চিকিৎসার মান নিয়ে দেশে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা ছিল, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বড় সংস্কার হবে। গত এক বছরে স্বাস্থ্য খাতের কতটা পরিবর্তন হয়েছে?
আমি গত এক বছরের বিশেষ কোনো পরিবর্তন দেখিনি। আগে যেমন ছিলাম তেমনই চলছে। প্রত্যাশা পূরণের সে রকম পদক্ষেপ আমার চোখে পড়েনি।
স্বাস্থ্যসেবার কোন কোন দিক সংস্কার করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
এ দেশের প্রায় ১২ কোটি মানুষ বেসরকারি খাত থেকে স্বাস্থ্যসেবা পেয়ে থাকে, যা মোট জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশ। সংস্কারের সবচেয়ে বড় জায়গা পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ডিজি হেলথের (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) মতো লাইলেন্স প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ। এসব কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লাইসেন্স অথবা গাইডলাইন নিয়ে আমাদের এ সার্ভিসগুলো দিতে হয়। তবে কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের বড় অভাব আছে। আইনগুলোও অনেক জটিল। আমরা যারা স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকি তারা অনেক সময় এসব বিষয়ে বুঝতে পারি না। এটি বড় সমস্যার জায়গা। তাই এ বিষয়গুলো সংস্কার ও সহজ হওয়া প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্কার?
চিকিৎসা খাতে প্রথমেই আমলাতন্ত্র ও স্বাস্থ্যশিক্ষার সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। আমাদের দেশে অনেক মেডিকেল ও নার্সিং কলেজ আছে। কিন্তু সেখান থেকে যুগোপযোগী ও মানসম্পন্ন চিকিৎসক ও নার্স আমরা পাচ্ছি না। এছাড়া উপজেলা পর্যায়েও অনেক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু সেখানে সঠিক ব্যবস্থাপনা নেই। তাই ব্যবস্থাপনা খাতেরও সংস্কার হওয়া বিশেষ প্রয়োজন।
দেশে প্রাইভেট হাসপাতালের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এগুলোর সেবার মান ঠিক রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন?
সারা বাংলাদেশে ২০ হাজারের মতো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার রয়েছে। এসব ব্যবস্থাপনার জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি গাইডলাইন থাকা প্রয়োজন। তবে দেশে ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট উপযুক্ত কোনো গাইডলাইন নেই। এছাড়া প্রত্যেক রোগের একটি বিশেষ চিকিৎসা পদ্ধতি আছে, প্রটোকল আছে। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় তা একটি নির্দিষ্ট অথরিটি থেকে দেয়া হয়। আমাদের দেশের হেলথ মিনিস্ট্রি বা ডাইরেক্টর জেনারেল হেলথের মতো অথরিটি যদি এসব গাইডলাইন ও চিকিৎসার প্রটোকলগুলো সঠিকভাবে দিতে পারে, তাহলে সেবার মান ঠিক রাখা সম্ভব। এছাড়া এসব অথরিটির যথেষ্ট আন্তরিক ও কঠোরভাবে মনিটরিং প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। আপনারা বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এ সেবা প্রদান করে যাচ্ছেন। এজন্য সরকারের কাছে আপনাদের প্রত্যাশা কী?
স্কয়ার হাসপাতালে একজন মানুষের প্রয়োজনীয় পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হয়। এখানে জরুরি বিভাগ থেকে শুরু করে বহির্বিভাগ, ডে-কেয়ার, ইমপেশেন্ট সার্ভিস, ক্রিটিক্যাল কেয়ার ও অপারেশন রুমের মতো সব ধরনের সেবাই দেয়া হয়। সরকারের কাছে আমাদের বড় প্রত্যাশা, লাইসেন্স প্রদানে যেসব রেগুলেশনস আছে সেগুলোকে সহজ করা।
স্কয়ার হাসপাতালে বর্তমানে কী কী চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে? চিকিৎসাসেবায় এ হাসপাতালের বিশেষত্ব কী?
আমাদের হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার বড় বিশেষত্ব হলো, আমরা এক ছাদের নিচে সব ধরনের সেবা প্রদান করে থাকি। এ ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় সেন্টার অব এক্সিলেন্স। এটি জেনারেল হাসপাতাল হলেও স্পেশালিটি অনুযায়ী আলাদা সেন্টার আছে। এখানে কার্ডিয়াক সেন্টার, ক্যান্সার, ইউরোলজি ও ইমফার্টিলিটি সেন্টারের মতো মোট ২৭টি সেন্টার রয়েছে। প্রত্যেক সেন্টারে রয়েছে স্পেশালিটি অনুযায়ী হিউম্যান রিসোর্স, ইনস্ট্রুমেন্ট ইকুইপমেন্ট ও প্রয়োজনীয় টেকনোলজি। এটি আমাদের বিশেষ বিশেষত্ব।
বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি বা দুর্বলতা কী বলে মনে করেন? এ ঘাটতি দূরীকরণে আপনার পরামর্শ কী?
আমার চোখে বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি হলো রোগী ও তার স্বজনদের মধ্যে আস্থার অভাব। এ আস্থার অভাবে রোগীরা চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। তারা মনে করছে, আমাদের দেশে প্রয়োজনীয় ও মানসম্পন্ন চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। আরেকটু আন্তরিকতার সঙ্গে, যত্নসহকারে ও দায়বদ্ধতা নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিতে পারলে এ সমস্যার অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব।
আমাদের দেশে পর্যাপ্ত মানবসম্পদ, দক্ষ ও উন্নত প্রশিক্ষিত ডক্টর, ইনস্ট্রুমেন্ট, ইকুইপমেন্ট ও টেকনোলজি আছে। অন্তত ৯৯ শতাংশ মানুষের চিকিৎসা দেয়ার মতো ক্যাপাসিটি এখন আমাদের আছে। তাই আমি মনে করি, চিকিৎসাসেবা নিতে দেশের বাইরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে ১ শতাংশ অর্থাৎ অতি বিশেষায়তি সেবা যাদের প্রয়োজন তারা দেশের বাইরে যেতে পারেন।
বাইরের দেশের হাসপাতালের সঙ্গে আমাদের দেশের হাসপাতালের কী কী পার্থক্য দেখতে পান? কোন কোন জায়গায় স্বাস্থ্যসেবা আরো উন্নত করা দরকার?
আন্তর্জাতিক মান বলতে আমরা বুঝি উন্নত প্রযুক্তি, শিক্ষিত জনবল ও একটি মানদণ্ডের অধীনে চিকিৎসা দেয়া, প্রটোকল মেইনটেইন করে চিকিৎসা দেয়া। আমাদের দেশে যদি উন্নত বিশ্বের মতো সঠিক গাইডলাইন ও প্রটোকল অনুসরণ করে চিকিৎসা দেয়া যায় তাহলে আমরা আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি থাকতে পারব। এছাড়া সংস্কারের দিক বিবেচনা করলে কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে আরো কঠোর হতে হবে।





