বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এ সংস্কারের প্রস্তাবগুলো নতুন ধরনের দায়বদ্ধতার জন্ম দিয়েছে। কারণ এগুলো ভবিষ্যতে একটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের রোডম্যাপ হয়ে উঠতে পারে, যা দেশে পুনরায় কোনো স্বৈরাচারী শাসনের উত্থান প্রতিরোধে সহায়ক হবে।

চব্বিশের গণ-অভুত্থান পরবর্তী সময়ে গঠিত স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশন এ লক্ষ্য সামনে রেখে ১৪টি খাতে শতাধিক সুপারিশ প্রদান করেছে। এসব সুপারিশের মধ্যে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, আর্থিক স্বচ্ছতা, উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয় এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি কিছু সুপারিশ কাঠামোগত সংস্কারের দিকেও ইঙ্গিত করে, যা বাস্তবায়ন হলে স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা বাড়াতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের কিছু সুপারিশ দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও ঝুঁকিপূর্ণ দুটি প্রস্তাব হলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সংসদীয় পদ্ধতির প্রবর্তন এবং চেয়ারম্যান ও মেয়রকে সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, বরং পরিষদের সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত করার ব্যবস্থা চালু করা। প্রথম দর্শনে এ প্রস্তাবগুলোকে প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির উপায় হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু গভীর বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি।

এ প্রস্তাব সরাসরি ১৯৬০-এর দশকের জেনারেল আইয়ুব খানের কথিত ‘‌বেসিক ডেমোক্রেসি’ মডেলের অনুকরণে তৈরি, যা ইতিহাসে জনবিচ্ছিন্ন এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। সে সময় এ মডেলকে অনেকেই প্রহসনমূলক বলেছিলেন, কারণ এতে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ এবং জবাবদিহিতা প্রায় অনুপস্থিত ছিল। প্রশ্ন থেকে যায় যে ব্যবস্থা অতীতে জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করেছিল, সেটি কি আজকের দিনে পুনরায় প্রবর্তন করা যুক্তিসংগত হবে?

প্রস্তাব অনুযায়ী, স্থানীয় সরকারের দুটি প্রধান অংশ—বিধানিক অংশ ও নির্বাহী অংশ—কোনোটিই সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবে না। তারা নির্বাচিত হবে পরিষদের সদস্যদের ভোটে, ফলে তাদের জবাবদিহিতা থাকবে কেবল ওই সদস্যদের কাছে, জনগণের কাছে নয়। এ কাঠামোয় জনগণের স্বার্থের বদলে পরিষদ সদস্যদের ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত বা দলীয় স্বার্থ অগ্রাধিকার পাবে, যা স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করতে পারে।

স্থানীয় সরকার সাধারণত ছোট একটি প্রশাসনিক পরিসরে পরিচালিত হয়। কিন্তু এ প্রস্তাবে একই এলাকায় অনেকগুলো ক্ষমতাধর পদ তৈরি করা হয়েছে—চেয়ারম্যান, প্যানেল চেয়ারম্যান, স্পিকার ও নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা। এতজন ক্ষমতাধারী থাকলে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বিভাজন ও সংঘাতের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। উপরন্তু, কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ সীমিত করে কেবল দুর্নীতি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ রাখার ফলে স্বজনপ্রীতি, দায়িত্বে অবহেলা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়ে কোনো কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যাবে না।

এতে স্থানীয় সরকারে দলীয়করণ আরো গভীর হবে। চেয়ারম্যান ও মেয়র যেহেতু পরিষদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হবেন, তাই যে দল পরিষদে বেশি সদস্য পাবে, সে দল নির্বাহী নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণ করবে। ফলে সদস্য নির্বাচন আরো বেশি দলীয় প্রভাবে পরিচালিত হবে এবং বিরোধী দলের জন্য ক্ষমতায় আসা কঠিন হয়ে পড়বে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সরকার একটি জনগণের প্রতিষ্ঠান থেকে সরে গিয়ে দলীয় আধিপত্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হবে।

চেয়ারম্যান বা মেয়র নির্বাচিত হবেন যেসব সদস্যের ভোটে, কার্যত সেই একই সদস্যদের ওপর নির্ভর করেই উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে মতপার্থক্য দেখা দিলে কাজ স্থবির হয়ে পড়তে পারে। একই পরিষদে ক্ষমতার একাধিক কেন্দ্র থাকায় অবিশ্বাস, সংঘাত ও অচলাবস্থা সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে।

স্থানীয় সরকার হলো জনগণের সবচেয়ে কাছের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্তর, যেখানে জনগণ সরাসরি তাদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে যুক্ত থাকে। যদি সে স্তরে জনগণের ভোটাধিকার সীমিত করে কেবল সদস্যদের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্ধারণ করা হয়, তবে স্থানীয় সরকার জনগণের কাছে দায়বদ্ধ না থেকে একটি বন্ধ দরজার ভেতরের ক্ষমতার খেলায় পরিণত হবে। ইতিহাসের শিক্ষা স্পষ্ট—আইয়ুব খানের মডেল গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেনি, বরং দুর্বল করেছে। তাই ২০২৪ ও পরবর্তী সময়ে সংস্কার করতে চাইলে জনগণের সরাসরি ভোটাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে কেন্দ্র করেই পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, না হলে আমরা কেবল অতীতের প্রহসনের নতুন সংস্করণ দেখতে পাব।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি পরিষদের এক-তৃতীয়াংশ ওয়ার্ড নারীদের জন্য ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সংরক্ষিত থাকবে এবং সরাসরি ভোটে একজন নারী কেবল একটি ওয়ার্ডের প্রতিনিধিত্ব করবেন। এতে তাদের কার্যপরিধি ছোট হবে, ফলে জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান ও উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা সহজ হবে। সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নারীর নেতৃত্ব বিকাশ, জবাবদিহিতা বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অবস্থানও শক্তিশালী হবে।

তবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতির একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো এতে নারীদের স্থায়ী নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ কমে যাবে। উদাহরণস্বরূপ, একজন নারী একবার কোনো আসন থেকে নির্বাচিত হলে পরবর্তী ১৫ বছর পর্যন্ত তিনি সে আসনে প্রার্থী হতে পারবেন না। ফলে দীর্ঘ সময় তার নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এতে আগের পুরুষ চেয়ারম্যান, মেম্বার বা মেয়রদের নিকটাত্মীয়রা ওই সংরক্ষিত আসনে প্রার্থী হতে পারেন, যাতে পরবর্তী সময়ে ওই আসন পুনরায় পুরুষ প্রার্থীর দখলে ফিরিয়ে আনা যায়। এভাবে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতি তার মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে পুরুষ-প্রাধান্যকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এ সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা যে তারা মোট আসনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশে নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেবেন। এটি নিশ্চিত হলে নারীরা কেবল পুরুষ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল না থেকে নিজেদের যোগ্যতা ও সক্ষমতার ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন, যা প্রকৃত অর্থে নারী নেতৃত্বের বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে।

স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রস্তাব হলো যদি চেয়ারম্যান বা মেয়র কোনো গোপনীয় পরামর্শ সভা করতে চান, তবে তারা সে সভা আয়োজন করতে পারবেন এবং সেখানে জনগণের প্রবেশাধিকার সীমিত করা যাবে। সাধারণভাবে অনুমতিসাপেক্ষে পর্যবেক্ষক হিসেবে জনগণের উপস্থিতি রাখা যেতে পারে, তবে তা সম্পূর্ণভাবে তাদের বিবেচনার ওপর নির্ভর করবে।

এখানে দুটি বড় সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, এ চেয়ারম্যান ও মেয়র সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। দ্বিতীয়ত, যদি তাদের অবাধে গোপন বৈঠক আয়োজন এবং গোপন এজেন্ডা নির্ধারণের সুযোগ দেয়া হয়, যেখানে কোনো সীমাবদ্ধতা, কাঠামোগত নিয়ন্ত্রণ বা বাহ্যিক পর্যবেক্ষণ থাকবে না, তবে তা জনগণের কাছে জবাবদিহিতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। এতে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বচ্ছতা ও জনগণের স্বার্থরক্ষার প্রশ্নে গুরুতর সন্দেহ তৈরি হবে। জনগণের প্রকৃত কল্যাণ কতটা এমন গোপন বৈঠকের মাধ্যমে সাধিত হবে, তা নিয়েও যৌক্তিক প্রশ্ন থেকে যাবে।

পাশাপাশি কমিশনের অনেক সুপারিশে বলা হয়েছে যে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি পরে নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু সেসব আইন বা বিধির সুনির্দিষ্ট কাঠামো প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো এমনভাবে নির্ধারণ হতে পারে, যা জনগণের স্বার্থ বা গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

তবে কমিশন কিছু ইতিবাচক প্রস্তাবও দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম নির্বাচন কমিশন যেন সরকারের অনুমতির অপেক্ষা না করে স্বাধীনভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজেট কাঠামোর অংশ হিসেবে নিয়মিত আর্থিক বরাদ্দ দেয়া হবে, যা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান নয়। ফলে স্থানীয় সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্ষম হবে। কিন্তু এখানে সতর্কতা প্রয়োজন—যদি স্থানীয় সরকারকে অবাধে কর আরোপ ও বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের ক্ষমতা দেয়া হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের আয় মধ্যম বা নিম্নস্তরের হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের করের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের কর, চাঁদা বা কমিশন ফি দেয়া তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। তাই স্থানীয় সরকারের রাজস্ব আহরণের কাঠামো ন্যায্য, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব হওয়া জরুরি, যাতে জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে উন্নয়ন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নিশ্চিত করা যায়।

সর্বোপরি বলা যায়, স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলোর প্রতিটিই বাস্তবায়নের আগে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। কোন প্রস্তাবে কী ধরনের ঝুঁকি রয়েছে, বাস্তবায়নের ফলে জনগণের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে এবং সে ঝুঁকি প্রশমনে কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে—এসব বিষয়ে এখন থেকেই গবেষণা ও পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি জরুরি। হঠাৎ করে ব্যাপক সংস্কার কার্যকর করা হলেও যদি তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন না হয় এবং জনগণের সমস্যার সৃষ্টি করে, জবাবদিহিতা হ্রাস করে বা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে, তবে তা শুধু সংস্কার প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করবে না, বরং গণতান্ত্রিক চেতনা ও অংশগ্রহণের সংস্কৃতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই সংস্কারের প্রতিটি ধাপ পরিকল্পিত, স্বচ্ছ ও জনগণকেন্দ্রিক পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করাই হবে সাফল্যের মূল শর্ত।

সৈয়দা লাসনা কবীর: অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মোহাম্মাদ ঈসা ইবন বেলাল: গবেষণা সহযোগী, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়।