মানবসম্পদকে প্রাধান্য দেয়ার জন্য তরুণদের শিক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়ে আপনার মূল্যায়ন। কী ধরনের পলিসি নেয়া উচিত?
গত এক দশকে প্রায় এক কোটি মানুষ শ্রমিক হিসেবে দেশের বাইরে চলে গেছেন। এর অর্থ এ বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য দেশে কর্মসংস্থান নেই। এর কারণ বাংলাদেশে কারখানা অনেক হয়েছে, কিন্তু শিল্পায়ন বলতে যা বোঝায় সেটা হয়নি। শিল্পায়ন ছাড়া এত বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। চীনের দিকে তাকালে এটা বুঝতে পারবেন। কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ সম্পর্কযুক্ত। মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানও করতে হবে। যেখানে গত ৫০ বছরে শিল্পায়ন হয়নি, কর্মের ব্যবস্থা হয়নি সেখানে মানবসম্পদ উন্নয়ন কী করে হবে? এখানে শাসকগোষ্ঠী উৎপাদনের মাধ্যমে সম্পদ সৃষ্টির পরিবর্তে বরং উৎপাদিত সম্পদ লুণ্ঠন করতেই আগ্রহী। সুতরাং সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার পরিকল্পিত কোনো উন্নতি এ দেশে হয়নি। বাংলাদেশের শিক্ষা বাজেট দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যেও জিডিপির অনুপাতে সবচেয়ে কম। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অন্তত এই দিকটায় নজর দিতে পারত। কিন্তু সে প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায়নি। বাজেট হয়েছে গতানুগতিক। এখানে কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
আওয়ামী লীগ প্রশ্নের সমাধান কী? সামনের দিনগুলোয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেখেন কি?
গত বছর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ইতিহাসে প্রথমবার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন করেছে। জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে আওয়ামী লীগকে প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রত্যাখ্যানের এ প্রক্রিয়া অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। চব্বিশে এসে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেল। জনগণের মনোভূমিতে আওয়ামী লীগের আর কোনো অস্তিত্ব রইল না। মনোভূমির দখল হারিয়ে আওয়ামী লীগের গুণ্ডা বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী যৌথভাবে জনগণের ওপর বর্বরোচিত আক্রমণ চালাল। স্বাধীনতার পর জনগণের ওপর এমন আক্রমণ আর হয়নি। এসবই হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। এর দায়ভার আওয়ামী লীগকে নিতেই হবে। এর আগে আওয়ামী শাসনের দেড় দশকে এবং অতীতেও বিভিন্ন সময় জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন নির্যাতন হয়েছে, যার বিচার জনগণ পায়নি। এবার আমাদের দাবি জনগণের ওপর চালানো অতীতের সব হত্যা-নির্যাতন ও বে-ইনসাফির বিচার করতে হবে। আমাদের জনগণ ঐতিহাসিকভাবে বে-ইনসাফির শিকার। সব বে-ইনসাফির বিচারের পথ খুলে যাবে যদি আওয়ামী লীগের বিচার হয়। সুতরাং আওয়ামী লীগ ফিরতে পারবে কি পারবে না সেটা নিয়ে কথা না বলে, বিচার কীভাবে হবে সেটা নিয়ে কথা বলা উচিত।
এখানে আরো বলা দরকার, বিচার ও ন্যায়বিচার কোনোটাই যখন হয় না তখন সুযোগ পেলেই দেশে মব সৃষ্টি হয়, গণপিটুনি শব্দটি এ দেশে নতুন নয়। এখন এটাই হচ্ছে—এর কোনোটা স্বতঃস্ফূর্ত, কোনোটা পরিকল্পিত। এক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা সীমাহীন। ইনসাফ বা ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার একটা অন্তঃস্রোত আমাদের সমাজে সবসময়ই ছিল এবং আছে। লোকজন মনে করছে যে তারা বিচার পাচ্ছে না। একটা ঐতিহাসিক বঞ্চনাবোধ সমাজে বিদ্যমান। এর মীমাংসা করতেই হবে। এজন্য বিচারটা যথাযথভাবে করতে হবে। ঐতিহাসিক অবিচারের ঐতিহাসিক বিচার সম্পন্ন করতে হবে।
ঐকমত্য কমিশনের সংস্কারগুলো বাংলাদেশে রাজনীতিতে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কী ধরনের ভূমিকা রাখবে? এ বিষয়ে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই।
বিদ্যমানকে অস্বীকার করে সংস্কার হয় না। সংস্কার যখন করতে চাচ্ছেন তখন ধরেই নেয়া যায় বিদ্যমানকে মেনে নিয়েই পরিবর্তন চাওয়া হচ্ছে। এটা বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন হবে না। একটা উদাহরণ দিই—প্রচলিত আইনের শেকড় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্যে। ঔপনিবেশিক শাসকদের কাছে জনগণ মানে উপনিবেশের জনগণ—নাগরিক নয়, হয় চাকর নয়তো শত্রু। তাদের তৈরি আইনের চোখেও তাই। বাংলাদেশে তো সেই ঔপনিবেশিক আইন ও বিচার ব্যবস্থাই চলছে। সুতরাং এ দেশের আইনে জনগণ মানে প্রকৃতপক্ষে উপনিবেশের জনগণ। আইন ও বিচার ব্যবস্থা তাই জনগণকে রিলিফ বা পরিত্রাণ দিচ্ছে না। জনগণ এখানে ক্ষমতাহীন। বাংলাদেশের জনগণ ঔপনিবেশিক কাল থেকে ঐতিহাসিক অবিচারের মুখোমুখি হয়ে আছে। জনগণ চান ইনসাফ বা ন্যায়বিচার। ইনসাফ বা ন্যায়বিচার চাইলে এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে হবে। সংস্কারের সীমাবদ্ধতা এখানেই যে তা বিদ্যমান ব্যবস্থা রেখেই তার সংস্কার করে। বর্তমানে যে সংস্কারের চেষ্টা হচ্ছে তা বাংলাদেশের মানুষকে বিরাট কিছু দিতে পারবে না। আমাদের দরকার গুণগত পরিবর্তন, বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সংস্কার হচ্ছে, এটা ভালো। কিন্তু তা আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর মর্মে তেমন কোনো পরিবর্তন আনতে পারবে না। এটা সাময়িক একটা স্বস্তি দেবে। কিন্তু আগামীতে আবারো দেশে গণ-অভ্যুত্থান ঘটবে। কেননা জনগণ যে মুক্তিটা চায় তা এ সংস্কারের মাধ্যমে মিলবে না। এজন্য দরকার রাষ্ট্রকাঠামোর বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
অভ্যুত্থানের পর নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কোন পথে যাচ্ছে? নয়া বন্দোবস্তের পথে চ্যালেঞ্জ কোথায়?
বন্দোবস্ত কথাটার মানেই হচ্ছে ঔপনিবেশিক কাঠামো যা আছে তা-ই থাকবে, শুধু এটা পরিচালনার বন্দোবস্ত কাউকে দেয়া। এই শব্দটাতে আটকে যাওয়া চলবে না। একটি ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দল উচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা তো আর উচ্ছেদ হয়নি। যাই হোক চ্যালেঞ্জ প্রশ্নে বলব, আগামীতে সরকারের জন্য গুরুতর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হলো ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। এটা না করা গেলে নৈরাজ্য দূর হবে না, শৃঙ্খলা ফিরবে না।










