বিশ্বসভ্যতার ইতিহাস শাসন ব্যবস্থার রূপান্তরের এক গতিময় মহাকাব্য, যেখানে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস, আদর্শের সংঘাত এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা এক সূত্রে গাঁথা। ফরাসি বিপ্লবের উত্তাল দিনগুলো থেকে আরব বসন্তের অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পর্যন্ত, প্রতিটি যুগে শাসন কাঠামোর পরিবর্তন মানবসভ্যতাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার জন্যই ঘটেছে। ১৭৮৯ সালে বাস্তিল দুর্গের পতন কেবল একটি রাজবংশের পতনই নয়, ছিল রাজতন্ত্রের স্বৈরাচারী ভিত্তিকে চূর্ণ করার ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যে মুহূর্তে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিল সমগ্র ইউরোপ। ঠিক যেমন ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব জারের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে সমাজতন্ত্রের নতুন সূর্যোদয় ঘটিয়েছিল, তেমনি তেভাগা, জেলে-ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ ও অহিংস আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত করেছিল ভারতীয় উপমহাদেশে। কিন্তু শাসন ব্যবস্থার এ পরিবর্তন কখনই সরলরৈখিক নয়। বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর সমাজতন্ত্রে যে ধস নামে তা আবার নতুনভাবে হাজির হয়েছে ভেনিজুয়েলা থেকে ভিয়েতনাম পর্যন্ত, যেখানে পুঁজিবাদের বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে বেড়ায় তার স্থান।
আরব বসন্তের উত্তাপে যখন তিউনিসিয়ার এক ফল বিক্রেতার আত্মদাহ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে নাড়া দিয়েছিল, তখন তা শুধু বেন আলি বা মুবারকের পতনই ঘটায়নি, বরং প্রশ্ন তুলেছিল স্বৈরশাসনের সমগ্র কাঠামো সম্পর্কে। কিন্তু সেই উত্তাপই আবার লিবিয়ায় রূপ নিয়েছিল গৃহযুদ্ধে, সিরিয়ায় পরিণত হয়েছিল এক বিভীষিকাময় সংঘাতে; যেখানে শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের লড়াই নিজেই হয়ে উঠেছিল এক করুণ ট্র্যাজেডি। হংকংয়ের রাস্তায় যখন ছাত্ররা এক দেশ, দুই ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি রক্ষার দাবিতে বিক্ষোভ করেছিল, তখন তা ছিল চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের শেষ ঘাঁটি রক্ষার লড়াই।
আজকের বিশ্বে শাসন ব্যবস্থার এ লড়াই আরো জটিল রূপ নিয়েছে; যেখানে সামাজিক মাধ্যমকে হাতিয়ার করে গণ-আন্দোলনকে দিয়েছে নতুন গতি, কিন্তু এ পরিবর্তনের পথ কণ্টকাকীর্ণ। সিরিয়া, ইয়েমেনের মতো দেশগুলোয় শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তনের নামে যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা ব্যর্থ রাষ্ট্রের জন্ম দিচ্ছে; আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ শাসন ব্যবস্থার এ পরিবর্তনকে করছে আরো আশঙ্কাপূর্ণ।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থান বাংলা ভূখণ্ডের শাসন ব্যবস্থা বদলের ৭৭ বছরের ধারাবাহিকতা। এ ভূখণ্ডের মানুষ লড়াইকে তার পাথেয় করে নিয়েছে। জাতি-পরিচয় নির্বিশেষে মর্যাদা নিয়ে বাঁচার আকুতি এ দেশের তরুণদের বারবার শাসকের বুলেট-বেয়নেটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ঔপনিবেশিক (পড়ুন সাংবিধানিক ও আইনি) দখল থেকে শ্রমিক-কৃষক-জেলে-তাঁতি-মা-বোনের যূথবদ্ধ সংগ্রামকে রাজনৈতিক দলগুলো তাদের বারগেইনিং টুল (দরকষাকষির অস্ত্র) হিসেবে ব্যবহার করছে প্রতিবার। বাংলাদেশ নাম পাওয়ার পরও অভ্যুত্থান এই প্রথম নয়। নয় বছর লড়াই করে স্বৈরাচার হটিয়ে শহীদের রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত ‘তিন জোটের রূপরেখা’র করুণ পরিণতি চব্বিশের লড়াইয়ের পরে প্রণীত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ ও আশু সনদের প্রতি অবিশ্বাস ও আশঙ্কা জন্ম দেয়। ১৯৯১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যাতে বিএনপি জয়লাভ করে। এরপর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি চালু করা হয়। কিন্তু প্রতিবার সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশের অভিশপ্ত সংবিধানের ভয়াল রূপ। এ কারণেই তিন জোটের রূপরেখায় থাকা অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন হয়নি বরং চুক্তি ভঙ্গ করা হয়েছে। প্রধান দলগুলো সময়ের সঙ্গে নিজেদের স্বার্থে তা উপেক্ষা করে এবং দলীয় রাজনীতি ক্ষমতার লড়াইতে পরিণত হয়। নির্বাচন ব্যবস্থা দুর্বল হয়, বিরোধিতার সংস্কৃতি ও কালো আইন বৃদ্ধি পায়। এ ব্যর্থতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালে নতুন নাগরিক অভ্যুত্থানের জন্ম হয়। কিন্তু হায়! এ ভূখণ্ডে চতুর্থবারের মতো পুরানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো মহান লড়াইকে প্রতারিত করার আয়োজন করছে।
বাংলাদেশের শক্তিশালী যে কয়টি রাজনৈতিক দল আছে সবক’টি শাসকগোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি। কোনো কোনো রাজনৈতিক দল আছে যার প্রধান কার্যালয় বাংলাদেশেই নয়। এ দলগুলো সৃজনশীল, উদ্দীপ্ত তরুণদের স্বপ্নভঙ্গের কারখানা হিসেবে কাজ করে। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদের নামে আপসকামী, লুটেরা মনোভাবাপন্ন, চতুর ও নিষ্ঠুর মানুষ দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো পরিচালিত হয়। আগের শ্যাওলা ও মরিচা ধরা রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক উপায়ে পরিবর্তন করার চেয়ে আমূল পরিবর্তনের বিপ্লবী পন্থা অনেক বেশি কার্যকর হবে। তাহলে যদি আমাদের দেশের তরুণ ও নিম্নবর্গের মানুষ যারা সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছে তাদের শাহাদতের প্রতি ন্যায়বিচার করা যায়।
ইতিহাস সাক্ষী, শাসন ব্যবস্থার প্রতিটি পরিবর্তনই মানবসভ্যতাকে নিয়ে গেছে নতুন এক অধ্যায়ে—কখনো তা রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে, কখনো বা শান্তিপূর্ণ সংস্কারের পথে। কিন্তু এ পরিবর্তনের মূলে থাকে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বিচারের দাবি এবং একটি উত্তরণশীল সমাজের স্বপ্ন। মানুষের সংগ্রাম হবে সেই ক্ষমতাকে গণতান্ত্রিকভাবে ব্যবহারের নিশ্চয়তা দেয়ার। সভ্যতার এ অমোঘ যাত্রায় শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন নয়, বরং মানবমুক্তির এক অনন্ত পথের সন্ধান।
সামান্তা শারমিন: জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)










