অন্তর্বর্তী সরকার বড় আকারের অর্থনৈতিক সংস্কারকাজ হাতে নিয়েছিল। এক বছর শেষে কোন কোন জায়গায় সাফল্য দেখছেন আর কোন কোন জায়গায় আরো কাজ করা যেত?

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান সাফল্য হলো তারা একটি সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি (monetary policy) প্রয়োগের মাধ্যমে ডলারের বিপরীতে টাকার মান ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে।

কিন্তু ব্যর্থতা হলো সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পরিণামে অর্থনীতিতে যে সংকোচন হয়েছে, কর্মসংস্থান কমে এসেছে এবং প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ঘরে নেমে গেছে, সেটি পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতোই বিবিএসের প্রশ্নবিদ্ধ ডাটার আড়ালে লুকিয়ে রাখা হয়েছে। সংকোচনমূলক আর্থিক নীতির পরিণতিতে অর্থনৈতিক সংকোচন হওয়াই স্বাভাবিক, কিন্তু বিবিএসের ডাটার কারণে সে বাস্তবতা সামনে আসেনি। ফলে অর্থনীতিতে যে ধস নেমেছে, তা আমরা বিভিন্ন সেকেন্ডারি সূত্র থেকে জানতে পেরেছি।

সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো মূল্যস্ফীতির তথ্য বিভ্রান্তি। ২০২৫ পঞ্জিকা বর্ষের শুরু থেকেই খাদ্যপণ্যের দাম বিস্ময়করভাবে কমে এলেও মূল্যস্ফীতির তথ্যে তা প্রতিফলিত হয়নি। ফলে মূল্যস্ফীতি বাস্তবে কমে এলেও বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ নীতি সুদহার (policy rate) ধরে রেখেছে।

অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমানের উদ্ভাবিত বিগ ম্যাক ইনডেক্সের অনুকূলে, খিচুড়ি ইনডেক্স নামের একটি পরিসংখ্যান অনুসারে, আগস্ট ২০২৫ নাগাদ বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ঋণাত্মক ১০ শতাংশ। সাধারণ মানুষের বাজারের অভিজ্ঞতাও তাই বলে। কিন্তু বিবিএসের পরিসংখ্যানে এ মূল্যস্ফীতির পতন দেখা যায়নি। যদিও বিবিএস ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, যা গত ২৫ বছরের সর্বনিম্ন, কিন্তু এ পরিসংখ্যানও প্রশ্নবিদ্ধ। এনবিআর ও বিভিন্ন সংস্থার ডাটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিমাণগত দিক থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে—

ডিজেলের আমদানি কমেছে ২০ শতাংশ, ফার্নেস অয়েলের আমদানি কমেছে ১০ শতাংশ, ক্লিংকার আমদানি কমেছে ১ লাখ ৩৯ হাজার টন, বিটুমিন আমদানি কমেছে ২২ শতাংশ, পাথর আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ, মৌলিক শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ, কম্পিউটার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির আমদানি কমেছে ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ, অন্যদিকে রফতানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ১৮ দশমিক ৬২ শতাংশ বাড়ায় শিল্পের মোট কাঁচামাল আমদানিতে ৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু স্থানীয় উৎপাদন কমেছে তা নিশ্চিত। এসব তথ্য উৎপাদনের একটি সার্বিক সংকোচনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

উৎপাদন হ্রাসের অর্থ ভোগ কম হয়েছে। যেহেতু জিডিপির বড় অংশই ভোগ থেকে আসে, ফলে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকাশিত বিবিএসের ৪ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানটিও প্রশ্নবিদ্ধ।

প্রবৃদ্ধির হার কমে আসার অর্থ কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়া। ২০২৫ পঞ্জিকাবর্ষের টানা সাত মাস বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশের নিচে, যার অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে না। যার প্রভাব পড়বে নতুন কর্মসংস্থানে।

কিছুদিন আগে চিরকুটে অভাবের কথা লিখে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েকে হত্যার পর এক যুবক আত্মহত্যা করেছেন। মানসম্মত কর্মসংস্থান না থাকলেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে।

ফলে প্রশ্ন ওঠে বিবিএসের সংস্কার ছাড়া, তাদের ডাটার ওপর নির্ভর করে নেয়া অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষ, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা সম্পর্কে নীতিনির্ধারকরা ভুল নির্দেশনা পাচ্ছেন কিনা।

এ পরিস্থিতিতে প্রশ্নবিদ্ধ মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির ডাটার ওপর ভিত্তি করে উচ্চ নীতি সুদহার ধরে রাখা যৌক্তিক কিনা তা নিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্রমাগত প্রশ্ন করে গিয়েছেন, কিন্তু আইভরি টাওয়ারের এসি রুমে বসে থাকা পলিসি মেকাররা সে তাকে পাত্তা দেয়নি।

বলার অপেক্ষা রাখে না নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই এ নীতি সুদের উচ্চহার অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান ও মূল্যস্ফীতিতে এ নীতির প্রত্যাশিত নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হলেও প্রশ্নবিদ্ধ বিবিএস ডাটার ওপর দাঁড়িয়ে উচ্চ নীতি সুদহার ধরে রাখার ফলে রিজার্ভ বা বিনিময় হারের হেডলাইন ডাটাকে টার্গেটে ধরে রাখতে, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির গলা চেপে ধরে রাখা হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন এখন যৌক্তিকভাবে উঠছে।

ফ্যাসিবাদী সরকারের আর্থিক পরিসংখ্যানের দখলদারি অব্যাহত রেখে বিবিএসের সংস্কার না করায় এ বিভ্রান্তি টিকে আছে, যা সরকারের প্রাথমিক ম্যাক্রো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের সাফল্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কী ধরনের সংস্কারের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল? গত এক বছরে তার কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

সংস্কারের দিক থেকে সরকারের কোনো কমিটমেন্ট দেখা যায়নি। প্রফেসর দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি এবং বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক কেএএস মুরশিদের নেতৃত্বাধীন টাস্কফোর্সের প্রতিবেদন যথাক্রমে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর ও ২০২৫ সালের মার্চে প্রকাশিত হয়েছে।

এ রিপোর্টগুলোর আলোকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কোনো ধরনের নতুন প্রকল্প, নতুন নীতি বা কোনো মন্ত্রণালয়ে নতুন কোনো উদ্যোগের খবর আমরা জানতে পারিনি।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আর্থিক খাতের তিনটি প্রধান দায়িত্ব ছিল— ভর্তুকি ও অপচয়ের মাধ্যমে সরকারের ওপরে দায় সৃষ্টি করা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক হিসেবে ফরেনসিক করা, কুইক রেন্টাল ও ক্যাপাসিটি চার্জের দায়ে ভেঙে পড়া বিদ্যুৎ খাতের অসম চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন করা, চরম দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা অথবা প্রয়োজনে অবসায়ন করা।

এ তিনটি কাজ জরুরি ভিত্তিতে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে সম্পন্ন করা প্রয়োজন ছিল। কারণ রাষ্ট্রীয় বাজেটে সবচেয়ে বড় চাপ এবং আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এসেছে এ তিন খাত থেকেই। এজন্য প্রয়োজন ছিল বেদনাদায়ক হলেও সাহসী নীতি প্রণয়ন।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নির্বাচিত হওয়ার দায় ছিল না। ফলে তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল এ সাহসী উদ্যোগগুলো নেয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এ তিন খাতেই শুধু টুকরো-টাকরা কিছু উদ্যোগের কথা শোনা গেছে। সরকারের বয়স ১৮ মাস হয়ে যাওয়ার পরেও সে উদ্যোগগুলো কোনো পরিণতির দিকে যায়নি, যেখানে উন্নয়ন অর্থনীতির একাধিক তত্ত্ব ও প্রচুর এভিডেন্স রয়েছে যে এ ধরনের একটি সংকটের পর রÅvডিক্যাল রিফর্মের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু সরকার সে সুযোগ নেয়নি।

এ তিন খাতে সংস্কারের ব্যর্থতা আগামী সরকারকে ভোগাবে। সংস্কারের এ নাটকীয় সুযোগের অপচয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

সরকারের গৃহীত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অর্থনৈতিক সংস্কার কী কী বলে আপনি মনে করেন?

১। মুদ্রামানের স্থিতিশীলতা ফেরত আনা।

২। রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ফেরত আনা।

৩। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ।

অবৈধ অর্থ পাচার (capital flight) এবং কালো টাকার অর্থনীতি দেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ সমস্যা সমাধানে কি কোনো সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ দেখা গেছে?

বাংলাদেশে টাকা পাচার হয় মূলত আমদানিতে ওভার ইনভয়েস করে। এ টাকা ফেরত আনা খুবই কঠিন, কারণ অর্থটি বৈধ উপায়ে দেশের বাইরে যায়। যে দেশগুলোয় অর্থ পাচার হয়, সে দেশগুলোয় অর্থ পাচারবান্ধব নীতি রয়েছে বলেই সেখানে এ প্রক্রিয়া ঘটে। অর্থাৎ এ দেশগুলো চাইলে সহজে পাচারের টাকা ফেরত দেবে না।

ফলে পাচার হওয়া দেশ যদি তাদের প্রাপ্ত অর্থকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত না করে, তবে সে টাকা ফেরত আনা অত্যন্ত দুরূহ। দুরূহ হলেও প্রথম কাজ হলো পাচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশে চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া। এখন পর্যন্ত ছাড়া ছাড়া কিছু পরিসংখ্যান শুনেছি, কিন্তু পাচারকারী প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কোনো উদ্যোগ এখন পর্যন্ত নেয়া হয়নি।

ফলে আমি আশাবাদী নই।

অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশের তরুণ সমাজ বা নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা কী হতে পারে?

তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে প্রথমে অর্থনীতি বোঝা শুরু করতে হবে। বাংলাদেশের তরুণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাজনৈতিক অর্থনীতি ও অর্থনীতিকে বুঝে জনগণের আর্থিক ভাগ্য পরিবর্তনের পলিসিগুলোকে টার্গেট করার পরিবর্তে ঢাকাকেন্দ্রিক অভিজাতদের রাষ্ট্র চিন্তায় প্রভাবিত হয়ে ভুল ধরনের নীতি ও পলিসিকে প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে দেখছে। ফলে তারা কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে আর্থিক কর্মকাণ্ডসংলগ্ন বাস্তব সংযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

তরুণ রাজনীতিবিদদের উচিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক নীতি ও তার পরিণতি বোঝা শুরু করা। নইলে তারা ভুল ইস্যুর ওপরে দাঁড়িয়ে নিজেরাও বিভ্রান্ত হবে এবং তাদের অনুসারীদেরও বিভ্রান্ত করবে।

বিনিয়োগ আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে করণীয় কী?

প্রথম শর্ত হলো সামাজিক সংহতি প্রতিষ্ঠা করা। সামাজিক সংহতি ছাড়া বৈদেশিক বিনিয়োগ আসবে না। ফ্যাসিবাদের পতনের পর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে আমরা সামাজিক সংহতির জায়গায় আরো বেশি বিভক্ত হয়ে গেছি। শেখ হাসিনা ক্ষমতা দখলের জন্য যেভাবে ডিভাইড অ্যান্ড রুল কৌশল ব্যবহার করেছেন, তার ধারাবাহিকতায় দেশী-বিদেশী নানা শক্তি সমাজকে বিভাজন করছে, আমাদের অন্তর্গত দ্বন্দ্বগুলোকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যেই পরিবেশ নষ্ট করছে। ফলে সমাজের বিভিন্ন অংশ ক্রমাগত একে অন্যের প্রতি অসহনশীল হচ্ছে, দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ও আইনশৃঙ্খলা নাজুক হয়েছে। এ ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিমগ্ন রাষ্ট্রে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসে না।

এ সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ২০ শতাংশ ট্যারিফ নিয়ে সফলভাবে নেগোসিয়েট করা। এ আলোচনার সাফল্যের ফলে চায়না প্লাস ওয়ান নীতির কারণে বাংলাদেশে ব্যাপক বৈদেশিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমরা যদি সামাজিকভাবে সংহত থাকতে না পারি, তবে বিদেশী বা দেশীয় কোনো বিনিয়োগই আসবে না।