কমিউনিটি ব্যাংকের হোম লোন প্রডাক্ট কী কী? গ্রাহকরা কত শতাংশ সুদে ঋণ পাচ্ছেন এ প্রডাক্টে?
কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি সবসময় গ্রাহকবান্ধব সেবা দিয়ে আসছে। সে ধারাবাহিকতায় আবাসন খাতে একটি বিশেষ হাউজিং ফাইন্যান্স স্কিম ‘নীড়’ চালু করেছে এ ব্যাংক। এ স্কিমের আওতায় গ্রাহকরা নানা সুবিধা পান। প্রস্তুত, নির্মাণাধীন কিংবা সেকেন্ড হ্যান্ড আবাসিক ফ্ল্যাট ক্রয়, আবাসিক ভবন নির্মাণ, বাসা বা ফ্ল্যাটের সংস্কার ও পুনর্নির্মাণ ইত্যাদি ঋণ সুবিধা আছে গ্রাহকদের জন্য। এছাড়া আবাসন খাতে গ্রুপ হোম লোনও দিয়ে থাকে কমিউনিটি ব্যাংক। এ ঋণের আওতায় গ্রাহকরা বড় অংকের অর্থায়ন সুবিধা পান; যাতে একাধিক গ্রাহক যৌথভাবে বাড়ি কিনতে পারেন। আর বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা ও বাজারভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এ ঋণের সুদহার বার্ষিক ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ হারেই নির্ধারণ করেছি আমরা।
এ সুদহার কি নির্ধারিত নাকি ভাসমান? আর ফ্ল্যাট ক্রয় বা বাড়ি নির্মাণে ঋণের আবেদন করলে গ্রাহক সেটি কতদিনের মধ্যে পান?
কমিউনিটি ব্যাংক সবসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা কঠোরভাবে চর্চা করে। ফলে বাজার পরিস্থিতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রযোজ্য নীতিমালার আলোকে সময়ভেদে সুদহার সমন্বয় করা হয়। এছাড়া বাড়ি নির্মাণ বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের জন্য ঋণ আবেদন করার পর গ্রাহক প্রয়োজনীয় ও সঠিক লিগ্যাল ডকুমেন্টগুলো জমা দিলে সর্বোচ্চ ১০-১৫ কর্মদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদন ও অর্থছাড় সম্পন্ন হয়। সাধারণত হোম লোনের মেয়াদ ১৫-২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। গ্রাহকের আয়, বয়স ও ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী মেয়াদ নির্ধারণ হয়।
সুদহার বাজারদরের সঙ্গে ওঠানামা করলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ আছে। কমিউনিটি ব্যাংক এক্ষেত্রে কী করছে?
বাজারভিত্তিক সুদহার মূলত অর্থনীতির স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ কাঠামোরই একটি অংশ। এ ধরনের সুদহার দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সময় সময় সমন্বয় করা হয়। যার মধ্যে মুদ্রাস্ফীতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সুদহার, ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতি এবং সামগ্রিক বাজার বাস্তবতা অন্তর্ভুক্ত। স্বাভাবিকভাবেই নির্দিষ্ট কিছু সময়ে এর প্রভাব হিসেবে গ্রাহকের কিস্তি বা সুদের পরিমাণ সাময়িকভাবে বাড়তে পারে। তবে বিষয়টি সম্পূর্ণ একপক্ষীয় নয়। বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ও ভারসাম্য বজায় রাখে। সুদহার কমলে গ্রাহকরা সরাসরি তার সুফল ভোগ করেন। সবচেয়ে বড় বিষয় সুদহার বাড়লে আমরা গ্রাহকদের আগাম সতর্ক করি।
ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহককে অগ্রাধিকার দেয় কমিউনিটি ব্যাংক?
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হাউজিং ফাইন্যান্স নীতিমালা অনুযায়ী কোনো একক গ্রাহকের জন্য সর্বোচ্চ হোম লোন সীমা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হাউজিং লোন পোর্টফোলিওর গুণগত মানের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে মাত্র কিছু নির্বাচিত ব্যাংক যোগ্যতা ও পোর্টফোলিও মানদণ্ড পূরণ করায় সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত হোম লোন সুবিধা দিতে পারে। আমরাও তা-ই করছি। এক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের জন্য ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুসরণ করে নিয়মিত, স্থিতিশীল ও যাচাইযোগ্য আয়ের উৎসসম্পন্ন গ্রাহকদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়। এর আওতায় সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, প্রবাসী এবং আয় ধারাবাহিকতা ও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়িত অন্যান্য যোগ্য গ্রাহক বিবেচনায় নেয়া হয়।
পর্যাপ্ত জামানত থাকায় হোম লোন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বীকৃত। তার পরও দেশের ব্যাংকগুলো এ ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে উৎসাহবোধ করছে না কেন?
হোম লোন একটি নিরাপদ ও জামানতভিত্তিক ঋণ হিসেবে বিবেচিত হলেও বাস্তবতায় এটি ব্যাংকের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং একই সঙ্গে তারল্য ও বাজার সংবেদনশীল একটি পণ্য। সে কারণেই ব্যাংকগুলো এ খাতে আগ্রহী হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দায়িত্বশীল ও পরিমিত অবস্থান বজায় রাখে। এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব ও যৌক্তিক বিবেচনা কাজ করে। হোম লোনের মেয়াদ সাধারণত ১৫-২৫ বছর, অথচ ব্যাংকের আমানতের বড় অংশ স্বল্পমেয়াদি। এ সময়গত ব্যবধান ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। কোনো কারণে ঋণ নিয়মিত না হলে জামানত পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া সহজ বা দ্রুত নয়। আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে যেতে সময় লাগে, যা ঝুঁকি ও ব্যয়ের পরিমাণ উভয়ই বাড়িয়ে দেয়। আবার রিয়েল এস্টেট বাজার স্বভাবতই চক্রাকারে চলে। বাজারে মন্দা দেখা দিলে সম্পত্তির মূল্য প্রত্যাশার তুলনায় কমে যেতে পারে। এতে জামানতের প্রকৃত সুরক্ষা প্রভাবিত হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণীত ঋণসীমা, প্রভিশনিং, মূলধন পর্যাপ্ততা ও শ্রেণীকৃত ঋণসংক্রান্ত নীতিমালাও ব্যাংকের সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রক কাঠামো হিসেবে কাজ করে। এছাড়া হোম লোনে সুদহার তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় তহবিল সংগ্রহ ও পরিচালন ব্যয়ের বিপরীতে ব্যাংকের মুনাফার মার্জিন সীমিত থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। সব মিলিয়ে হোম লোন একটি নিরাপদ ঋণপণ্য হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রকৃতি, তারল্য চাপ, বাজার অনিশ্চয়তা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কারণে ব্যাংকগুলো এ খাতে অত্যন্ত সচেতন ও বাছাইকৃতভাবে অগ্রসর হয়।
হোম লোনে আপনাদের খেলাপির হার কেমন? এক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহকরা বেশি খেলাপি হচ্ছেন?
হোম লোন খাতে আমাদের পোর্টফোলিওটি অত্যন্ত স্থিতিশীল। এখন পর্যন্ত মোট বিতরণ হয়েছে প্রায় ২২০ কোটি টাকা। বর্তমান আউটস্ট্যান্ডিং ১২৮ কোটি ৪০ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাত্র ১ কোটি ৪ লাখ টাকা সাবস্টান্ডার্ড; যা বাজারের তুলনায় নগণ্য এবং সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। এ সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো কঠোর আয় যাচাই, বাস্তবসম্মত ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং শক্তিশালী জামানত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া। খেলাপি হওয়ার পেছনে মূলত ব্যবসা ও স্বনির্ভর আয়ের নগদ প্রবাহ অনিয়মিত হওয়া সময়বিশেষে তাদের কিস্তি ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়। এছাড়া কাগজপত্র বিলম্ব, হস্তান্তরজনিত জটিলতা কিংবা রিয়েল এস্টেট বাজারে স্থবিরতা সাময়িকভাবে পরিশোধ সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
হোম লোনের সম্প্রসারণে কোনো নীতিগত প্রতিবন্ধকতা আছে বলে মনে করেন কিনা?
আমাদের দেশে সমন্বিত নীতিমালার খুবই অভাব। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকায় ভূমি ব্যবহার, ভবনের উচ্চতা, ঘনত্ব ও অনুমোদনসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা প্রকল্প অনুমোদন এবং জামানত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে। ফ্ল্যাট বা জমি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রেজিস্ট্রেশন ও সংশ্লিষ্ট দলিল প্রক্রিয়ার ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় গ্রাহকের সার্বিক ব্যয়ও বাড়ে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে হোম লোন গ্রহণের সিদ্ধান্ত ও সামগ্রিক চাহিদা প্রভাবিত হয়। ভূমির মালিকানা যাচাই, নামজারি ও টাইটেল ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া দীর্ঘ এবং সময়সাপেক্ষ হওয়ায় সম্পত্তি মূল্যায়ন ও আইনগত যাচাই কার্যক্রমে বিলম্ব সৃষ্টি হয়। সবচেয়ে বড় বিষয় দেশে একটি সুসংগঠিত ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই হাউজিং পরিকল্পনা অনুপস্থিত থাকায় পরিবেশবান্ধব নির্মাণ, সবুজ অর্থায়ন এবং স্বল্পমেয়াদি-দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





