আন্দোলন, জাগরণ, রাজনৈতিক অধিকার ইত্যাদি নিয়ে বর্তমানে যেসব কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে তা বুঝতে হলে আমাদের অতীতে ফিরে তাকাতে হবে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ও এর পরবর্তীকালে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের যে ধারা শুরু হয়েছিল সেটি আজও বহমান। চিরকালই সাধারণ জনগণ ও সচেতন ছাত্রসমাজের সঙ্গে আমাদের নেতৃত্বের একটা দূরত্ব থাকে, সংঘাত থাকে আর সেটা তাদের দুর্বল শাসনেরই ফল। এ ভূমিতে ছাত্রসমাজ থেকে উন্নত চিন্তাভাবনা এসেছে। ছাত্রসমাজের সঙ্গে যখনই রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিরোধে গেছে তখনই আমরা সাক্ষী হয়েছি সবচেয়ে বড় বড় আন্দোলনের।

নব্বই বা চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে যে বর্ণনা রয়েছে তার বেশির ভাগই বাস্তবসম্মত নয়। বরং বাস্তবে যা ঘটেছে তার থেকে অনেক দূরে গিয়ে সবকিছু বর্ণনা করা হয়েছে। কারণ সবার লক্ষ্য ছিল একটি সুন্দর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও দেশকে স্থিতিশীল রাখা।

সেদিক দিকে বর্তমান গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে ঊনসত্তর কিংবা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের তুলনা হয় না। তখন বায়ান্নর গণজাগরণের সময়ে দেশে টানা দুই-তিন মাস কোনো সরকার ছিল না। নুরুল আমীন সরকারের বিরোধিতায় মানুষ একে অন্যের সাহায্যে যেভাবে আন্দোলন করেছে সেটা বর্তমানে ভাবা যায় না। এখনকার বিরোধিতা নানাভাবে বিকৃত হয়ে গেছে। বিরোধিতার নামে মানুষ প্রতিদিন মানুষকে খুন করছে, জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে।

আবার চব্বিশের আন্দোলন আর ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃতি একেবারেই ভিন্ন ছিল। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কিছুটা অতিরঞ্জন থাকলেও এটিকে এখন পর্যন্ত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণ-অভ্যুত্থান বলা হয়।

আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা থেকে বারবার গণ-আন্দোলন, অভ্যুত্থান ঘটার প্রবণতা ও সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ না হওয়ার পেছনের কারণ আমাদের ইতিহাসের পর্যালোচনা থেকে বোঝা উচিত। ইতিহাসের প্রেক্ষাপট না বুঝলে বিষয়টি গভীরভাবে বোঝা যাবে না। ইতিহাসের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে আমাদের রাজনীতিবিদেরা কথা বলেন না। কোন সমস্যার সমাধান করলে জনগণ খুশি হবে, তারা শুধু সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু প্রকৃত রাজনীতি এর থেকে ভিন্ন, প্রকৃত রাজনীতিকের এমন কিছু গুণ থাকে যা সাধারণ মানুষের থাকে না। ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা থাকবেই, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা সাধারণ মানুষেরও আছে যারা একটু শক্তিশালী। কিন্তু সবার জন্যই ভালো হয়, কল্যাণকর হয় এমন বিধিবিধান, আইনকানুন তৈরি করতে হবে।

এশিয়ায় প্রথমে ধর্ম অবলম্বন করে; বিজ্ঞানের আগমনের পর বিজ্ঞানকে ধারণ করে ধর্ম থেকে সরে গিয়ে মানুষের বুদ্ধি দিয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক একটা ব্যবস্থা তৈরি করা হলো যাকে একালের ভাষায় গণতন্ত্র বলে। কিন্তু ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ায় গণতন্ত্রের ধারণাকে নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। কিছু লোক খুব ক্ষমতাবান হতে চায়, কিছু লোক অঢেল টাকাপয়সা, অর্থ-বিত্তের মালিক হতে চায়। এবং তারা ন্যায়-অন্যায়ের পরোয়া না করেই সমাজে কর্তৃত্ব করতে চায়। এ ধরনের লোকেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার কারণে গণতন্ত্রকে একান্তই অর্থহীন করে ফেলা হয়েছে। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন বিলুপ্তির পর পৃথিবীর কোনো দেশই আর সমাজতন্ত্রে আস্থা রাখে না।

গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের বাইরে রয়েছে প্রচলিত ধর্মগুলো। কিন্তু মানুষের বুদ্ধিতে মানবীয় কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন করা সম্ভব সেটা বর্তমানে করতে পারলেই মানুষের সবচেয়ে বেশি কল্যাণ হবে। এখন ঊনসত্তর, নব্বই আর চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের তুলনামূলক আলোচনা করতে গেলে আমাদের পেছনে গিয়ে মূলের সন্ধান করতে হবে। গণ-অভ্যুত্থান আকস্মিকভাবে হয় না। নানান কারণে তৈরি হয়, একটা সময়ে গিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। যত্রতত্র যেখানে সেখানে অভ্যুত্থান হয় না।

এ দেশে গণ-আন্দোলনের ধারা বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু হয়েছে। আগে রাজনীতি ছিল সভাকক্ষের ভেতরে। রাজনীতির ভাষা ছিল ইংরেজি। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় প্রথম সভাকক্ষের বাইরে হাটে-মাঠে-ঘাটে মিটিং-মিছিল হয়েছিল। সেটা হয়েছিল বাংলা ভাষায়ই। রাজনীতিকে প্রথম জনগণের কাছে নিয়ে আসা হয়। এভাবেই বাংলা ভাষায় রাজনীতির চর্চা শুরু হয় ও বিকশিত হতে থাকে। সভাকক্ষের বাইরে সভা নিয়ে আসার পেছনে কারণ ছিল জনগণকে বোঝানো ও জনগণকে দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা। এরপর প্রতিবাদের পন্থা হিসেবে জনগণকে দিয়ে স্ট্রাইক করিয়ে, হরতাল করিয়ে ইংরেজকে বোঝানোর চেষ্টা করা হলো যে মানুষ আর ইংরেজের শাসন চায় না এবং নিজেদের ভূমিতে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

একটা পর্যায় পর্যন্ত সফলতার পরে আমরা ব্যর্থ হয়েছি ইংরেজদের ‘‌ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ কৌশলের কাছে। এর পেছনে অবশ্য উপমহাদেশের নেতাদেরও ত্রুটি ছিল। মহাত্মা গান্ধীর মতো অসাধারণ মানবতাবাদী এক নেতা যার মতো দৃষ্টান্ত পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল; তিনি তার রাজনীতিতে নিজের ‘‌হিন্দু’ পরিচয়ের ওপরে উঠতে পারেননি। ফলে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের একটা প্রশ্ন উঠে ঐক্য বিনষ্ট হয়েছে। হিন্দুত্ববাদের ধারণার কারণে ভারতীয় মুসলমানেরা দেখতে বাধ্য হয়েছে যে গান্ধী তো হিন্দুদেরই নেতা। আর এ বিরোধের সুযোগটাই ইংরেজরা কাজে লাগিয়েছে।

এরপর শুরু হলো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যার ভয়ংকর রূপ আমরা শহরগুলোয় দেখেছি। যার ফলাফল আমরা এখনো বহন করে চলেছি। হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে যে রাজনৈতিক, জাতিগত দূরত্ব ও অনৈক্য ছিল, সেগুলোকে বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারব কোন ধরনের রাজনৈতিক পথ আমাদের অনুসরণ করা উচিত।

ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজরা অনেক কিছু সহজে মেনে নিয়েছে ও নীতি পরিবর্তন করেছে। কেননা এমন কোনো জোরালো দাবি ওঠেনি, যা শাসকদের জন্য অসুবিধাজনক। অনেকদিন পর্যন্ত উপমহাদেশে কোনো হিন্দু-মুসলিম নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। এ রকম একটি অন্ধকার সময় পেরিয়ে রাজা রামমোহন রায় সর্বপ্রথম আসেন উপমহাদেশের সংস্কারক নেতা হিসেবে। তিনি তার সময় থেকে অনেক যুগ এগিয়েছিলেন। তিনি ধর্মের ক্ষেত্রে, সমাজের ক্ষেত্রে অনেক উন্নত, উঁচুমানের সংস্কার করেন। সামগ্রিক মানবকল্যাণের জন্য তিনিই প্রথম একটি সাধারণ সামাজিক নীতিবিধানের কথা প্রচার করেন। এছাড়া তিনি প্রথম ঘোষণা করেন যে ‘সব মানুষের জন্য অধিকার প্রণয়ন করা দরকার।’ পরবর্তীকালে এ ধারাক্রমে অনেকে এসেছেন—ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, অক্ষয়কুমার দত্ত, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, বেগম রোকেয়া, কাজী আবদুল ওদুদ, এস ওয়াজেদ আলীসহ আরো অনেকে। তাদের হাত ধরে মুক্ত-আধুনিক চিন্তাচেতনা আসার পরই উন্নতির নতুন দিক উন্মোচিত হয়েছে। এমন চিন্তাভাবনার অগ্রগতি সব জাতির মধ্যে এক সময়ে ঘটেনি, সেজন্য তাদের বিকাশের ইতিহাসও আলাদা। যে জাতি এ বিষয়গুলোকে বেশি যুক্তিসংগতভাবে অবলোকন করতে পেরেছে এবং নিজেদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব সৃষ্টি করতে পেরেছে জাতি হিসেবে তারাই সফল হয়েছে।

যারা নিজেদের নেতৃত্ব, নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পন্থা বের করতে পারেনি তারা নতুন নতুন আদর্শ নিয়েও—যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, আন্তর্জাতিকতাবাদ নিয়েও—কিছুটা উন্নতি করতে পারলেও সম্পূর্ণ সফল হয়নি।

ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতীয়রা পাশ্চাত্য শিক্ষা, সাহিত্য, দর্শনসহ জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক কিছু অর্জন করে অন্যান্য জাতির চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশ এগিয়ে গিয়েছিল। ইংরেজরা এ দেশে অনেক সংস্কার, কল্যাণ করলেও তাদের প্রধান উদ্দেশ্য বা কামনা ছিল এ দেশে তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করা। এমনকি তাদের ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনের প্রধান কারণ ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার করে অতিমুনাফা অর্জন করে অর্থবিত্ত নিজের দেশে নিয়ে যাওয়া। তাদের এ উদ্দেশ্য পূরণে শেষদিন পর্যন্ত তারা সচেষ্ট ছিল। দিনকে দিন তারা ভারতে রাজস্ব আয় বাড়িয়েছে আর অর্জিত সব অর্থবিত্ত ইংল্যান্ডে পাঠিয়েছে।

দেশভাগের সময় তারা বাংলা ও পাঞ্জাবকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই দেশের মধ্যে দিয়েছে। যেখানে পাঞ্জাব ছিল তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে ধনী প্রদেশ। অন্যদিকে বাংলা ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় সবচেয়ে উন্নত। কলকাতার সমকক্ষ কোনো জ্ঞান কেন্দ্র তখন গোটা বিশ্বেই ছিল না। রামমোহন, বিদ্যাসাগর এমনকি রবীন্দ্রনাথের সময় পর্যন্ত জাপান, চীন, ইন্দোচীন, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ আমেরিকায়ও তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। স্বাধীনতার কিছু আগে রাজধানী কলকাতা থেকে সরিয়ে দিল্লিতে নেয়া হয়। কলকাতা যদি সারা ভারতের রাজধানী হয়ে থাকত তাহলে এ অঞ্চলের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার উন্নতি হতো।

আবার এর ফলে দেখা গেল উপমহাদেশে যখন আধুনিক রাজনীতি শুরু হলো তখন নেতৃত্ব আর বাঙালি ধরে রাখতে পারল না। নেতৃত্ব চলে যায় উত্তর-পশ্চিম ভারতীয়দের হাতে। যদিও ব্যক্তিত্ব, সততা ও বুদ্ধি-বিবেচনায় গান্ধী, নেহরু, জিন্নাহর মতো নেতারা ইংরেজ নেতাদের তুলনায় অনেক ওপরে ছিলেন। তার পরও কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশভাগ, বাংলা ভাগ, পাঞ্জাব ভাগ করে ইংরেজরা যে রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করল আজও সেটার প্রভাব বইতে হচ্ছে। ইংরেজ শাসকদের চাপ, ভয় ও প্রলোভনের মধ্যে একটি বিরূপ পরিবেশে কাজ চালিয়ে যেতে পারলেও নেতাদের মধ্যে ছিল ঐক্যের অভাব। বিশেষ করে বাঙালিদের মধ্যে এটি সবচেয়ে প্রকট ছিল।

বাঙালি আজ পর্যন্ত বৃহৎ নেতৃত্ব তৈরি করতে পারেনি। এর মধ্যে ভালো-মন্দ যেমনি হোক একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও শেখ মুজিব। দুঃখজনক হলো শেখ মুজিবের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিষয়টি কয়েক বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যে ধারায় সে উঠেছিল সেই ধারাবাহিকতা সে আর রক্ষা করতে পারেনি। তার তিন বছরের ক্ষমতা আরোহণকালে সে চূড়ান্ত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও সত্য যে শেখ মুজিব ছাড়া বাঙালির আর ওই মাপের কোনো বড় নেতা নেই।

এরপর তিনি নিজের ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য বাকশাল গঠন করেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। সর্বোপরি, শেখ মুজিবের নেতৃত্বের যে গুণ ছিল তা স্বাধীন বাংলাদেশে বিকশিত হয়নি। তার পরবর্তীকালে যে দুজন সামরিক শাসক এসেছেন, তাদের ‘‌রাজনৈতিক গুণসম্পন্ন’ বলতে যা বোঝায় সেটা বলা দুষ্কর। তবে রাজনীতিবিদের সঙ্গে তুলনা করলে অনেক খারাপের মধ্যেও তাদের যেটা সবচেয়ে ভালো দিক সেটা হলো তারা রাষ্ট্রের শাসক হিসেবে রাজনৈতিকদের চেয়ে তুলনামূলক ভালো ছিলেন। জিয়াউর রহমানই প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রকে সচল করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং সেই ব্যবস্থা বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রথম সফল রাষ্ট্রকাঠামো বলা চলে। এরশাদও রাষ্ট্রশাসনের এমন অনেক ক্ষেত্রে সফল যেটা রাজনীতিকেরা পারেননি।

সামরিক শাসনের পর বাংলাদেশের যে নেতৃত্ব এল সেটাকে ‘‌বংশানুক্রমিক’ শাসন বলা চলে। শেখ হাসিনা রাজনীতিতে এসেছেন শেখ মুজিবের কন্যা হিসেবেই। তারই পথ ধরে বিএনপির নেতৃত্বে এসেছেন তারেক রহমান, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার উত্তরাধিকারী হিসেবে। নেতা যদি বংশানুক্রমিকভাবে নির্ধারিত হন তাহলে সেটা গণতন্ত্রবিরোধী। ভারত-পাকিস্তানসহ পৃথিবীর অনেক দেশে আমরা পরিবারতান্ত্রিক একটা শাসন কাঠামো দেখি।

টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় থেকে শেখ হাসিনা নিজের অস্তিত্ব নিজেই বিপন্ন করেছেন নিজের লাগামছাড়া কথাবার্তা ও কর্মের মাধ্যমে। এ দেশকে তিনি পৈতৃক সম্পদ হিসেবে অনেকবার দাবি করেছেন। এছাড়া বারবার একই পারিবারিক গল্পের কারণে তার দলসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বিরক্ত হয়েছে।

তার শাসনামলে এমন অনেক কাজ হয়েছে, যা অমানবিক। এর মধ্যে গুম, খুন, আয়নাঘরের মতো বিষয়গুলো যখন জনসম্মুখে প্রকাশিত হয়েছে তখনই শেখ হাসিনার ক্ষমতার ভিত্তি একেবারে নড়বড়ে হয়ে গেছে। আন্দোলনের শুরুর দিকে আন্দোলনের জন্য দায় তিনি অন্য দলগুলোর ওপর দিলেও পরবর্তীকালে তিনি এটার দায় বহিঃশক্তির ওপরও চাপিয়েছেন।

প্রকৃতপক্ষে অতীতের আন্দোলনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে এ আন্দোলন হয়নি। অনেকটা অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে হয়ে গেছে। এখানে ছাত্রদের যে আন্দোলন ছিল ‘‌কোটাবিরোধী আন্দোলন’ সেটা খুব সহজে সমাধান করা যেত। তাদের চাওয়া যৌক্তিক ছিল ও তারা কোনো জবরদস্তিও করেনি কিংবা কোনো অন্যায় আবদারও করেনি। সুতরাং বিষয়টা ছাত্রদের সঙ্গে বসে খুব সহজেই মিটিয়ে নেয়া যেত। কিন্তু শেখ হাসিনা ও আদালতের প্রহসনের কারণে আন্দোলন বড় হয়ে ওঠে আর তারপরের ঘটনাগুলো তো খুবই স্পষ্ট। এরপর তার পতনের পর ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টা হয়ে একটা সরকার গঠন করলেন। যেখানে তার উপদেষ্টা পরিষদের সবাই এনজিও এবং সিভিল সোসাইটির ব্যক্তি। এনজিওরা কাজ করে গরিবদের মধ্যে আর সিভিল সোসাইটির সংস্থাগুলো এ এনজিওদেরই কাউন্টারপার্ট।

আগের দিনে রাজনৈতিক দলগুলোকে উৎখাত করে ক্ষমতা যেত মিলিটারির হাতে। কিন্তু মিলিটারির বিরুদ্ধে আন্দোলন করে তাদের ক্ষমতাচ্যুত করা খুব বেশি কঠিন ছিল না। কিন্তু এখন ক্ষমতা যায় এ এনজিও ও সিভিল সোসাইটি সংস্থাগুলোর হাতে, যারা অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। সেজন্য তাদের ক্ষমতাচ্যুত করাও অত্যন্ত কঠিন। তাদের উৎখাত করাও সহজ নয়। কেননা তাদের পেছনে বিশ্বের বৃহত্তম পরাশক্তিদের সমর্থন রয়েছে। মূলত তাদের মোকাবেলা করতে গিয়ে হাসিনা টিকতে পারেনি। কিন্তু এ সরকারের সেই শঙ্কাটি নেই। কিন্তু দেশবাসী ধীরে ধীরে একটা সময় গিয়ে বুঝতে পারবে যে তাদের স্বাধীনতা বিপর্যস্ত। যেটা তারা যথাসময়ে উপলব্ধি করতে পারেনি।

আরেকটি বিষয় হলো যারা আমাদের সমাজের উচ্চশ্রেণীর লোক, আমাদের আমলাশ্রেণী, সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা তারা অন্য দেশে তাদের ছেলেমেয়েদের নাগরিক করে ফেলে, সম্পদ গড়ে তোলে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার দেশগুলো তাদের সবারই আরাধ্য ঠিকানা। এমনকি অনেকে নিজেরাও সে দেশে গিয়ে স্থায়ী হয়। দেশের শাসনকর্তাদেরই যখন এমন চিন্তাভাবনা থাকে, সেখানে বাংলাদেশ যে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে, উন্নতি করবে সেটার কোনো অবস্থা এখন পর্যন্ত নেই।

আমার মনে হয়, বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে রাজনীতিবিদেরা উৎখাত হয়ে গেছে। নিজেকে ‘‌রাজনৈতিক নেতা’ বলে আত্মপরিচয় দিতে পারবে এমন কোনো নেতাই আর এ দেশে নেই। বাংলাদেশে বিদ্যমান যেসব দল আছে—মধ্যপন্থী, ডানপন্থী, বামপন্থী—যে আদর্শেরই দল হোক না কেন তাদের যেসব নেতা আছে (যদিও সে অর্থে ‘‌নেতা’ বলতে আমি কাউকে দেখি না) তাদের কেউই নিজেকে শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে পরিচয় দেয়ার যোগ্যতা রাখেন না। এ রকম একজন ব্যক্তিকেও আমরা আর খুঁজে পাই না।

সেই আশির দশকের শুরু থেকে যে বিরাজনৈতিকীকরণের চল শুরু হয়েছে সেটার আরেকটি বড় উদাহরণ ‘‌নির্বাচনের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার’, যা এ বিরাজনৈতিকীকরণের পরিকল্পনার মধ্যেই সম্পৃক্ত। দেশের ভেতরের কারো মস্তিষ্ক থেকে এ পরিকল্পনা আসেনি, সরাসরি কলকাতা বা ইসলামাবাদ থেকেও আসেনি। এটা ওয়াশিংটন থেকে লন্ডন, লন্ডন থেকে দিল্লি-কলকাতা হয়ে ঢাকা এসেছে। কিন্তু এগুলো কেউ এখন জানতেও চায় না, বুঝতেও চায় না। আর একই কারণে আগে মিলিটারি সরকারের বিরুদ্ধে যেমন আন্দোলন করা যেত, সেটা আর এ ধরনের সরকারের বিরুদ্ধে যাবে না। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক বক্তব্যকে পাশ কাটিয়ে সরকার উৎখাতের আন্দোলন আর জমে উঠবে না। সেজন্য নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে।

রাজনীতির সঙ্গে রাজনীতি যায়। আর ‘‌রাজনৈতিক’ মানে হলো রাজনীতির চিন্তা। দেশ একটি প্রাকৃতিক সৃষ্টি। এখানে উঁচু-নিচু-সমতল সব ধরনের ভূমিই আছে। বিভিন্ন ধর্মের, শ্রেণী ও পেশার মানুষ আছে। কিন্তু যে রাজনীতিবিদ, সে জানে এদের কীভাবে রাষ্ট্রকাঠামোয় যুক্ত করতে হয় এবং একই সঙ্গে কীভাবে সবকিছুর সমন্বয়ে রাষ্ট্রকে সুসংহত করতে হয়। দেশ অনেকটা ভূগোলের বিষয়, রাষ্ট্র সেখানে ভূগোলের বাইরে সর্বসাধারণের জন্য প্রযোজ্য কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে সবাইকে একত্র করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। আর রাজনীতিই হলো সেটি প্রতিষ্ঠার একটি মাধ্যম।

রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর নীতি-আদর্শ যেমন গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ইত্যাদি সবদিক দিয়ে বাংলাদেশ আজ রাষ্ট্র হিসেবে একান্তভাবে একটি দুর্বল অবস্থায়। কেননা এ দেশে রাজনীতি নেই বললেই চলে। এ পরিস্থিতিতে ক্ষমতা কখনো যদি কোনো রকমে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে যায়ও তাহলেও তারা সেটার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারে না।

এ রাজনীতিশূন্যতার চেয়ে বড় বিপর্যয় একটি আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য আর কিছু হতে পারে না। কেননা আগের মতো সেনাবাহিনী দিয়ে একটি রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখল করে নেয়া—বিশেষ দুয়েকটা ক্ষেত্রে ঘটতে পারে কিন্তু তাছাড়া আর এমনটি ঘটার সম্ভাবনা নেই। কারণ পরিকল্পনা অনুযায়ী এ রকম হোক সেটা আর তারা চায় না। তাদের কাছে এটা দেখানো গুরুত্বপূর্ণ যে গণতন্ত্রের নামে দেশ চলছে। সেক্ষেত্রে ভোটাভুটি ছাড়া আর কোনো নীতির কোনো পরোয়া তারা করে না, আমরাও করি না। কেননা ইতিহাসের এ শিক্ষা যে ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না।

আবুল কাসেম ফজলুল হক: সভাপতি, বাংলা একাডেমি