দেশের প্রানিজ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহে দীর্ঘ তিন দশক ধরে কাজ করছে কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড। খাদ্যের উৎপাদন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় কোন বিষয়টি জোর দিচ্ছে কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড?

পশুখাদ্যে নিরাপদ ও গুণগত মানসম্পন্ন ফিড উৎপাদন এবং বিপণনের লক্ষ্যে তিন দশক আগে যাত্রা শুরু করে কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল খাদ্যের গুণগত মানে কোনো আপস না করা। আমরা বিশ্বাস করি, প্রাণিসম্পদের সুষ্ঠু বিকাশের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিসম্মত ফিড অত্যাবশ্যক। সে বিশ্বাস থেকেই আমরা সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে ফিড উৎপাদনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং এই একটি বিষয়ের ওপরই আমরা জোর দিচ্ছি।

সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এ খাতে সংস্কার ও কী ধরনের পরিবর্তন জরুরি?

সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া, তবে তা হতে হবে যুক্তিসংগত ও খাতভিত্তিক বাস্তবতানির্ভর। এগ্রো সেক্টর বিশেষ করে ফিড শিল্প দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সম্প্রতি ঘোষিত বাজেট-পরবর্তী কিছু নীতিগত সিদ্ধান্ত এ খাতে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষ করে করপোরেট ট্যাক্স হার ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছে, যেখানে অন্যান্য অনেক শিল্পের ক্ষেত্রে এ হার অপরিবর্তিত রয়েছে। এ বৈষম্য এগ্রোভিত্তিক শিল্পের টেকসই উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া টার্নওভার ট্যাক্স এবং আমদানীকৃত কাঁচামালের ওপর অগ্রিম আয়কর রেট আরোপিত করপোরেট ট্যাক্সের বিপরীতে একটি অসামঞ্জস্য ও ভারসাম্যহীন পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যেহেতু ফিড উৎপাদনের কাঁচামাল প্রধানত আমদানিনির্ভর, তাই এ ধরনের কর আরোপ সরাসরি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করছে। ফলে চূড়ান্তভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে খামারিরা এবং প্রভাব পড়ছে দেশের খাদ্য চেইনে।

প্রানিজ খাদ্যে এবং আগামীর খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কোয়ালিটি ফিডসের বিনিয়োগ পরিকল্পনা কী?

টেকসই উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের পথে বিনিয়োগ পরিকল্পনা—

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টেকসই উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কোয়ালিটি ফিডস লিমিটেড বিনিয়োগ পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো— শূন্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়ন। উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতি বছরই নতুন উৎপাদন প্লান্ট যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি তিন বছর ধরে পুরনো ফ্যাক্টরি ইউনিটগুলোর আধুনিকায়ন ও ভারসাম্যহীনতা দূরীকরণে কাজ চলমান রয়েছে।

এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুরনো যন্ত্রাংশ ও প্রযুক্তি প্রতিস্থাপন করে আধুনিক, স্বয়ংক্রিয় ও প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। ফ্যাক্টরির পুরনো অবকাঠামোগুলোর সংস্কার ও পুনর্ব্যবহার উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।

সব কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব, শ্রমিক সহায়ক ও উৎপাদন উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে বৃহৎ বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

এ প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২০২৬ সালের শেষার্ধে সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

স্থানীয় কোম্পানিগুলোর সরবরাহ ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এ খাতকে টেকসই করতে আরো বড় কোনো বিনিয়োগ প্রয়োজন রয়েছে কিনা?

বর্তমানে আমাদের বিপণন ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো দেশের মহাসড়কগুলোর গতি। গড় যানবাহন গতি এখনো ঘণ্টায় মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার, যা উৎপাদিত পণ্য সময়মতো খামারিদের কাছে পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ধীরগতির ফলে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সময় বেশি লাগে, অপারেশনাল খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কোম্পানিগুলো উৎপাদিত ফিডের মূল্যবৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে প্রান্তিক খামারিদের ওপর, যারা অতিরিক্ত ব্যয় বহনে সক্ষম নয়। পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, অবকাঠামোগত উন্নয়নের কারণে তাদের মহাসড়কে গড় গতি বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ, যা উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাকে করেছে আরো কার্যকর ও প্রতিযোগিতামূলক।

এ সেক্টরের টেকসই উন্নয়নের জন্য জরুরি বিষয়গুলো হলো:

মহাসড়ক ও লজিস্টিক অবকাঠামোর উন্নয়ন, গন্তব্যভিত্তিক মাল পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যৌথ বিনিয়োগের উদ্যোগ।

ভালো মানের ফিড সঠিক সময়ে, সঠিক মূল্যে খামারিদের কাছে পৌঁছে দিতে হলে এ অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে, অন্যথায় পুরো সাপ্লাই চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে।

খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বড় চ্যালেঞ্জ পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ বিষয়ে সরকার কোন উদ্যোগটি নিতে পারে বলে মনে করেন?

ফিড ইন্ডাস্ট্রি একটি সম্পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক ও আত্মনির্ভর খাত। মুক্তবাজার অর্থনীতির আলোকে বাংলাদেশের ফিড ইন্ডাস্ট্রি বর্তমানে একটি পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক খাতে পরিণত হয়েছে। এ খাতে বর্তমানে ২৫০টিরও বেশি রেজিস্টার্ড ফিড মিল সক্রিয় রয়েছে, যারা প্রতিনিয়ত মান ও মূল্যের দিক থেকে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে।

খামারি বা ডিলাররা চাইলে বিদেশ থেকেও বিনা শুল্কে ফিড আমদানির সুযোগ পান, যেখানে স্থানীয় উৎপাদকদের জন্য কোনো ধরনের বাজার সুরক্ষা বা নিষেধাজ্ঞা নেই। ফলে এখানে মূল্য নির্ধারণ হয় চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে, যেমনটি একটি আদর্শ মুক্তবাজারে হয়। বাজারে প্রতিযোগিতা এতটাই স্বচ্ছ যে দাম নিয়ে সরকারের হস্তক্ষেপ বা নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন পড়ে না। এছাড়া খামারি বা ডিলার চাইলেই নির্ধারিত ফর্মুলেশন সাপেক্ষে ফিড তৈরি করে ব্যবহার করতে পারে।

বর্তমানে দেশীয় ফিড উৎপাদন দেশীয় চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম। বরং অতিরিক্ত উৎপাদন সামর্থ্যের কারণে ভারতের আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে রফতানি কার্যক্রম এরই মধ্যে শুরু হয়েছে, যা বাংলাদেশের ফিড শিল্পের সক্ষমতার প্রমাণ।

এ খাতে প্রাইভেট সেক্টরের ব্যাপক বিনিয়োগ ও সক্ষমতার কারণে বর্তমানে সরকারিভাবে নতুন করে বিনিয়োগের কোনো প্রয়োজন নেই। বরং সরকারের ভূমিকা হতে পারে এ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতিসহায়তার মাধ্যমে রফতানি ও টেকসই উন্নয়নকে উৎসাহ দেয়া।