জুলাই ঘোষণায় বলা হয়েছে বাহাত্তর সংবিধানের অনেক ঘাটতির কথা, সীমাবদ্ধতার কথা ও অসম্পূর্ণতার কথা। এ সংবিধানের কারণে এ দেশে এত নেতা বন্দনা এবং নীতিভিত্তিক রাজনীতির বেহাল দশা, ফলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এ দেশকে জন্ম থেকে পদে পদে হোঁচট খেতে এবং অহেতুক রক্তপাত দেখতে হয়েছে। এতে মানবাধিকারের চমৎকার বয়ান আছে অথচ বাস্তবায়নের কোনো বন্দোবস্ত নেই। যদি কিন্তু তবে দিয়ে মৌলিক অধিকার ও মূলনীতিগুলো আদালতে অবলবৎযোগ্য রাখার মাধ্যমে বাংলাদেশকে বানানো হয়েছিল একটি অক্ষম নাগরিকের দেশ। এটি ছিল নিছক সাংবিধানিক একেশ্বরবাদের একটি দলিল, যা মাফিয়া রাজনীতি ও ফ্যাসিবাদের অনন্ত উৎস বা উৎপাদন কারখানা। এর মূলমন্ত্র ছিল ভোট দিয়ে ভগবান তৈরি করা এবং তার পূজা করা, ফলে সৃষ্টি হয় দলীয় শক্তি ব্যবহার করে বুথ দখল করার মচ্ছব। সংবিধানের সাইনবোর্ডে ঝুলানো গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র অথচ ভেতরে আছে অগণতন্ত্র ও বৈষম্যের পাকাপোক্ত বন্দোবস্ত। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হবে। এ শর্তের ফলে প্রশ্ন উঠেছে কে সার্বভৌম? জনগণ না সংবিধান? অবশ্য ৭(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি রূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। যেখানে জনগণের অভিপ্রায় পরিবর্তনশীল, সেখানে একটি প্রগতিশীল সংবিধান দুষ্পপরিবর্তনীয় হয় কীভাবে? গণবিপ্লব কি জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি নয়? দেয়াল লিখন ও গ্রাফিতিগুলো তাহলে কিসের অভিব্যক্তি? এ অনুচ্ছেদ বলে আদালত কি জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ বা নাকচ করতে পারে? জনগণ রাষ্ট্রের মালিক এ কথা সংবিধানে দ্ব্যর্থহীনভাবে লিপিবদ্ধ নেই, যা থাকা উচিত ছিল। শুধু লেখা আছে জনগণ সকল রাষ্ট্র ক্ষমতার মালিক। লেখা থাক বা না থাক জনগণ ছাড়া আর কেউ তো রাষ্ট্রের মালিক হতে পারে না। জনগণ যদি রাষ্ট্রের মালিক হয় তাহলে আদালত কি তাদের রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে পারে? অথচ দেশের মিডিয়া ও একাডেমিয়া কেন যেন এ কাজে সদাব্যস্ত।
একটি কমিউনিস্ট পার্টি ও ডেমোক্রেটিক পার্টি কখনো একই ধাঁচে গঠিত হয় না। ছাত্র ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে একটি গণতান্ত্রিক দল কমিউনিস্ট পার্টির মতো দলীয়করণ করতে পারে না। অথচ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের মাধ্যমে দলগুলোকে অবাধ দলীয়করণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। দলীয়করণ করলে দেশে কেউ আর নিরপেক্ষ থাকে না। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কোনো অদলীয় লোক আর দেশে খুঁজে পাওয়া যায় না। গণতন্ত্রে শেষ কথা আদালত বা কোনো রাজনৈতিক দল নয়। শেষ কথা জনগণ। এ দেশে গণতন্ত্র বিকলাঙ্গ অথবা তাকে বিকলাঙ্গ বানিয়ে রাখা হয়েছে। সে নিজে নিজে হাঁটতে পারে না। কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের হাত ধরে তাকে হাঁটতে হয়। অফিস আদালত বা সংবিধানের চেয়ে জনগণ অনেক বড়। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করার কোনো এখতিয়ার আদালতের হাতে দেয়া সমীচীন নয়। নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং অনুমোদন গণপরিষদ বা সংবিধান সভার হাতে রাখা সমীচীন। ৭২ সালে যারা গণপরিষদ সদস্য ছিল তাদের প্রায় সবাই পরে সাংসদ হন। অর্থাৎ যারা সংবিধান রচনা করেছিলেন তারাই সাংবিধানিক ক্ষমতার ব্যবহারকারী ছিলেন। রচনাকারী ব্যবহারকারী হলে ক্ষমতার ভারসাম্য ব্যাহত হবেই। এক যুগের জনগণ সংবিধান বানিয়ে আরেক যুগের জনগণের ওপর অনন্তকালের জন্য চাপিয়ে দিতে পারে না। ২০ বা ৩০ বা ৪০ বা সর্বোচ্চ ৫০ বছর পরপর জনগণের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা পূরণ করার জন্য এ-জাতীয় সংবিধান সভা গঠন করা যেতে পারে। একটি রাষ্ট্রে শুধু দ্বিতীয় রিপাবলিক নয়—তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম রিপাবলিক হতে তো আপত্তি থাকার কথা নয়, যদি জনগণ চায়। যেখানে পরিবর্তন জীবন জগতের ধর্ম, সেখানে প্রথম রিপাবলিকে একটি রাষ্ট্রকে থামিয়ে রাখা সমীচীন নয়। আদালত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। অধিকার নস্যাৎ করার জন্য নয়। কাজেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো জনগণও বদলাতে পারবে না এ-জাতীয় মতামত গণবিরোধী ও গণতন্ত্রবিরোধী। এটা ক্রোনি বুর্জোয়া ও অলিগার্কের হাতে রাষ্ট্রকে চিরবন্দি রাখার বন্দোবস্ত। সংবিধান অহি বা কোনো আসমানি কিতাব নয়। সংবিধান ইলহাম এবং মানব রচিত। কাজেই এটি বারবার রচিত হওয়া খুব অস্বাভাবিক কিছু নয়। অন্যদিকে কারণে অকারণে সংবিধান সংশোধনের নামে রাষ্ট্রের মূলনীতি, রাষ্ট্রের নাম, জাতীয় সংগীত, জাতীয় পতাকা ইত্যাদি পরিবর্তন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ। দলীয় ও অদলীয় রাজনীতির সীমান্ত নির্মাণ, রাষ্ট্রপতি, বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়োগ ও পদোন্নতি, স্থানীয় সরকার এবং ছাত্র ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোর অদলীয়করণ, সাংসদদের অনাস্থা প্রস্তাব আনার অধিকার এবং ভোটারদের ভোট ফিরিয়ে নেয়ার অধিকার সংবিধানে সন্নিবেশিত করতে পারলে জুলাই বিপ্লব সার্থক বলে গণ্য হবে। এজন্য একটি রাষ্ট্রে সাংবিধানিক আদালত ও মানবাধিকার আদালত থাকা জরুরি, যাতে অধিকার লঙ্ঘিত হলে জনগণ বিনা বা স্বল্প খরচে আদালতে তার তাৎক্ষণিক প্রতিকার পায়।
আধুনিক রাষ্ট্র দমন-পীড়নমূলক নয়, সেবামূলক। অফিস-আদালত, কারাগার, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও হাসপাতালে নাগরিক সেবার মান উন্নত করা তার প্রথম অগ্রাধিকার। কাজেই রাষ্ট্রক্ষমতার ম্যান্ডেট নিতে হলে একটি রাজনৈতিক দলকে অবশ্যই দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্র অনুশীলনের মাধ্যমে নির্বাচিত নেতৃত্ব গঠন করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে এবং সেবামুখী হতে হবে। তাহলে সুগম হবে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক গণতন্ত্রায়নের পথ। তা না হলে কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দেয়া সমীচীন নয়। একটি গণতান্ত্রিক দলের প্রথম কাজ হলো সাম্য, মানবমর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মতাদর্শগুলো বেছে নেয়া। দ্বিতীয় কাজ একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা। তৃতীয় কাজ নাগরিক সেবার মান উন্নত করার জন্য বাস্তবসম্মত ইশেতহার প্রকাশ করা। চতুর্থ কাজ গণভিত্তি তৈরি করার জন্য পথসভা, জনসভা, মিছিল, গণজমায়েত, মানববন্ধন, গণ-অনশন ইত্যাদির মাধ্যমে গণসংযোগ কার্যক্রম জোরদার করা। খেয়াল রাখতে হবে এগুলো যেন শান্তিপূর্ণ ও ভাংচুরবিহীন হয়। এখানে যেন ভয় দেখানোর কোনো ব্যাপার স্যাপার না থাকে।
অদলীয় গণতান্ত্রিক ছাত্র ও পেশাজীবী রাজনীতিকে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতি বলা হয়। একটি রাষ্ট্রে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি অদলীয় রাজনীতি থাকতে হবে। পার্থক্য হলো দলীয় রাজনীতি সরকার গঠন করবে, অদলীয় রাজনীতি করবে না। দলীয় রাজনীতি উচ্চ বা নিম্নকক্ষে গিয়ে আইন বানাতে পারবে, অদলীয় রাজনীতি পারবে না। অদলীয় রাজনীতি শুধু ছাত্র ও পেশাজীবীদের পেশাগত দাবিদাওয়া আদায়ের জন্য। জাতীয় সরকারে থাকবে দলীয় রাজনীতি এবং স্থানীয় সরকারে থাকবে অদলীয় রাজনীতি। তথ্য ও জ্ঞান ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করতে দেয়া যায় না। এজন্য দরকার সাংবিধানিক উচ্চশিক্ষা ও তথ্য কমিশন। তাদের হাতে থাকবে সত্যসন্ধানী মিডিয়া ও একাডেমিয়া। তা না হলে দেশের মিডিয়া ও একাডেমিয়া কোনোদিন প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও মুক্ত হতে পারবে না। মিডিয়া ও একাডেমিয়া দেখবে জনগণের স্বার্থ। অলিগার্ক, ক্রোনি বুর্জোয়া বা স্বার্থান্বেষী মহলের স্বার্থ দেখা তাদের কাজ নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং একাডেমিক স্বাধীনতা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। একটি না থাকলে অন্যগুলোও থাকে না। এজন্য প্রকৃত গণতন্ত্রের স্বাদ পেতে হলে দরকার সাংবিধানিক উচ্চ শিক্ষা ও তথ্য কমিশন। পেশাজীবীদের পেশাদারত্ব, পেশাজীবিত্ব, বুদ্ধিজীবিত্ব এবং নিরন্তর গবেষণায় দলীয় রাজনীতি ধীরে ধীরে অর্জন করবে বিশ্বমান। তা না হলে ভালো মানুষের জন্য বাংলাদেশ অবসবাসযোগ্য হয়ে যাবে।
বিগত সরকারের আরেকটি ফ্যাসিবাদী কাজ ছিল স্থানীয় সরকারের চরম দলীয়করণ। ফলে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করার জন্য সেখানেও খুঁজে পাওয়া যায়নি কোনো অদলীয় মানুষ। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করা ছিল বাধ্যতামূলক। এজন্য এ নির্বাচনেও জমজমাট হয়ে ওঠে মনোনয়ন বাণিজ্য ও বুথ দখল। ফলে জাতীয় নির্বাচনের মতো এটিও হয়ে ওঠে ভোটারবিহীন। স্থানীয় সরকারগুলো অদলীয় রাখতে হলে দরকার সাংবিধানিক স্থানীয় সরকার কমিশন। মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার দলীয় ও অদলীয় অংশের সুষম সংমিশ্রণ, যা পারস্পরিক জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার জন্য অপরিহার্য। রাষ্ট্রসংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া এবং জুলাই বিপ্লবের প্রাণস্পন্দন। এটি থেমে গেলে বা থামিয়ে দিলে বেসামাল হবে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি। মাটি হবে জুলাই বিপ্লব। সেক্ষেত্রে প্রতি বিপ্লব হবে সময়ের ব্যাপার মাত্র, যা কারো পক্ষে ঠেকানো সম্ভব হবে না।
মু. আবদুল হাকিম: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব










