দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার মাঝে আবাসন খাতের ব্যবসা পরিস্থিতি কেমন যাচ্ছে?

সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে আবাসন খাতের ব্যবসার অবস্থা খুব ভালো বলা যাবে না। গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে যে চাপ তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব সরাসরি এ খাতে এসে পড়েছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার, মানুষের ব্যয়ক্ষমতা কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে বাজারে একটা স্থবিরতা কাজ করছে। অনেক ক্রেতাই এখন সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছেন, কেউ কেউ আবার পুরোপুরি অপেক্ষার নীতিতে চলে গেছেন। তবে আমি পুরোপুরি হতাশ নই। আমার বিশ্বাস, এ পরিস্থিতি স্থায়ী হবে না। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলে এবং মানুষের আস্থা ফিরলে আবাসন খাতেও গতি আসবে। আশা করছি, দ্রুতই অবস্থার আরো উন্নতি হবে।

এ সামগ্রিক পরিস্থিতির মধ্যে আপনার কোম্পানির ব্যবসা কেমন চলছে?

আমাদের কোম্পানির ব্যবসার অবস্থা খুব খারাপ বলা যাবে না। অবশ্যই সামগ্রিক বাজারের চাপ আমাদের ওপরও পড়েছে, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে একই সঙ্গে এটা বলতে হবে, আবাসন খাতের ব্যবসা আরো ভালো করার যে সুযোগ ছিল, সেই জায়গায় আমরা পুরোপুরি যেতে পারিনি। মূলত বাজার পরিস্থিতিই এর পেছনের মূল কারণ। তার পরও আমাদের একটি বড় শক্তি হলো আমাদের ব্র্যান্ড। দীর্ঘদিন ধরে আমরা বাজারে কাজ করছি, গ্রাহকদের সঙ্গে আমাদের বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এই ব্র্যান্ড ইমেজ ও বিশ্বাসযোগ্যতার কারণেই কঠিন সময়েও আমাদের ব্যবসা তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে। অনেক গ্রাহক আছেন, যারা শুধু প্রতিষ্ঠানের নাম ও কাজের মানের ওপর ভরসা করেই সিদ্ধান্ত নেন।

ফ্ল্যাট কেনাবেচায় স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে আপনি মনে করেন?

আমার মতে, এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সুদহার। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি হোম লোনের সুদহার এক অংকে নামিয়ে আনতে পারে, তাহলে ফ্ল্যাট বিক্রি এবং হোম লোন—দুটিই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। সুদহার কম হলে গ্রাহকদের মাসিক কিস্তির চাপ কমে, ফলে তারা সিদ্ধান্ত নিতে বেশি আত্মবিশ্বাসী হন। পাশাপাশি ঋণ প্রক্রিয়াটাও আরো সহজ ও সময় সাশ্রয়ী হওয়া দরকার। সম্প্রতি ব্যাংক ঋণের সীমা ৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, এটাকে আমি একটি ভালো উদ্যোগ হিসেবে দেখি। এতে করে তুলনামূলক বড় ও ভালো প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। তবে শুধু ঋণসীমা বাড়ালেই যথেষ্ট নয়। সুদহার, শর্ত ও প্রক্রিয়া—সব বিষয় একসঙ্গে গ্রাহকবান্ধব না হলে আবাসন খাতে কাঙ্ক্ষিত গতি আসবে না।

আবাসন খাতের গ্রাহকরা কতটা ব্যাংক ঋণ নিচ্ছেন?

গ্রাহকরা ব্যাংক ঋণ মোটামুটি ভালোভাবেই নিচ্ছেন। যদিও সুদহার বেশি থাকায় অনেকেই ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে দ্বিধায় থাকেন, তার পরও বাস্তব প্রয়োজনে ব্যাংক ঋণ ছাড়া অধিকাংশ মানুষের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব নয়। এখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের একটি সুবিধার কথা বলতে হয়। আমরা ব্যাংকগুলোর কাছে ‘এ’ ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত। এর মানে হলো, আমাদের প্রকল্প, কাগজপত্র ও আর্থিক অবস্থার ওপর ব্যাংকগুলোর আস্থা আছে। ফলে গ্রাহকরা আমাদের প্রকল্প থেকে ফ্ল্যাট কিনলে তুলনামূলকভাবে সহজে ব্যাংক ঋণ পাচ্ছেন। এই বিষয়টি বিক্রির ক্ষেত্রে আমাদের জন্য একটি বড় ইতিবাচক দিক।

আকারভেদে কোন ধরনের ফ্ল্যাট এখন বেশি বিক্রি হচ্ছে?

বাস্তবতা হলো, মাঝারি শ্রেণীর ফ্ল্যাটের চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে এবং এখনো সেটাই দেখা যাচ্ছে। আমাদের দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অনুযায়ী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই বেশি। তাদের আয় ও সামর্থ্যের সঙ্গে মাঝারি আকারের ফ্ল্যাট সবচেয়ে বেশি মানানসই। তাই এ শ্রেণীর ফ্ল্যাটের বিক্রি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে। তবে পাশাপাশি এটাও সত্য যে ভালো স্থানে অবস্থিত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটেরও একটি নির্দিষ্ট চাহিদা আছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কথা ভাবেন বা মানসম্পন্ন জীবনযাপনের দিকে গুরুত্ব দেন, তারা বড় ও দামি ফ্ল্যাটের দিকেও ঝুঁকছেন। অর্থাৎ বাজার পুরোপুরি একমুখী নয়।

ব্যাংক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে গ্রাহকরা সাধারণত কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছেন?

ব্যাংক ঋণ পাওয়ার বিষয়টি আসলে অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। এখানে দুটি পথই পরিষ্কার থাকতে হয়। একদিকে গ্রাহকের নিজস্ব বিষয়গুলো—যেমন তার নিয়মিত আয়ের উৎস আছে কিনা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট কেমন, সিআইবি রিপোর্ট ঠিক আছে কিনা—এসব বিষয় ব্যাংক খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখে। অন্যদিকে ডেভেলপারের দিক থেকেও সব কাগজপত্র ঠিক থাকতে হয়। জমির মালিকানা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রকল্পের আইনি দিক—সবকিছু স্বচ্ছ না হলে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে আগ্রহী হয় না। এই দুই দিকের যেকোনো একটিতে সমস্যা থাকলে গ্রাহককে নানা জটিলতার মুখে পড়তে হয়। অনেক সময় ঋণ অনুমোদনে দেরি হয়, আবার কখনো পুরো প্রক্রিয়াটাই আটকে যায়।