সিটিজেনস ব্যাংক আবাসন খাতে কী ধরনের ঋণ বিতরণ করছে?
ব্যক্তি পর্যায়ে হোম লোন সেগমেন্টে আমাদের ব্যাংক বর্তমানে দুটি পৃথক প্রডাক্টের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা দিয়ে থাকে। এগুলো হলো সিটিজেনস আবাসন ও সিটিজেনস আশ্রয়ণ। সিটিজেনস আবাসন সুবিধা মূলত ভবন নির্মাণ এবং প্রস্তুত ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য প্রদান করা হয়। অন্যদিকে সিটিজেনস আশ্রয়ণ ঋণটি সেমি-পাকা বাড়ি নির্মাণের উদ্দেশ্যে দেয়া হয়; যা মূলত গ্রামীণ বা আধা-শহরাঞ্চলের গ্রাহকদের জন্য উপযোগী। এসব ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে হোম লোনে বর্তমানে গড় সুদের হার প্রায় ১৪ শতাংশের কাছাকাছি।
ঋণ প্রক্রিয়াকরণে সুদহার কীভাবে নির্ধারিত হয় এবং এক্ষেত্রে কতদিন পর্যন্ত সময় লাগে?
ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান গাইডলাইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত হোম লোন সুবিধা দেয়া যায়। তবে বাস্তবে ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ঋণগ্রহীতার বয়স, আয় ও পরিশোধ সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার নির্ধারিত নয়; বরং এটি ভাসমান সুদহারের আওতায় পড়ে, যা বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী ওঠানামা করে। আর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিকভাবে জমা দেয়া হলে এবং যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনো জটিলতা না থাকলে হোম লোনের আবেদন নিষ্পত্তি করতে সাধারণত ৭-১৫ কর্মদিবস সময় লাগে। এ সময়ের মধ্যেই ঋণ অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
বাজারভিত্তিক সুদহার গ্রাহকদের ওপর অনেক সময় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সিটিজেনস ব্যাংক বিষয়টি কীভাবে সমন্বয় করে?
বাজারভিত্তিক ভাসমান সুদহারের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই কখনো কখনো গ্রাহকদের তুলনামূলক বেশি সুদ দিতে হয়, আবার অনেক সময় কম সুদও পরিশোধ করতে হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দিষ্ট সুদের হারের তুলনায় বাজারভিত্তিক সুদহার গ্রাহকদের জন্য অধিক উপযোগী। পাশাপাশি গৃহ ঋণ সম্পূর্ণভাবে জামানত দ্বারা সুরক্ষিত। এ খাতে ব্যাংকগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পেলে অন্যান্য অনেক ঋণের তুলনায় হোম লোনের সুদের হার আরো কমবে।
পর্যাপ্ত জামানত থাকায় হোম লোন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। তার পরও দেশের ব্যাংকগুলো এ ঋণ দিতে কেন অনেক সময় নিরুৎসাহ বোধ করে?
সাধারণভাবে পর্যাপ্ত জামানত থাকায় ব্যাংকগুলো হোম লোন দিতে আগ্রহী থাকে। তবে বাস্তবে কিছু বিষয় ব্যাংকগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। অনেক ক্ষেত্রে জমির কাগজপত্রের চেইন অব ডকুমেন্টে অস্পষ্টতা বা ঘাটতি থাকে। আবার কোথাও বিল্ডিং প্ল্যান অনুমোদন-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা যায়। এছাড়া কিছু গ্রাহকের নিয়মিত ক্যাশ ফ্লো বা আয় প্রবাহে অনিশ্চয়তা থাকলে ব্যাংক ঋণ প্রদানের বিষয়ে সতর্ক হয়ে পড়ে। এসব কারণেই কিছু ক্ষেত্রে হোম লোনে নিরুৎসাহ তৈরি হয়।
হোম লোনে আপনাদের খেলাপি ঋণের হার কেমন? এ ক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহক বেশি খেলাপি হচ্ছেন?
বর্তমানে আমাদের ব্যাংকের হোম লোন খাতে খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। খেলাপির হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তুলনামূলকভাবে ব্যবসায়ী শ্রেণীর গ্রাহকদের মধ্যেই খেলাপির প্রবণতা বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সম্প্রতি হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ২ থেকে বাড়িয়ে ৪ কোটি টাকা করেছে। এ সিদ্ধান্ত বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত হোম লোন বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আমরা মনে করি। সাম্প্রতিক সময়ে ফ্ল্যাটের মূল্য বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান ও লাইফস্টাইলে পরিবর্তনের কারণে ২ কোটি টাকার সীমা অনেক ক্ষেত্রেই অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছিল। এ সীমা ৪ কোটি টাকায় উন্নীত হওয়ায় রিয়েল এস্টেট খাত এবং রিটেইল ব্যাংকিং উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে গুলশান, ধানমন্ডি, বারিধারা, বসুন্ধরা এবং উত্তরা এলাকার আবাসন ব্যবসায় এর সুফল স্পষ্টভাবে দেখা যাবে। একই সঙ্গে গ্রাহকরা এখন আরো স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদের পছন্দমতো ফ্ল্যাট ক্রয়ের সুযোগ পাবেন।
আবাসন কোম্পানিগুলো কী ধরনের পদক্ষেপ নিলে হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে?
হোম লোনের বাজার সম্প্রসারণে আবাসন কোম্পানিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রথমত জমির কাগজপত্র সঠিকভাবে যাচাই করে ক্রেতাদের প্রয়োজনীয় সব ডকুমেন্টের নির্ভুল কপি সরবরাহ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষের নিয়মকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ করে বিল্ডিং নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ফ্ল্যাট বা ভবন হস্তান্তরের নিশ্চয়তা দেয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবসম্মত ও যুক্তিসংগত মূল্য নির্ধারণও বাজার সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। সর্বোপরি আবাসন কোম্পানিগুলো যদি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে হোম লোন প্রদানে সহযোগিতামূলক চুক্তি করে, তাহলে ক্রেতাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরো সহজ হবে এবং সামগ্রিকভাবে আবাসন ও হোম লোন বাজারে গতি আসবে।





