স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে আপনারা কী কী উদ্যোগ নিয়েছেন?

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথমদিকে অধিদপ্তরগুলোয় নতুন মহাপরিচালক (ডিজি) পদায়ন করা হয়েছে। সব বিভাগ ও জেলায় যথাক্রমে বিভাগীয় পরিচালক ও সিভিল সার্জন পদায়ন সম্পন্ন হয়েছে। মেডিকেল শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি), বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (বিএমআরসি) এবং বাংলাদেশ চিকিৎসা শিক্ষা অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিল পুনর্গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি, প্রোভিসি ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেট ও খুলনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। নার্সিং কাউন্সিলে একজন রেজিস্ট্রার নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারি ৩৭টি মেডিকেল কলেজে ২৩ জন নতুন অধ্যক্ষ ও ১৭ জন উপাধ্যক্ষ পদায়ন করা হয়েছে। ১৫টি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় উচ্চতর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

চিকিৎসকদের পেশাগত মর্যাদা ও কর্মপরিবেশ উন্নয়নের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় সাত হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টি করে চিকিৎসকদের ব্যাপক পরিসরে পদোন্নতির ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসককে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, পরিচালক, জুনিয়র কনসালট্যান্ট ইত্যাদি পদে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) মাধ্যমে ৮৬টি বিষয়ে প্রায় ৮০০ চিকিৎসককে অধ্যাপক পদে পদোন্নতির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শূন্য পদে পদায়নের কার্যক্রম শেষে সুপার নিউমারারি হিসেবে আরো প্রায় ছয় হাজার চিকিৎসককে বিভিন্ন পদে পদোন্নতি দেয়া হবে। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যসেবা খাতে সংস্কারের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে করণীয় কী?

স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আমরা মন্ত্রণালয় পর্যায়ে বিভিন্ন উইং, অধিদপ্তর, দেশে-বিদেশে থাকা বিশেষজ্ঞ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা—সবার সঙ্গে আলোচনা করে একটি রোডম্যাপ তৈরি করেছি। এর আলোকে সুপারিশগুলোকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়েছে। আমাদের স্বল্পমেয়াদি রোডম্যাপ অনুযায়ী সুপারিশ বাস্তবায়নে কার্যক্রম চলছে। সেগুলোর মধ্যে অনেক কিছুই দৃশ্যমান হয়েছে। আগামী দুই-এক মাসের মধ্যে তা আরো দৃশ্যমান হবে।

দেশের স্বাস্থ্য খাতের মূল প্রতিবন্ধকতাগুলো কী কী?

আমাদের উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয় রোগীর চাপ অনেক। সেখানে মেঝেতে বা এক বিছানায় দুজন করে—নানাভাবে রোগীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। এগুলোকে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বলা যায় না। এদিক থেকে আমরা অনেক পিছিয়ে। আবার প্রতি রোগীর বিপরীতে একটি শয্যা নিশ্চিত করতে হলে ১৫ হাজার নতুন শয্যা তৈরি করতে হবে। এজন্য নতুন অবকাঠামো, লোকবল, যন্ত্রপাতি, ডাক্তার-নার্স ইত্যাদি প্রয়োজন। এ মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসকের ঘাটতি আছে ১২ হাজার। সবাইকে শয্যা দিতে গেলে এ সমস্যার সমাধান তো হবেই না, বরং চিকিৎসক ও নার্সসহ নানা জায়গার জনবল সংকট আরো তীব্র হবে। এগুলো বড় প্রতিবন্ধকতা। সার্বিকভাবে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আমরা এসব সংকট নিরসনের চেষ্টা করছি।

এর বাইরে আরো অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। দেশের স্বাস্থ্য খাতকে এগিয়ে নিতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছারও প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে সে জায়গা কোথায়? আন্দোলনের সময় দল-মত নির্বিশেষে সবাই এক হয়েছিল। সেখান থেকে যে স্বপ্ন দেখা উচিত ছিল, তা কোন জায়গায় রয়েছে? সেটি কি ওই উচ্চতায় আছে নাকি মাটিতে নেমে এসেছে? কেন নামল এ প্রশ্ন তোলা উচিত।

অনেক কিছু চাইলেই করা যায় না। শুধু যে টাকা-পয়সা নেই, সেজন্য না। কোনো জিনিস মেরামত করতে গেলে সেখানে দাগ থেকে যায়। কিন্তু নতুন কোনো কিছু করতে গেলে সেটি সুন্দরভাবে করা যায়। মেরামত করতে সময় লাগে। আবার তার মধ্যে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে। কারণ সবকিছু পরিবর্তন করা যায় না। সেখানে অনেক কিছুই থেকে যায়। নতুন করে কোনো কিছু করা গেলে সেটি ভিন্ন জিনিস।

চীন সরকারের সহায়তায় আমরা রংপুরে একটি হাজার বেডের হাসপাতাল করার কথা বলেছি। সেই জায়গা আমরা দেখে এসেছি। এখন এ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে যে পরের সরকার এটিকে ওই জায়গায়ই রাখবে? নাকি অন্যত্র নিয়ে যাবে? এ উত্তর আমি দিতে পারব না। এটিও অগ্রগতির প্রতিবন্ধকতা।

আমলাতন্ত্রের কচ্ছপগতি না অন্য কিছু আমি জানি না। এটা কিছু দীর্ঘদিনের অভ্যাস বা কিছুটা ফলোআপ না করার অভ্যাসের ফল। একটি কাজ দেয়ার পর সেটি না চাইলে কাগজ আসবে না—এখানে এভাবেই সিস্টেম চলে। আবার ব্রাহ্মণ-শূদ্র—এমন প্রথাও রয়েছে। কারণ কে কাকে ফোন করতে পারবে, কাকে পারবে না—এ ধরনের বিষয়গুলো কাজ আটকে দেয়। আমার মনে হয় এসব সিস্টেম ভাঙা উচিত। নতুন করে কিছু করা উচিত। আমলাতন্ত্রে যোগাযোগসংক্রান্ত যে সমস্যা, সেটিও যথেষ্ট বড়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিকিৎসক সংকট এবং অন্যান্য সমস্যা সমাধানে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?

চিকিৎসক সংকট নিরসনে আমরা শুরু থেকেই কাজ করছি। কাজ করতে গিয়ে জানতে পারলাম যে একটি বিসিএসের মাধ্যমে ডাক্তার নিয়োগ দিতে প্রায় তিন বছরের মতো সময় লেগে যায়। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলাপের পর এ নিয়ে তিনি একটি কমিটি করে দেন এবং নির্দেশনা দেন যে অতিদ্রুত সংকট নিরসন করতে হবে। তার পরও ডাক্তার নিয়োগ কার্যক্রমে প্রায় সাত মাস সময় লেগে যাচ্ছে। আমরা স্পেশাল বিসিএসের মাধ্যমে লোক নিচ্ছি। আশা করি তারা অক্টোবরে কাজে যোগ দিতে পারবে। তাদের পরীক্ষা হয়ে গেছে। এ মন্ত্রণালয়ের ইতিহাসে এত ত্বরিৎ গতিতে নিয়োগ কার্যক্রম হয়নি।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায়ও গলদ রয়েছে। গুণগত মানের কথা যদি চিন্তা করি তাহলে চিকিৎসক তৈরির জায়গাগুলো কি ঠিক আছে? দেশে ৩৭টি সরকারি ও ৬৭টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে। বেসরকারির হিসাব বাদ দিলাম। গুণগত মান বিবেচনা করলে সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোরও অবস্থা বেশ খারাপ। আমরা বেশ কিছুদিন ধরে এগুলোকে একীভূত করার কথা বলছি। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতার জন্য আমরা তা করতে পারছি না। তবে আমরা সমাধানের চেষ্টা করছি।

আমরা জরিপের ভিত্তিতে নানা সমস্যা চিহ্নিত করেছি। এখন এগুলোকে একটা মাপকাঠির মধ্যে নিয়ে আসছি। বেঞ্চমার্ক হিসেবে কোন হাসপাতাল কত নম্বর পাচ্ছে, সেটা দেখা হচ্ছে। কাজেই এখন আমরা বসে ঠিক করব যে কত নম্বর হলে পাস ধরব আর কত নম্বর হলে ফেল।

অনেক জায়গায় অ্যানাটমির শিক্ষক নেই। মৌলিক আটটি বিষয়ে শিক্ষকের সংকট রয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণের জন্য যেসব যন্ত্রপাতি থাকার কথা, সেগুলো নেই। প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও জায়গা নেই। এত এত ‘নেই’-এর মধ্য দিয়ে মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করা যায়? মানসম্মত চিকিৎসক তৈরি করতে না পারলে ভবিষ্যতের জন্য ১৫ হাজার শয্যা কীভাবে সৃষ্টি করব? এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। আমরা মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি।

আমি আমাদের চিকিৎসকদের দোষ দিই না। তারা অনেক কষ্ট ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পড়াশোনা করেন। কভিডের সময় আমাদের ডাক্তার-নার্সরা জানপ্রাণ দিয়ে খেটেছেন। অনেকে মারাও গেছেন। মাইলস্টোনের ঘটনায় ও জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসায় ডাক্তাররা প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। আমরা তাদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে চিকিৎসক নিয়ে এসে এখানে চিকিৎসাসেবাও দিচ্ছি।

অনেক দেশ স্বাস্থ্য খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। আর বাংলাদেশ থেকে অনেকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়, যা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। দেশের স্বাস্থ্য খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এবং বিদেশী রোগীদের আকৃষ্ট করতে আপনাদের কী ধরনের পদক্ষেপ রয়েছে?

আমাদের চিকিৎসাসেবা নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে, সেটি অস্বীকারের উপায় নেই। আমরা এটি কাটানোর চেষ্টা করছি। এজন্য সরকার বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশ, নীতি ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে বা করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর খসড়া উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদনের পর আইন মন্ত্রণালয়ে ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে। এটি শিগগিরই অধ্যাদেশে পরিণত হবে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী নতুন স্বাস্থ্য সুরক্ষা আইন প্রণয়নের কাজও চলমান রয়েছে। বর্তমানে চীনের অনুদানে রংপুর বিভাগে এক হাজার শয্যার হাসপাতাল, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রামে ৫০০-৭০০ শয্যার বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রকল্প প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এডিবির অর্থায়নে স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটালাইজেশনের একটি প্রকল্প অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের সম্ভাব্য অর্থায়নে ওয়ান হেলথ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাণী থেকে মানবদেহে ছড়ানো রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হবে।

এরই মধ্যে হৃদরোগের চিকিৎসায় স্টেন্টের দাম সর্বোচ্চ ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে। স্টেন্টের ক্ষেত্রে সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৫ শতাংশ অতিরিক্ত অর্থ যেন গ্রহণ করা না হয় সে বিষয়টি মনিটরিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ক্যান্সার নিরোধক ওষুধ প্রস্তুতের জন্য আমদানীকৃত পণ্যের ওপর আরোপিত উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রস্তাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেশে সব ই-সিগারেট সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।

পাশাপাশি আমাদের চিকিৎসাসেবাকে নথিভুক্ত করার চেষ্টা করছি। আমাদের দেশে এটি নেই। নথিভুক্ত করা গেলে কোথা থেকে কোন রোগী আসছে, সেগুলো খুব সহজেই শনাক্ত করা যাবে। এছাড়া প্রাইমারি কেয়ার ফিজিশিয়ান নিয়োগের কথাও ভাবা হচ্ছে। এ দুই ব্যবস্থা আমরা চালু করব। এটি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এটি করা গেলে সেবার মান বাড়বে এবং দেশের স্বাস্থ্যসেবায় আস্থার ঘাটতির চিত্রটায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।