দেশে আবাসন খাতের ব্যবসার পরিস্থিতি এখন কেমন?

দেশের আবাসন খাতের সঙ্গে অনেক শিল্প ও ব্যবসা খাত জড়িত। আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষ নগরমুখী। শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে এর চাহিদাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা, স্বল্পমেয়াদি সরকার এবং নির্বাচনকালীন রাজনীতির কারণে এ খাতের অধিকাংশ ক্রেতাই তাদের সঞ্চিত অর্থের বিনিয়োগ নিয়ে খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত এবং সুস্থির সময়ের জন্য অপেক্ষা করছেন। ফলে সাধারণভাবে এ ব্যবসায় কিছুটা মন্দা ভাব দেখা যাচ্ছে এবং ফ্ল্যাটের ক্রয়-বিক্রয় বেশ হ্রাস পেয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ঢাকাসহ বড় শহরে ছোট-মাঝারি ফ্ল্যাট বিক্রি প্রায় ২০-২৫ শতাংশ কমেছে এবং বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অস্থিতিশীলতার কারণে পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ, অনুমোদন, সংশোধন ইত্যাদি জটিল ও অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় নির্মাণকারীরা আর আগের মতো নতুন প্রকল্প বাজারে আনতে পারছেন না। অপরদিকে এ সাময়িক মন্দার কারণে ফ্ল্যাটের দাম গত দেড় বছর যাবত মোটামুটি স্থিতিশীল। তাই বিচক্ষণ বিনিয়োগকারীরা এ সময়েই ফ্ল্যাট বুকিং বা ক্রয় করছেন। এক্ষেত্রে যেসব প্রকল্পে ডেভেলপাররা নির্মাণকাজের গতি ও মান বজায় রাখতে পারছেন, তাদের বিক্রয় পরিস্থিতি এ সময়েও সন্তোষজনক।

আপনার কোম্পানির ব্যবসা কেমন চলছে?

এবিসি ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আবাসন-নির্মাণ প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ এ পথচলায় আমরা নির্মাণের গুণগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি সঠিক সময়ে হস্তান্তর এবং রেজিস্ট্রি সম্পন্ন করার একটি ট্র্যাক রেকর্ড তৈরি করেছি। দায়িত্বশীল অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সব প্রকল্পে নির্মাণকাজ পুরোদমে চালিয়ে যাওয়ার কারণে এ ধারাটি এ সময়েও অব্যাহত রাখতে পেরেছি আমরা। নতুন ক্রেতাদের মধ্যে বিনিয়োগ নিয়ে এক ধরনের দ্বিধা লক্ষ করছি, তাদেরকে কেবল প্রকল্পের নিরবচ্ছিন্ন গতি দিয়েই আশ্বস্ত করা সম্ভব এবং আমরা সে চেষ্টাই করে যাচ্ছি। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা টেকসই ও আধুনিক আবাসন সমাধান প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

বর্তমান বাজারে কোন শ্রেণীর ফ্ল্যাট বেশি বিক্রি হচ্ছে?

বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটের চাহিদা ও বিক্রি তুলনামূলকভাবে বেশি। মূল্য, অবস্থান ও ব্যবহারিক দিক বিবেচনায় এ শ্রেণীর ফ্ল্যাটগুলো মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের জন্য সবচেয়ে উপযোগী হওয়ায় বাজারে এগুলোর গ্রহণযোগ্যতা স্থিতিশীল রয়েছে। মূল ক্রেতার পাশাপাশি বিনিয়োগকারীরাও মাঝারি আকারের ফ্ল্যাটগুলোর ব্যাপারে বেশ আগ্রহী। আমরা সাধারণত খুব ছোট আকারের ফ্ল্যাট নির্মাণ করি না। তবে এ শ্রেণীতে সীমিত পরিসরে চাহিদা আছে। বিপরীতে বড় আকারের ফ্ল্যাটের বিক্রি তুলনামূলকভাবে শ্লথ হয়ে গেছে। মূলত উচ্চ মূল্য ও আর্থিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্রেতাদের বিলম্বিত সিদ্ধান্তের কারণেই এ ধীরগতি। ফ্ল্যাট বিক্রির বর্তমান বাজারে মাঝারি আকারের ফ্ল্যাট প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ, ছোট আকারের ফ্ল্যাট প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ এবং বড় আকারের ফ্ল্যাট প্রায় ১০-১৫ শতাংশ করে বিক্রি হচ্ছে।

তবে লাইফ স্টাইলের সুবিধা পাওয়ার জন্য সম্প্রতি কন্ডোমনিয়াম প্রজেক্টের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এবিসি রিয়েল এস্টেট এরই মধ্যে গেটেড কমিউনিটি বা বৃহৎ কন্ডোমিনিয়াম প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য দক্ষতা ও সফলতা অর্জন করায় ক্রেতাদের মধ্যে আশ্বস্ততা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। ফলে এ অস্থির সময়েও মগবাজারে এবিসির দ্য অর্চার্ড অ্যাট ইস্পাহানি কলোনি প্রকল্পে ফ্ল্যাট বিক্রি সবচেয়ে সন্তোষজনক এবং সে কারণে প্রকল্পটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নির্মিত হচ্ছে।

ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে গ্রাহকরা ব্যাংক ঋণ কেমন নিচ্ছেন? এক্ষেত্রে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা দেখছেন?

বর্তমান আবাসন বাজারে ছোট, মাঝারি, বড় আকারের সব ফ্ল্যাটের ক্রেতারা ব্যাংক ঋণ ব্যবহার করছেন; যা দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি ও সুসংগঠিত অর্থায়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ শ্রেণীর ফ্ল্যাট ক্রেতারা ঋণ গ্রহণের সুবিধা কাজে লাগিয়ে ফ্ল্যাট ক্রয় সহজভাবে সম্পন্ন করছেন। ফলে বিক্রি স্থিতিশীল এবং বাজারে চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি।

বর্তমান সময়ে হোম লোনের সুদহার তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় অনেক গ্রাহক ঋণ গ্রহণে দ্বিধাবোধ করছেন। বিশেষ করে বড় বা বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে সুদের কারণে মাসিক কিস্তি ও মোট পরিশোধ বাড়ছে। এছাড়া মধ্যবিত্ত অনেক গ্রাহকই নগদ অংশের (ডাউন পেমেন্ট) জন্য পর্যাপ্ত তহবিল চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন। এছাড়া নথিসংক্রান্ত জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় ও নিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে গ্রাহকরা ঋণ গ্রহণে ঝুঁকি নেন না।

ফ্ল্যাট কেনাবেচায় স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ পাওয়া নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে মনে করেন আপনি?

ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ নিশ্চিত করতে বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যাংক ও আবাসন খাতের মধ্যে সমন্বয় করে কৌশলগত অংশীদারত্ব তৈরি করা; যাতে ঋণ প্রক্রিয়া দ্রুত, স্বচ্ছ ও গ্রাহকবান্ধব করা যায়। এছাড়া ক্রেতার শ্রেণী অনুযায়ী হোম লোন প্যাকেজেও বৈচিত্র্য আনা দরকার। সরকারের দিক থেকে কর সুবিধা, লভ্যাংশ ছাড় বা ভর্তুকিমূলক সুদহার প্রদান করে হোম লোন গ্রহণ সহজ করা যেতে পারে। এর বাইরে আবেদনপত্র, যাচাই, অনুমোদন এবং কিস্তি ব্যবস্থাপনার জন্য ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করলে ঋণ গ্রহণের জটিলতা অনেকটাই কমে যাবে।

নীতিগত জায়গা থেকে কী ধরনের পদক্ষেপ আশা করেন?

আবাসন খাতে স্বল্প সুদ ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অগ্রণী ভূমিকা পালন করা দরকার। সঞ্চয়পত্র, বন্ড, ট্রেজারি বিল ইত্যাদির ক্ষেত্রে প্রদত্ত সুদহার বেশি থাকায় সাধারণ মানুষ বাণিজ্যিক ব্যাংকে আমানত জমার পরিবর্তে এসব সরকারি খাতে জমা রাখে। এতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো অধিক সুদহারে ঋণ বিতরণ করতে বাধ্য হয়। হোম লোনের সুদহার কমাতে এ-জাতীয় সরকারি আমানতের বিপরীতে প্রদত্ত সুদহার কমানো দরকার।

আবাসন যেহেতু মানুষের মৌলিক চাহিদা। তাই সরকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করে তা স্বল্প সুদে ফ্ল্যাট কেনায় সুবিধা দিতে পারে। বিশেষত ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে এ তহবিল থেকে ঋণ দেয়া উচিত। আবাসন খাতে ঋণের হার খুবই কম। তাই বাংলাদেশ ব্যাংক তার জমাকৃত টাকা থেকে ব্যাংক সুদে এ খাতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা ঋণ দিতে পারে। এক্ষেত্রে ঋণ সহজীকরণের জন্য দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। সহজে গ্রাহকের যোগ্যতা নির্ণয় করতে ঋণগ্রহীতার সিআইবি রিপোর্ট এবং তার আয়ের বিপরীতে প্রদত্ত ঋণের পরিমাপ করতে একটি কার্যকরী সফটওয়্যার তৈরি করা যেতে পারে। এছাড়া প্রকল্প অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ যদি প্রকল্পের আইনগত বৈধতা নির্ণয় করে দেয়, তাহলে ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের এ-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন হয়ে আসবে।