দীর্ঘ কর্মজীবনে মৎস্য খাতের সবচেয়ে বড় কোন পরিবর্তনটি আপনার চোখে পড়েছে?
আমাদের দেশে একসময় মৎস্য খাত অবহেলিত ছিল। এখন দৈনন্দিন প্রাণিজ আমিষের বড় অংশই পূরণ হচ্ছে মৎস্য খাত থেকে। পাশাপাশি রফতানির মাধ্যমেও এটি অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট শুরুর আগে প্রধানত মৎস্য অধিদপ্তরই বাংলাদেশে মৎস্য খাতের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট যাত্রা করে ১৯৮৪-৮৫ সালে। এরপর এখানে কর্মরত গবেষক ও বিজ্ঞানীরা মৎস্য চাষ এবং ব্যবস্থাপনাবিষয়ক উন্নত প্রযুক্তি-কলাকৌশল উদ্ভাবন শুরু করেন। যেটি মাঠ পর্যায়ে ব্যবহারের ফলে দেশের মৎস্য খাতের চিত্র বদলে যেতে থাকে। আগে যেখানে অভ্যন্তরীণ নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ের মতো মুক্ত জলাশয় থেকে সিংহভাগ মাছ আহরণ হতো। এখন সে বাজার দখল করে নিয়েছে চাষে উৎপাদিত মাছ। মৎস্য খাতে এটি একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। বিশেষ করে ৯০-এর দশকে মৎস্য চাষের অগ্রযাত্রা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
নদ-নদী আর মাছের প্রাচুর্যের দেশে মাছের দাম ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। এ রূপান্তরের পেছনে কারণ কী?
যেহেতু সবকিছুর দাম আগের তুলনায় বেড়েছে, স্বাভাবিক কারণেই মাছের দামও বেড়েছে। পাশাপাশি মাছের উৎপাদন খরচও বেড়েছে। এছাড়া জনসংখ্যা বাড়ায় মাছের চাহিদাও বেড়েছে। আগে মাছের মাথাপিছু ভোগের পরিমাণ ছিল ২২-২৩ গ্রাম। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৫০ গ্রামের বেশি। কিন্তু সে তুলনায় মাছের সরবরাহ কম। আবার রফতানিও হচ্ছে। সব মিলিয়েই মাছের দাম বেড়েছে।
দেশে মাছ উৎপাদন কয়েক গুণ বেড়েছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে দাবি করা হয়। কিন্তু বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে এর ফারাক কেন?
পরিসংখ্যান ব্যুরো আমাদের যে তথ্য দেয় সেটি যাচাইয়ের সক্ষমতা আমাদের নেই। সময় এসেছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে আলাদা করে পরিসংখ্যানবিদ নিয়োগ দিয়ে নিজস্ব তথ্য সংগ্রহ করার। যেমনটা কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে করা হয়। মৎস্য গবেষণার জন্য সঠিক পরিসংখ্যান অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে আমাদের মৎস্য খাতে কী কী দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হচ্ছে?
সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে আমাদের অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছের প্রজনন উপযোগী প্রতিবেশ ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে মৎস্য উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাচ্ছে।
লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের মিঠা পানির মাছের অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে। এ সংকট মোকাবেলায় করণীয় কী?
এটি একটা প্রাকৃতিক ব্যাপার। এজন্য আমাদের নদীগুলো বছরব্যাপী প্রবাহমান রাখতে হবে, যাতে শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা ওপর চলে না আসে। লবণাক্ততার কারণে মাছের উৎপাদন কমলেও কিছু কিছু মাছের প্রজাতি কিন্তু অভিযোজন ক্ষমতার কারণে টিকে আছে। এজন্য আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর প্রবাহ নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিএফআরআইয়ের প্রধান সীমাবদ্ধতাগুলো কী কী?
গবেষণার জন্য একমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এটি। দেশের প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি আঞ্চলিক গবেষণা কেন্দ্র থাকা উচিত। এবং নদীবাহিত এলাকায় ছোট ছোট গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা প্রয়োজন। চিংড়ির মতো ইলিশের জন্য আলাদা গবেষণা কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন। আর এসব গবেষণা কেন্দ্রে প্রয়োজনীয়সংখ্যক লোকবল ও যন্ত্রপাতি থাকা প্রয়োজন। সর্বোপরি গবেষণার কলেবর ও বরাদ্দ যুগোপযোগী করা উচিত। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে দেশের মৎস্য উৎপাদন টেকসইভাবে বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।
অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের চাষের মাছকে বিষাক্ত করে তুলছে। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?
মাছে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের বড় অংশই হয়ে থাকে অপ্রয়োজনীয় ও অবৈজ্ঞানিক পন্থায়; যা মাছের জন্য তো বটেই, মানবস্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতি বয়ে আনে। মাছে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার শুরু হয়েছে পোলট্রিতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের দেখাদেখি। কিন্তু মাছের খাবারের মাধ্যমে পুকুর বা পানিতে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মুরগিকে অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার পর সেটা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে না। মুরগি খেয়ে ফেলে। কিন্তু মাছে প্রয়োগ করলে সেটা পানিতে থেকে যায়। আবার যেহেতু বেশি পরিমাণে দেয়া হয়, তাই মাছের শরীরে থাকা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক মানবদেহে প্রবেশ করে। মাছের মধ্যে অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া আছে। আবার পানিতেও অনেক উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। অপ্রয়োজনে ও অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের ফলে ভালো ব্যাকটেরিয়াগুলো মরে যায়। অন্যদিকে খারাপ ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রতিরোধী হয়ে ওঠে। এ মাছ যখন মানুষ খায় তখন মানবদেহেও অ্যান্টিবায়োটিক ঢুকে যায়।
বাজারে নিরাপদ মাছ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? মৎস্য অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, নাকি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের?
বাজারে নিরাপদ মাছ নিশ্চিত করার প্রাথমিক দায়িত্ব মূলত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের। তাদের মূল কাজ হলো খাদ্যনিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত করা, যার মধ্যে মাছও অন্তর্ভুক্ত। এ কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শের জন্য মৎস্য অধিদপ্তরের সাহায্য চাইতে পারে। মৎস্য অধিদপ্তর মাছ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও মৎস্যসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত, যা পরোক্ষভাবে নিরাপদ মাছের জোগান নিশ্চিত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা করে, যার মধ্যে ভেজাল বা অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহ প্রতিরোধও অন্তর্ভুক্ত। তারা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ভোক্তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কাজ করে।
ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ সুরক্ষায় আমাদের করণীয় কী?
ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যার ফলস্বরূপ ইলিশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) সনদ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এ জিআই সনদ সুরক্ষিত রাখতে আমাদের বহুমুখী কৌশল অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্রগুলোর কার্যকর সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে গবেষণার মাধ্যমে পানির গুণগত মান বজায় রাখা এবং দূষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা অতীব জরুরি। ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রের জন্য নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও নাব্য রক্ষা করা অপরিহার্য। তাই নদীর তলদেশের পলি অপসারণ করে চর গঠন রোধ করতে হবে এবং অপরিকল্পিত বাঁধ বা স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকতে হবে, যা ইলিশের পরিযায়ী চলাচল ব্যাহত করে। একই সঙ্গে শিল্পবর্জ্য ও কৃষি রাসায়নিকের মতো দূষণ সৃষ্টিকারী উপাদানগুলোর নদীতে প্রবেশ রোধ করতে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। ইলিশ সংরক্ষণে জেলে সম্প্রদায় ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা ইলিশের গুরুত্ব এবং প্রজনন মৌসুমে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা থেকে বিরত থাকার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারে।
আগামী দিনের মৎস্য খাতকে টেকসই করতে হলে কোন বিষয়ে আমাদের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
আমাদের মৎস্য উৎপাদন আসে তিন জায়গা থেকে। চাষের মাছ, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে আহরণ ও সমুদ্র থেকে আহরণ। এ তিনটি খাতকে সমান গুরুত্ব দিয়ে সহনশীল উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে।










