অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেয়ার এক বছর পেরিয়েছে। কোন কোন জায়গায় সাফল্য দেখছেন এবং কোথায় আরো কাজ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন?

গণ-অভ্যুত্থান ও গণজাগরণের মাধ্যমে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্ব নিয়েছে। সে সময় দেশ গভীর বিশৃঙ্খলার মধ্যে ছিল। সরকার সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি কাটিয়ে দেশকে শৃঙ্খলার পথে ফেরানোর চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু এখানে সবাই তো বঞ্চিত। বঞ্চিতের যে রূপ, জোর দাবিগুলো রয়েছে সেগুলো শ্রেণীবদ্ধ করে আনা সহজ কাজ না। এছাড়া অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং পুলিশ ও প্রশাসনিক সংকটও রয়েছে। আবার বিগত পতিত সরকারের দীর্ঘ ১৬ বছরের যে শাসন কাঠামো তৈরি হয়েছে সেটিও রাতারাতি বদলানো সম্ভব না। এগুলো সহিষ্ণুতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। কিন্তু তেমন কিছুও আমরা পাচ্ছি না।

সাফল্যের কথায় যদি আসি, বর্তমান সরকারের প্রথম বড় সাফল্য হলো বৈদেশিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক অগ্রগতি। এক বছরের মধ্যে দেশের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ও ক্যাপিটাল অ্যাকাউন্ট পরিস্থিতির উন্নয়ন হয়েছে। রফতানি ও রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রেখেছেন। বলা যায়, তারা দেশের প্রকৃত যোদ্ধা। রেমিট্যান্স প্রবাহ সরকারের জন্য স্বস্তি এনেছে। অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও বেড়ে বর্তমানে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। এখন সরকার ডলার কিনতে পারছে, মানি মার্কেট সচল হয়েছে এবং আগের মতো এলসি খোলার সংকটও আর নেই।

অন্তর্বর্তী সরকারের আরেকটি নীরব সাফল্য এসেছে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ থেকে। যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে শুল্ক ২০ শতাংশ নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে কৃষিপণ্যসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে ব্যবসায়ী শ্রেণীকেও দক্ষতা ও মানোন্নয়নে মনোযোগী হতে হবে। মনে রাখা দরকার—বিশ্বের মোট ১০৬টি গ্রিন ফ্যাক্টরির মধ্যে ১০২টিই বাংলাদেশে। এটি আমাদের একটি বড় অর্জন। কিন্তু এ অর্জনের সঠিক অর্থনৈতিক প্রতিফলন আমরা এখনো পুরোপুরি পাইনি।

অর্থনীতির একটি বড় ক্ষেত্র হলো ব্যাংক খাত। এরই মধ্যে এ খাতে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোকে গতিশীল করার প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। তবে এ সমস্যা এক-দুই বছরে সমাধান হবে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। কিন্তু পুঁজিবাজারে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশ ব্যাংক-ভিত্তিক অর্থনীতির দেশ হওয়ায় পুঁজিবাজার স্বাভাবিকভাবেই ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল। আশা করা যায়, ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা এলে ধীরে ধীরে ক্যাপিটাল মার্কেটও সক্রিয় হয়ে উঠবে। এর বাইরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ সংস্কার বড় চ্যালেঞ্জ। প্রায় এক লাখ নতুন জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে একটি ডিসিপ্লিন ফোর্সকে দক্ষ ও সেবামুখী বাহিনীতে রূপান্তর করা সহজ কাজ নয়। এক্ষেত্রে বিলম্ব যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেবল সরকারি নীতি দিয়ে অর্জন সম্ভব নয়। এর জন্য রাজনৈতিক ঐকমত্য অত্যন্ত জরুরি। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে জাতীয় স্বার্থে সবার সহযোগিতা ও সমন্বয় প্রয়োজন।

বিদ্যমান বিভিন্ন সংকটের পেছনে বিগত সরকার আমলে তৈরি অলিগার্ক শ্রেণীর বিশেষ দায় ছিল। এ শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কেমন পলিসি গ্রহণ করা উচিত?

মানুষের মানসিকতা অতি সহজে পরিবর্তন হয় না। কিন্তু কিছুটা হলেও আশা ছিল যে গণ-অভ্যুত্থানের মতো এত বড় একটা ঘটনা ঘটার পরও অলিগার্করা মনে করছে না যে তাদের দায় আছে। তাই তারা আবার ফিরে আসতে পারে। তাদেরকে যদি বিচার ও শাস্তির আওতায় আনা যায় তাহলে অন্যদের জন্য এটা উদাহরণ হতে পারে। এর মাধ্যমে অন্যদের সতর্ক করা যাবে। তাই এটা অবশ্যই করতে হবে। এমন ধরনের নীতি তৈরি করতে হবে যার ব্যত্যয় ঘটলে তাদেরকে সেই নীতির আওতায় এনে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, দেশকে রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু এটা করা কঠিন হবে।

ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের জন্য অনেক কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। এগুলো আগামীতে কতটা ফলপ্রসূ হবে বলে মনে করছেন বা এজন্য আর কী কী উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্নর চেষ্টা করছেন ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য। কিন্তু বাস্তবতা হলো সমস্ত অনিয়ম-দুর্নীতি সম্পর্কে অবগত থাকার পরও পুরনো কাঠামোর ভেতর দিয়েই তাকে এগোতে হচ্ছে। এক অর্থে এটি ভারসাম্য রক্ষার লড়াই।

সংস্কার কার্যক্রম চারটি বড় খাতকে কেন্দ্র করে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা, দুর্বল ও তলানিতে নেমে যাওয়া ব্যাংকগুলোর সংস্কার, ব্যাংকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ধসে পড়া ব্যাংকগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এ সংস্কার রাতারাতি বা এক-দুই বছরের মধ্যে ফল দেবে না। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আনে, অথচ হাজার কোটি টাকার ঋণ বেনামি হিসেবে বিতরণ হয়ে গেছে। ফলে আমানতকারীরা তাদের টাকা তুলে নিচ্ছেন, আর ব্যাংক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থায় বিদেশী তহবিল (ফরেন ফান্ড) আনতে পারলে হয়তো তিন থেকে চার বছরের মধ্যে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু অল্প সময়ে এর সমাধান সম্ভব নয়।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয়ও একের পর এক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সোনালী ব্যাংকের শেরাটন শাখায় বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারি কিংবা জনতা ব্যাংক থেকে অস্বাভাবিক ঋণ বিতরণ। অনেক ক্ষেত্রে রাতারাতি ব্যাংকের মালিকানা বদল হয়ে গেছে। এসব অনিয়মের পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও দায় রয়েছে।

তবে ইতিবাচক দিক হলো ব্যাংক গভর্ন্যান্স সংস্কারে কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, যা তুলনামূলক দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব। যেমন ব্যাংক বোর্ডে ৫০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের উদ্যোগ। বর্তমানে ভুটানে ব্যাংকের চেয়ারম্যান মালিকপক্ষ থেকে আনা হয় না; স্বাধীন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে স্বাধীন পরিচালক ও স্বাধীন চেয়ারম্যান অত্যন্ত জরুরি। সর্বোপরি ব্যাংক ব্যবস্থাপনা জবাবদিহির আওতায় দরকার।

গত জুনে দেখা গেছে ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এটি ব্যাংক খাতে নিয়মকানুন ও নজরদারির দুর্বলতার সরাসরি ফল। তাই শুধু স্বাধীন পরিচালক নিয়োগই নয়, বরং পরীক্ষার মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক একটি ডাটাবেজ (পুল) থেকে পরিচালক নিয়োগ করতে হবে। যে কেউ পরিচালক হতে পারবে না; বরং যোগ্যতা যাচাই করেই নির্বাচন করতে হবে।

বর্তমানে বেসরকারি খাত বেশ চাপের মুখে রয়েছে। ঋণ ও বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি খাতে ব্যবসা বিনিয়োগ সম্প্রসারণে সরকারের জন্য কী সুপারিশ দেবেন?

বিনিয়োগ আনতে হলে আগে মূল্যস্ফীতির হার কমানো জরুরি। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার ৮ শতাংশের ঘরে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতি সুদহার বাড়ানো হয়েছে। ফলে ব্যবসা ব্যয় বেড়েছে। মূল্যস্ফীতি ৫-৬ শতাংশের মধ্যে নেমে এলে সুদহারও কমে আসবে। তখন ব্যবসা শ্রেণী সুযোগ পাবে।