ঢাকার ওপর চাপ কমাতে উপশহর ও নতুন নগর গড়ার উদ্যোগ নিলেও তা আলোর মুখ দেখছে না কেন?
উপশহর ও নতুন নগর গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। রাজউক কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে রাজধানীর উপকণ্ঠে নতুন শহর ও উপশহর তৈরি করা হয়েছে। উত্তরা, পূর্বাচল নতুন শহরসহ রাজউকের গুলশান, বনানী একসময় শহরের প্রান্তসীমায় হলেও তা একসময় শহরের বর্ধিতকরণ ও আবাসনে ভূমিকা রেখেছে। এখানে শুধু রাজউক নয়, যোগাযোগ, ইউটিলিটি, কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগ সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন। তবে আগের প্রচলিত উপশহর বা নতুন শহরের ধারণা মূলত জমি অধিগ্রহণনির্ভর এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে নির্মাণ উপযোগী অকৃষি খালি জায়গা প্রয়োজন। ঢাকা শহরের বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশ ও প্রতিবেশ রক্ষা করে, কৃষিজমি ও বন্যাপ্রবাহ এলাকা সংরক্ষণ করে এমন উপশহর, নতুন শহর নির্মাণ উপযোগী স্থান দুর্লভ। তাই সরকার এ ধরনের জমি অধিগ্রহণনির্ভর প্রকল্পের পরিবর্তে আরবান রিডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিজেনারেশন প্রকল্পের মাধ্যমে নগর উন্নয়নকে অধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করে আমরা প্রকল্পগুলোকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের দিকে নিয়ে যাচ্ছি।
পুরান ঢাকার জরাজীর্ণ এলাকাগুলোতে ‘আরবান রিজেনারেশন’ প্রকল্পের মাধ্যমে জনঘনত্ব কমিয়ে আধুনিক আবাসন নিশ্চিত করতে ভূমি মালিকদের ভূমি অধিগ্রহণ না করে ‘ল্যান্ড শেয়ারিং’ মডেলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে রাজউকের আইনি কাঠামো কতটা প্রস্তুত?
ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়াই উন্নয়নের জন্য ‘ল্যান্ড শেয়ারিং’ একটি সময়োপযোগী ধারণা। রাজউক এরই মধ্যে তার নতুন অধ্যাদেশ অর্থাৎ ‘রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এ একাধিক ধারা সংযোজন করে এর মূল আইনি কাঠামো তৈরি করেছে। এছাড়া রাজউক এরই মধ্যে ভূমি পুনরুন্নয়ন ও পুনর্বিন্যাসসংক্রান্ত বিধিমালা ও নির্দেশিকা প্রস্তুতের কাজে হাত দিয়েছে এবং এ-সম্পর্কিত পাইলট প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, যাতে মালিকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রেখেই আধুনিক ও নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা যায়।
আবাসন খাতের ব্যবসায়ীরা এখনো বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ নিয়ে আপত্তি জানাচ্ছেন। পরিবেশ রক্ষা এবং ঢাকার আবাসন সংকট দুটো কি একসঙ্গে করার বাস্তবসম্মত কোনো উপায় আছে?
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) কোনো উন্নয়নবিরোধী দলিল নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের গাইডলাইন। আবাসন ও পরিবেশ দুটোকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। ড্যাপের ভেতরেই আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী ফ্লেক্সিবিলিটি রাখার চেষ্টা করছি, যাতে যৌক্তিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত না হয়। সাম্প্রতিক সংশোধিত ড্যাপে যেসব পরিবর্তন ও পরিবর্ধন আপনারা দেখছেন সেসব সিদ্ধান্ত আবাসন খাতের ব্যবসায়ীসহ অন্য সব স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে একাধিক সভা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমেই নেয়া হয়েছে।
ঢাকার আবাসন সংকটকে এখনো কি রাজউক শুধুই ফ্ল্যাটের ঘাটতি হিসেবে বিবেচনা করছে, নাকি হোম লোনের শর্ত, আয়ের বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি সক্ষমতাকে মাথায় রেখে ‘অ্যাফোর্ডেবল হাউজিং’কে আলাদা নীতিগত ক্যাটাগরি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করার সময় এসেছে?
আবাসন সংকট এখন শুধু আবাসন ইউনিট সংখ্যায় নয়, বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। রাজউক সাশ্রয়ী আবাসনকে আলাদাভাবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে বিভিন্ন নীতিমালা নির্দেশিকা তৈরি করছে, যেখানে আয়, হোম লোন সক্ষমতা ও কিস্তি কাঠামো সবকিছুই গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে আবাসন সংকট নিরসনে অন্য কোনো টেকসই বিকল্প নেই। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি সুবিধাসহ হোম লোন সরবরাহ করা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সরকারি দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি সুবিধার ফ্ল্যাট সরবরাহ করলে তা সহজেই নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের পক্ষে অ্যাফোর্ড করা সম্ভব, যা সবার জন্য আবাসনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিদ্যমান আবাসন সংকট মোকাবেলায় প্রাইভেট ডেভেলপার ও সরকারি জমির ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ মডেলের মাধ্যমে সাশ্রয়ী আবাসন তৈরি সম্ভব?
সরকারি জমি ব্যবহার করে এবং অবকাঠামো ব্যয় কমিয়ে আনতে পারলে ‘পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ’ মডেলে স্বল্প মূল্যের আবাসন নিশ্চিত সম্ভব। তবে এটি একদিনে নয় ধাপে ধাপে এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জন্য টার্গেটে নিয়ে করতে হবে।
সাশ্রয়ী মূল্যে আবাসন নির্মাণের শর্তে যদি ডেভেলপারদের ‘ট্যাক্স ইনসেন্টিভ’ বা কর প্রণোদনা দেয়া হয় তাহলে আবাসন সমস্যায় বড় কোনো পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন কি?
কর প্রণোদনা কোনো একক সমাধান নয়, তবে সঠিক শর্তে দিলে এটি ডেভেলপারদের সাশ্রয়ী আবাসনের দিকে উৎসাহিত করতে পারে। এ বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার আওতাধীন। এছাড়া বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-২০৩৫) এ সাশ্রয়ী আবাসনকে উৎসাহিত করার জন্য ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) প্রণোদনার ব্যবস্থা রয়েছে।
যেসব ডেভেলপার স্বচ্ছ মালিকানা, সময়মতো প্রকল্প হস্তান্তর এবং ব্যাংকযোগ্য ডকুমেন্টেশন নিশ্চিত করতে পারে, তাদের জন্য রাজউক কি দ্রুত অনুমোদন, কম চার্জ বা অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিওর মতো নীতিগত প্রণোদনা দেয়ার কথা ভাবছে, যাতে হোম লোনভিত্তিক ক্রেতারা কম ঝুঁকিতে পড়েন?
বিদ্যমান ড্যাপ ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় সুনির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়া রেশিও প্রণোদনা আকারে দেয়া আছে। এটি নগর পরিকল্পনা সংশ্লিষ্ট একটি বিজ্ঞানভিত্তিক পদ্ধতি। যেসব ডেভেলপার নিয়ম মেনে কাজ করে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে তাদের জন্য আলাদা নীতিগত সুবিধা রাখা যেতে পারে। দ্রুত অনুমোদন, কম চার্জ বা নগর পুনরুন্নয়ন এলাকায় এফএআর পুনর্নির্ধারণ বিবেচনার সুযোগ রয়েছে
ব্যাংকগুলো অভিযোগ করে রাজউক অনুমোদিত নকশা আর বাস্তব নির্মাণের মধ্যে পার্থক্য থাকায় হোম লোন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এই ‘ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট গ্যাপ’ বন্ধে রাজউকের জবাবদিহি কাঠামো কী?
নকশা ও বাস্তব নির্মাণের পার্থক্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রাজউক ডিজিটাল মনিটরিং, পর্যায়ভিত্তিক ইন্সপেকশন এবং সার্টিফায়েড প্রফেশনালদের দায়বদ্ধতার মাধ্যমে এ গ্যাপ কমাতে কাজ করছে। তবে এক্ষেত্রে রাজউকের নজরদারির সঙ্গে সঙ্গে বেশি জরুরি হচ্ছে ভবন মালিকদের সচেতন হওয়া। এক্ষেত্রে রাজউক কেবল নকশা অনুমোদনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং কারিগরি ব্যক্তির দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ বাস্তবায়নের আইনি দায়িত্ব ভবন মালিক ও নিয়োজিত কারিগরি ব্যক্তির ওপরও ন্যস্ত থাকে, যা বিধিমালার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। এছাড়া বিধিমালায় নির্মাণকালীন পর্যায়ে প্লিন্থ লেভেলসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। এতে অনুমোদিত নকশা থেকে বিচ্যুতি প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত ও সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তী আর্থিক ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। বসবাস বা ব্যবহার সনদ (অকুপেন্সি সার্টিফিকেট) প্রদান প্রক্রিয়া একটি নির্ভরযোগ্য ঝুঁকি-নিয়ন্ত্রণ সূচক হিসেবে কাজ করে। ‘ডিজাইন ডেভেলপমেন্ট ঘাটতি কমানোর ক্ষেত্রে ডিজাইন অনুমোদন, নির্মাণ তদারকি, ব্যবহার সনদ এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ব্যাংকিং ও হাউজিং ফাইন্যান্স খাতে আস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
আবাসন খাতের দীর্ঘসূত্রতা ও বিভিন্ন স্তরের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যে ‘অদৃশ্য ব্যয়’ হয়, তা সরাসরি ফ্ল্যাটের দাম বাড়িয়ে দেয়। রাজউক কি সত্যিকার অর্থেই এ অদৃশ্য ব্যয় কমিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য হোম লোনের কিস্তিকে নাগালের মধ্যে আনতে পারবে?
অনুমোদন প্রক্রিয়া যত সহজ ও স্বচ্ছ হবে, ব্যয় তত কমবে। রাজউক এরই মধ্যে অনলাইন সিস্টেম, সময়সীমা নির্ধারণ ও ওয়ান-স্টপ সার্ভিস জোরদার করছে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে।
পোড়ামাটির ইটের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ইট ব্যবহারে রাজউক কি নকশা অনুমোদনে অগ্রাধিকার বা ডেভেলপারদের বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার কথা ভাবছে?
পরিবেশবান্ধব নির্মাণ আমাদের অগ্রাধিকার। বিকল্প ইট বা সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার করলে এফএআর ও অন্যান্য প্রণোদনার বিষয়টি আমরা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছি। এরই মধ্যে সংশোধিত ড্যাপে সার্টিফায়েড গ্রিন বিল্ডিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ০.৫ এফএআর প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারি নির্মাণে শতভাগ পরিবেশবান্ধব ইট ব্যবহারে সরকার এরই মধ্যে টার্গেট বেঁধে দিয়েছে।










