গত বছরের ৩ আগস্ট ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ঘোষণা করা হয়েছে। সে ঘোষণাকে কেন্দ্র করেই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনাকে তাড়ানোর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে একতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাবনার একটি বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে। দেশের মানুষ পুরনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আর স্থির থাকতে চায় না। নতুন এক রাজনৈতিক বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে যেতে চায়। এবারের আন্দোলন ছাত্র-জনতার আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো একাত্মতা প্রকাশ করে এ আন্দোলনে শরিক হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ছাত্ররাই এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ চায় এ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে যেন নতুন এক রাজনৈতিক পথচলার উন্মেষ ঘটে, তরুণরা যেন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে।
শহীদ পরিবার, আহত, পঙ্গু, আন্দোলনের কর্মীসহ সবার প্রত্যাশা রাষ্ট্রের সংস্কার। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের আগে দুই হাজার শহীদের রক্ত ঝরেছে। বাংলাদেশের সব রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সংবিধানে একজন প্রধানমন্ত্রীর স্বৈরশাসক হয়ে ওঠার সব উপাদান বিদ্যমান। তাই আমরা সংস্কার চাই। রাজনৈতিক দলগুলো চাইল বলে এখনই নির্বাচন দিয়ে দেয়া হলে দুই হাজার শহীদ, আহত ও পঙ্গুত্ব বরণকারীর ত্যাগ অবমূল্যায়িত হবে। বাংলাদেশের মানুষ যে মুক্তির আশা দেখেছে, তা ভেঙে যাবে।
আবার একই সঙ্গে এটিও সত্য যে বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার চায়। ভোটের মাধ্যমে সরকার নির্বাচিত হোক, সে বিষয়েও মানুষের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা নির্বাচিত সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সেনাশাসিত সরকার ব্যবস্থাসহ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন। আমরা দেখছি, ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দল এ সরকারকে সমর্থন করে। অতএব এ সরকারকে অবশ্যই রাষ্ট্র সংস্কার করতে হবে। তবে সংস্কারের জন্য অতিরিক্ত সময় না নিয়ে প্রয়োজনীয় সময় নিতে হবে। এ সরকার সময় পাবে তার কাজের ভিত্তিতে। সংস্কারের কাজ ফেলে রেখে শুধু সময়ক্ষেপণ যাতে না হয়। প্রয়োজনীয় সংস্কার করেই যেন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেয়া হয়।
গোটা বিশ্বেই এখন বাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চলমান। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যদি আমরা প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থার দিকে চলে যাই, তাহলে এ দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষগুলো পিছিয়ে পড়বে। এজন্য আমরা মনে করি এ দেশে সরকার নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা থাকা দরকার। যদি স্থানীয় বাজার ব্যবস্থা করা যায়, এসএমই খাতসংশ্লিষ্টদের পৃষ্ঠপোষকতা দেয়া যায় এবং সরকার নিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার যদি প্রচলন ঘটানো যায় তাহলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হবে। এক্ষেত্রে জাপান বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ হতে পারে।
আগামী দিনের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপরেখার কথা যদি বলি, এ দেশের মোট জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। উপকূলবর্তী এলাকায় বসবাসকারী মানুষ অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যায়। তাদেরও অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আসেনি। তাদের নিয়ে ভাবতে হবে।
বাংলাদেশের গ্রাম পর্যায়ে অসংখ্য পরিবার রয়েছে যেখানে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া অনেক কঠিন। তিন বেলা খাবার যাদের জোটে না, তাদের জন্য পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া অনেকক্ষেত্রে বিলাসিতার ব্যাপার। এ অবস্থায় অর্থনৈতিকভাবে প্রত্যেক দরিদ্র পরিবারকে স্বাবলম্বী করে তোলা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় যতটা সম্ভব সরকারি প্রণোদনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। চাকরি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অনেক বেশি নেয়া হচ্ছে। সবার জন্য উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করতে ফি কমানোর ব্যবস্থা করা দরকার। আবার আমাদের শিক্ষায় বৈশ্বিক মান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের একটি সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আসতে হবে, যাতে অর্থের অভাবে কেউ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয় এবং মেধাবীদের সারা দেশ থেকে খুঁজে নিয়ে এসে উপযুক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত করে দেশের কাজে লাগানো যায়। যদিও আমাদের শিক্ষা খাতের প্রধানতম সমস্যা হলো এটি শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং বিভিন্ন ধারায় বিভক্ত।
এমন প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সবক’টি ধারাকে একটি ধারায় নিয়ে আসা খুবই কঠিন একটি কাজ। প্রথমে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো দরকার যে আমরা আমাদের সন্তানদের শিক্ষিত করছি কোন উদ্দেশ্যকে মাথায় রেখে। আমার মনে হয় প্রতিটি ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে নিয়ে স্টাডি করার সুযোগ থাকে। একই সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মের মূল্যবোধসম্পন্ন জ্ঞানার্জনের সুযোগ যেন থাকে। আবার বর্তমান বিশ্বে চলতে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জ্ঞানও যেন অর্জন করা সম্ভব হয়। প্রত্যেক ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে এভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।
সামাজিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশের মানুষের ধারণা হলো সরকারি চাকরিই সবচেয়ে ভালো। এ ধারণার পরিবর্তন করা দরকার। যদি আমাদের তরুণরা উদ্যোক্তা হতে পারেন, সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা মেলে এবং অর্থনীতিতে স্থিতাবস্থা ফিরিয়ে আনা যায় তাহলে এ ধারণা থেকে আমরা বের হয়ে আসতে পারব। তার পরও চাকরির বাজার তৈরি করা দরকার। আবার বাংলাদেশের প্রবাসীরা অধিকাংশই শ্রমিক হিসেবে যাচ্ছেন। তাদের দক্ষতা বাড়িয়ে দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারলে আমাদের জন্য আরো ভালো হবে।
বাংলাদেশে একসময় পাট শিল্পের জয়জয়কার ছিল। কিন্তু সেটা এখন শুধুই অতীত। অনেক পাটকল বন্ধ হয়ে গেছে। চামড়া শিল্পও আগের অবস্থায় নেই। বিগত সময়ে অনেক চিনিকল বন্ধ হয়ে গেছে। সুতরাং এমন অনেক খাতে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। তবে বেসরকারি খাত শিল্পায়নের ক্ষেত্রে সফলতার মুখ দেখাতে পেরেছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের শিল্পায়নে আমাদের গুরুত্বারোপ করা উচিত।
ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থক শিল্পোদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীদের বিচার হোক, কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠানগুলো যেন ভালোভাবে চলতে পারে সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ কাজ করছে। যদি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হয়ে যায় তাহলে বেকার সমস্যা আরো প্রকট হবে। আমরা দেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণ দেখতে চাই, ব্যক্তিকেন্দ্রিক থাকতে চাই না।
আখতার হোসেন: জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব










