটি খারাপ হয়ে যায়। তাই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের জন্যই বয়স একটা বড় ফ্যাক্টর।
বাংলাদেশে আইভিএফ সেবা শুরু হয়েছে বেশ কয়েক বছর। কিন্তু এখনো এটি সেভাবে মানুষের কাছে পরিচিতি পায়নি। আইভিএফ চিকিৎসা পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাগুলো কী?
আমরা আইভিএফ চিকিৎসা কেন্দ্র চালাই ১৪ বছর হয়ে গেল। এ চিকিৎসার প্রচার সেভাবে পায়নি। যিনি চিকিৎসা নেন, তিনি হয়তো অন্যকে বলেন। এভাবে প্রচার হয়। যদি মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার হয় তাহলে অনেকে বিষয়টি জানতে পারবেন। আজকাল তো মিডিয়ার ছড়াছড়ি। পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে প্রচার হলে মানুষ সেটা পড়বে, এ বিষয়ে জানতে পারবে। টিভিতেও প্রচার দরকার। মানুষ যখন জানবে তখন চিকিৎসার জন্য আসবে।
আগে আইভিএফ সেবা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা ছিল বেশি। এখন দেশেই মিলছে এ সেবা। আইভিএফ চিকিৎসায় বিদেশের সঙ্গে আমাদের দেশের তুলনা করলে বাংলাদেশের অবস্থান কোন পর্যায়ে আছে?
ধনী দেশ নতুন জিনিস এলে তারা দ্রুত নিয়ে নেয়। যেমন এআই আসছে তারা দ্রুত নিয়ে নিয়েছে। এম্ব্রায়োস্কোপ এল তারা সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে নিল। আমরা সেগুলো হায়ার করে আনতে অনেক সময় লেগে যায়। আমাদের স্ট্যান্ডার্ড কিন্তু ঠিক আছে। তবে নতুন কিছু আবিষ্কার হলে সেটা পেতে দেরি হয়ে যায়। তার পরও আমাদের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সফলতা ভালোই হচ্ছে। আইভিএফ সেবার সফলতা আমাদের প্রায় ৪০ শতাংশ।
বেশির ভাগের ধারণা আইভিএফ সেন্টার মানেই টেস্টটিউব বেবি। সত্যিই কি তাই? আইভিএফ সেন্টার কি শুধু টেস্টটিউব বেবির চিকিৎসাই দেয় নাকি এখানে অন্য কোনো চিকিৎসা পদ্ধতিও রয়েছে?
বিষয়টি সে রকম না। কোনো দম্পতি এলে প্রথমে তাদের কী সমস্যা জানার চেষ্টা করা হয়। তারপর তাদের কাউন্সেলিং করাতে হয়। কীভাবে বাচ্চা হতে পারে সে বিষয়ে ভাবতে হয়, তাদের বোঝাতে হয়। পরীক্ষা ও ডায়াগনোসিসের বিভিন্ন স্টেপ পার হয়ে আমরা সিদ্ধান্তে আসি যে আসলে কোন ট্রিটমেন্ট লাগবে। হয়তো সাধারণ একটা অ্যাডভাইসেই প্রেগন্যান্সি হয়ে যেতে পারে। হয়তো কারো স্বামী বিদেশে বা দূরে থাকে। সে কারণে বাচ্চা হচ্ছে না। এভাবে অল্প কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেও প্রেগন্যান্সি হতে পারে। তারপর আমরা ধাপে ধাপে ওষুধ দিই। কাজ না হলে ইনজেকশন দিই। তারপর আইওয়াই করি। এর পরও যদি না হয় তখন আমরা টেস্টটিউব বেবির কথা বলি। ১০০ জনের মধ্যে ৫ বা ১০ শতাংশের আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবির প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রথম দিকের টিটমেন্টেই ফলাফল পাওয়া যায়।
এ সেক্টরে রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা কেমন?
এ বিষয়ে মোটামুটি অনেক চিকিৎসক আছেন। রোগী যদি প্রথম ধাপগুলো পেরিয়ে আমাদের কাছে আসেন, তাহলে ভালো। যেমন জেলা পর্যায়ে গাইনি ডাক্তার দেখিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। তারপর আইইউআইটা করান। তাহলে আমাদের মধ্যে প্রেসার কমে। এ পদ্ধতি হলে ভালো হয়। প্রথমে জেলায় কাউন্সেলিংয়ের কাজগুলো হয়ে গেলে অনেক সুবিধা হয়।
জেলাগুলোয় কি পর্যাপ্ত চিকিৎসক আছেন?
এখন তো পিজি হাসপাতালে এ বিষয়ে পড়ানো হয়। ঢাকা মেডিকেলেও আছে। তারা যদি পাস করে নরমাল গাইনি প্র্যাকটিস না করে ইনফার্টিলিটিটাই করেন তাহলে অনেক উন্নতি হবে। তখন রোগীর খরচও কমে আসে।
খরচ কেমন হয়?
এখানে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ইনভেস্টিগেশন করতে হয়। দুজনের ক্ষেত্রেই খরচ আছে। ওষুধ ও ইনজেকশন লাগে। কিন্তু এখানে মেইনটেন্যান্সটা গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তিনবার ওষুধ খেয়ে অনেকে হতাশ হয়ে যান। তারপর আইইউআই (ইনট্রা-ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন) করার জন্য ৩০-৪০ হাজার টাকায় হয়ে যায়। আর যদি আইভিএফ করতে হয়, তাহলে খরচ হবে ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। এটা সর্বমোট খরচ। এক্ষেত্রে যার নিউট্রিশন পরিস্থিতি ভালো, কোনো সমস্যা নেই, তাকে ট্রিটমেন্ট দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে পড়ার নিয়ে নতুন চিকিৎসকদের আগ্রহ কেমন?
আমার জীবনের উদাহরণ থেকে বলি। আমি প্রথমে ক্যান্সার বিষয়ে পড়তে চেয়েছিলাম। তখন একজন বিশেষজ্ঞ আমাকে বললেন, তুমি ক্যান্সার বিষয়ে যাও। কিন্তু মনটা দুঃখে ভরে থাকবে। যখন দেখবে ক্যান্সার ভালো হচ্ছে না, তখন হতাশ হবে। এর থেকে বরং এ বিষয়ে আসো, তখন দেখবা সফলতা পাবে। সুতরাং আইইউআই ও আইভিএফ বিষয়ে সাকসেস আছে। সেক্ষেত্রে আগ্রহী চিকিৎসকরা চাইলে আইওয়াই প্রশিক্ষণ নিতে পারে। আমাদের কাছে এলে আইভিএফ প্রশিক্ষণও নিতে পারে। তাহলে আমাদের দেশের এ ধরনের চিকিৎসা খাতে সক্ষমতা আরো বাড়বে।
শ্রুতলিখন: বাশার খান










