কেন্দ্রীয় ব্যাংক গৃহঋণের সর্বোচ্চ সীমা ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকায় উন্নীত করেছে। আপনার মতে, এ সিদ্ধান্ত আবাসন ও ব্যাংক খাতে কী ধরনের বাস্তব প্রভাব ফেলবে?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ২ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্তটি আবাসন ও ব্যাংক খাতের জন্য একটি সময়োপযোগী ও ইতিবাচক পদক্ষেপ। এর ফলে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর গ্রাহকদের জন্য নগর ও উপশহর এলাকায় আবাসন বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং মানসম্মত আবাসন প্রকল্পে চাহিদা বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে এ সিদ্ধান্ত রিয়েল এস্টেট, নির্মাণসামগ্রী ও সংশ্লিষ্ট সেবা খাতকে গতিশীল করবে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে এ সুবিধা কার্যকর ও টেকসই করতে হলে ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা যাচাই এবং নিয়ন্ত্রক পরিপালন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির সঙ্গে আর্থিক স্থিতিশীলতাও বজায় থাকে।
পর্যাপ্ত জামানত থাকা সত্ত্বেও গৃহঋণকে কেন এখনো ব্যাংকগুলোর কাছে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো কী?
হোম লোন সাধারণত স্থাবর সম্পত্তির বিপরীতে প্রদান করা হয়। এ কারণে এটি তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশের বড় একটি অংশের মানুষের এখনো নিজস্ব আবাসন নেই। নগরায়ণের ফলে আবাসনের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে আবাসন খাতে বিপুল সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। তবে হোম লোন দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হওয়ায় ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা, সুদহার ওঠানামাজনিত ঝুঁকি এবং সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে কাজ করে। একই সঙ্গে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের চাপ, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং জামানত পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে অনেক ব্যাংক এ খাতে তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করে। এর পরও যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক পরিপালন এবং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিচালিত হলে হোম লোন খাতকে একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক বিনিয়োগ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
গৃহঋণ খাতে বর্তমানে আপনাদের কী ধরনের ঋণ সুবিধা চালু রয়েছে?
মিডল্যান্ড ব্যাংক বাংলাদেশের হোম লোন কার্যক্রম মূলত দায়িত্বশীল ঋণ বিতরণ, নিয়ন্ত্রক পরিপালন এবং গ্রাহকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকটির প্রধান হোম ফাইন্যান্সিং পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘এমডিবি হোম লোন’, শরিয়াহভিত্তিক ‘এমডিবি সালাম হোম ফাইন্যান্স’, যা ফ্ল্যাট ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, রিনোভেশন ও এক্সটেনশনের জন্য ব্যবহৃত হয়। পাশাপাশি আধা-শহর ও গ্রামাঞ্চলের গ্রাহকদের জন্য ‘এমডিবি আমার বাড়ি’ এবং প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য ‘এমডিবি রেমিট্যান্স হোম লোন’ (কনভেনশনাল ও ইসলামী উভয়) প্রডাক্ট চালু রয়েছে। এসব পণ্য গ্রাহকের আয়, পেশা, ঋণের উদ্দেশ্য ও মেয়াদ অনুযায়ী কাঠামোবদ্ধভাবে নকশা করা হয়েছে।
ফ্ল্যাট কেনা বা বাড়ি নির্মাণের জন্য ঋণের আবেদন করলে যাচাই-বাছাই থেকে অর্থছাড় পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে সাধারণত কত সময় লাগে?
ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণের জন্য হোম লোনের আবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই, প্রকল্প মূল্যায়ন এবং গ্রাহকের ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট সম্পন্ন করার পর সবকিছু যদি ঠিক থাকে সাধারণত ২০-৩০ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়। মিডল্যান্ড ব্যাংক প্রক্রিয়াটিকে সময়োপযোগী ও স্বচ্ছ রাখার পাশাপাশি দ্রুত প্রক্রিয়াকরণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়।
এ ঋণগুলো কত দীর্ঘমেয়াদে দেয়া হয় এবং সুদের হার নির্ধারণে ব্যাংক স্থির হার নাকি বাজারভিত্তিক ভাসমান হার অনুসরণ করছে?
প্রডাক্টভেদে ঋণের মেয়াদ ভিন্ন হয়। মিডল্যান্ড ব্যাংকের হোম লোনের মেয়াদ সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত আর এমডিবি আমার বাড়ির জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছরের মেয়াদে নির্ধারণ করা হয়। এ ঋণগুলো একই সঙ্গে গ্রাহকের বয়স ও আয়ের সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই ঠিক করা হয়। সুদের হার বাজারভিত্তিক ও ভাসমান হলেও বর্তমানে মিডল্যান্ড ব্যাংক, প্রডাক্ট ও গ্রাহকের প্রোফাইলভেদে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ১০ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ হারে হোম লোন সুবিধা প্রদান করছে; যেখানে স্বচ্ছতা, যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং পরিশোধ সক্ষমতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়।
গৃহঋণ বাজার সম্প্রসারণে বর্তমানে কোনো নীতিগত সীমাবদ্ধতা, নিয়ন্ত্রক বাধা বা কাঠামোগত সমস্যা আছে কিনা?
হোম লোন সম্প্রসারণে মৌলিকভাবে কোনো বড় ধরনের নীতিগত প্রতিবন্ধকতা নেই; বরং বিদ্যমান নিয়ন্ত্রক কাঠামো খাতটির সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাটাই জরুরি। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত খেলাপি ঋণ সীমা, ৭০:৩০ ঋণ-ইকুইটি অনুপাত, মূলধন পর্যাপ্ততার হার এবং সম্পদ-দায় ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নির্দেশনা ব্যাংকগুলোর জন্য কিছু বাস্তবিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। এসব নীতিমালা মূলত অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ রোধ এবং দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয়। ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, তারল্য পরিস্থিতির উন্নতি এবং সুদহার ব্যবস্থাপনায় অধিক স্থিতিশীলতা এলে হোম লোন খাত আরো পরিকল্পিত ও টেকসইভাবে সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।










