হোম লোন দেয়ার ক্ষেত্রে আপনাদের প্রডাক্টগুলো কী? কত শতাংশ সুদে গ্রাহকরা ঋণ পাচ্ছেন?

হোম লোন খাতে আমাদের ব্যাংকের একাধিক প্রডাক্ট রয়েছে। এর আওতায় ফ্ল্যাট ক্রয়, নতুন বাড়ি নির্মাণ, বিদ্যমান বাড়ি মেরামতসহ আধা-পাকা টিনশেড ভবন নির্মাণে ঋণ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয় মূলত গ্রাহকের ঝুঁকি মূল্যায়নের ভিত্তিতে। গ্রাহকের আয়, পেশা, ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা, জামানতের মান এবং সামগ্রিক ক্রেডিট প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়। ঝুঁকি তুলনামূলক কম হলে সুদের হারও কম রাখা হয়, আর ঝুঁকি বেশি হলে সুদের হার কিছুটা বেশি নির্ধারিত হয়।

বর্তমানে আমাদের ব্যাংকে হোম লোনের সুদের হার সাধারণত সাড়ে ১২ থেকে সাড়ে ১৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা বাজার পরিস্থিতি ও গ্রাহকের ঝুঁকি প্রোফাইলের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়।

ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণের আবেদন করলে গ্রাহক সেটি কত দিনের মধ্যে পান?

ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা এবং ব্যাংকের নিজস্ব নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। এ কারণে আবেদন যাচাই, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে নির্দিষ্ট সময় প্রয়োজন হয়।

গ্রাহক যদি নির্ধারিত সব কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেন, তাহলে ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণের আবেদন সাধারণত ১২ কার্যদিবসের মধ্যেই অনুমোদন দেয়া হয়। এতে গ্রাহকরা তুলনামূলক কম সময়ে ঋণসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জানতে পারেন এবং তাদের আবাসন পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন।

পর্যাপ্ত জামানত থাকায় হোম লোন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। তার পরও দেশের ব্যাংকগুলো এ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহ বোধ করছে না কেন?

হোম লোন পর্যাপ্ত জামানতসমৃদ্ধ হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তাই ব্যাংকগুলো এ খাতে উৎসাহ বোধ করছে না—এমন ধারণা পুরোপুরি সঠিক নয়। বাস্তবে গৃহঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আমাদের ব্যাংক বিশেষভাবে আগ্রহী।

তবে এ ঋণ ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলকভাবে বেশি যাচাই-বাছাই ও কাগজপত্র পর্যালোচনা করতে হয়। বিশেষ করে জমির মালিকানাসংক্রান্ত দলিল, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নকশা ও সংশ্লিষ্ট আইনি বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হয়। এসব আনুষ্ঠানিকতা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় অনেক সময় গ্রাহকদের কাছে মনে হতে পারে ব্যাংকগুলো এ খাতে কম আগ্রহী।

আমাদের ব্যাংক গৃহ ঋণ প্রদানে যথেষ্ট আগ্রহী এবং এ খাতে কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। আগ্রহী গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করে দেশব্যাপী আমাদের যেকোনো শাখা বা উপশাখার সঙ্গে যোগাযোগ করলে গৃহ ঋণ সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন।

হোম লোনে আপনাদের খেলাপির হার কেমন? এক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহকরা বেশি খেলাপি হচ্ছেন?

হোম লোনে আমাদের ব্যাংকের খেলাপির হার খুবই কম, যা সামগ্রিক ব্যাংক খাতের তুলনায় সন্তোষজনক ও নিয়ন্ত্রণযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে পর্যাপ্ত জামানত ও সতর্ক ঝুঁকি মূল্যায়নের কারণে গৃহ ঋণ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে কাজ করছে।

খেলাপির ধরন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী শ্রেণীর গ্রাহকদের মধ্যে কিস্তি অনিয়মিত হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। মূলত ব্যবসায়িক মন্দা, আয় হ্রাস বা বাজার পরিস্থিতির অবনতির কারণে তারা সাময়িকভাবে কিস্তি পরিশোধে সমস্যায় পড়ছেন।

এছাড়া যেসব গ্রাহক বহুতল ভবন নির্মাণ করে ভাড়া দেয়ার উদ্দেশ্যে ঋণ নিয়েছেন, তাদের একটি অংশ প্রত্যাশিত ভাড়া আয় না পাওয়ায় আর্থিক চাপে পড়ছেন। তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়, এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের হোম লোন পোর্টফোলিও এখনো স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে এবং খেলাপির হার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

হোম লোনের সম্প্রসারণে কোনো নীতিগত প্রতিবন্ধকতা আছে কি?

হোম লোন সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে বড় কোনো নীতিগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে—এমনটি আমরা মনে করি না। বিদ্যমান নীতিমালার মধ্যেই গৃহ ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

তবে বাস্তব ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। অনেক সময় সম্ভাব্য গ্রাহকরা বিল্ডিং কোড ও অনুমোদিত নকশা অনুসরণ না করে ভবন নির্মাণ করেন, যা ঋণ মূল্যায়নের সময় সমস্যা সৃষ্টি করে। আবার ভাড়াভিত্তিক প্রকল্পের ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রত্যাশিত ভাড়া আয় এবং ব্যাংকের ঝুঁকি মূল্যায়নের হিসাব অনেক সময় একসঙ্গে মেলে না।

তবে এসব বিষয় মূলত নীতিগত নয়; বরং নিয়ম ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাস্তবগত চ্যালেঞ্জ, যেগুলো সঠিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিশ্চিত করলে সহজেই অতিক্রম করা সম্ভব।

আবাসন কোম্পানিগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে?

হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে আবাসন কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে বেশির ভাগ কোম্পানি প্রধান শহরগুলোতে প্রকল্প গ্রহণ করছেন, কারণ এখানে চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি।

তবে শহরের কাছাকাছি এলাকার দিকে প্রকল্প সম্প্রসারণ করলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর আরো বেশি মানুষ সহজেই গৃহঋণের সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে। এর ফলে হোম লোনের বাজার দেশের বিভিন্ন স্তরে প্রসারিত হতে পারবে এবং গৃহঋণ কার্যক্রম আরো সক্রিয় হবে।

সংগত কারণেই আবাসন নির্মাণে বিল্ডিং কোড এবং অনুমোদিত নকশা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। এটি না মানলে ঋণ মূল্যায়ন কঠিন হয় এবং গ্রাহক সুবিধা গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে। তাই হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণে কোম্পানিগুলোর দিকনির্দেশনা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অপরিহার্য।