রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, মূল্যস্ফীতি, ডলারের উচ্চমূল্য—এসবের মধ্যে ফ্রিজের বাজার কেমন অবস্থায় আছে?

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কভিড-উত্তর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, গাজায় ইসরায়েলি হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন অনেকটা বাধাগ্রস্ত। সেই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি ও ডলারের মূল্য সমন্বয়ের কারণে পণ্যের মূল্যে কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে। তবে আমাদের সঠিক উৎপাদন পরিকল্পনা, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং ক্রেতার ক্রয় সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করায় ডলারের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পণ্যের মূল্যের ওপর খুব সীমিত। তবে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা পরিবর্তনের প্রভাব পণ্যের মূল্যে সঠিক সসন্বয়ের কারণে এর চাহিদায় কোনো প্রভাব পড়েনি।

গত এক বছরে ফ্রিজের দামের ক্ষেত্রে কোনো তারতম্য হয়েছে কি?

যেহেতু ডলারের উচ্চমূল্য এবং মূল্যস্ফীতি গত এক বছরে অনেক বেশি ছিল স্বাভাবিকভাবেই প্রতিটি প্রডাক্টের দামে কিছুটা সমন্বয় করা হয়েছে। যদিও এ প্রডাক্ট আমরা বাংলাদেশে ম্যানুফ্যাকচারিং করছি, তার পরও এর কাঁচামালের জন্য বিদেশের ওপর আমরা নির্ভরশীল। যার ফলে বিনিময় মূল্যের সঙ্গে পণ্যের মূল্য মাঝেমধ্যে সমন্বয় করা হয়। তবে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পণ্যের মূল্যের ওপর খুব সীমিত।

আপনাদের ফ্রিজ উৎপাদন কারখানা স্থাপন এবং এর বিশেষত্ব, সক্ষমতা, প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে চাই।

১৯৮০ সাল থেকে আমাদের ব্যবসায়িক ও বিক্রয় কার্যক্রম শুরু হয় বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ইলেকট্রনিক পণ্য বিপণনের মধ্য দিয়ে। ১৯৯৮ সাল থেকে চায়না ব্র্যান্ড কনকা ও গ্রী ইলেকট্রনিক পণ্য বাজারজাতের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়। তখনকার সময়ে আমরাই বাংলাদেশে প্রথম পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টি দিয়ে ইলেকট্রনিক পণ্য বিপণন করি। কারণ আমাদের পণ্যের গুণগত মান ছিল আন্তর্জাতিক মানের। ২০০৪ সালে আমরা সংযোজন কারখানা স্থাপন করে ইলেকট্রনিক পণ্য সংযোজন কার্যক্রম শুরু করি। ২০১৫ সাল থেকে আমরা পরিপূর্ণ ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনের জন্য যৌথ উদ্যোগে কারখানা স্থাপনের কার্যক্রম গ্রহণ করি। ২০১৮ সালের শেষের দিকে রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার উৎপাদনের মধ্য দিয়ে আমাদের উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয়। আমরা বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ড কনকা রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজার, গ্রী ব্র্যান্ড এয়ারকন্ডিশনার ও রেফ্রিজারেটর, কনকা সিলিং ফ্যান, দেশী ব্র্যান্ড হাইকো ফ্রিজ ও এসি সম্পূর্ণ উৎপাদন করছি। আমরা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছি নিত্যনতুন প্রযুক্তির সমন্বয়ে দেশীয়ভাবে ফ্রিজ তৈরি করে এ দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করতে। আমাদের ফ্রিজে রয়েছে সবচেয়ে ওয়াইড এরিয়া। কনকা ফ্রিজের অ্যাক্টিভ কার্বন ডিওডোরাইজার ব্যাকটেরিয়াকে ডিঅ্যাক্টিভ করে দেয়, যার কারণে এক খাবারের গন্ধ আর এক খাবারে সংমিশ্রণ হয় না। এতে খাবার থাকে সতেজ ও স্বাস্থ্যসম্মত। কনকা ফ্রিজে যে ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয় তা শতভাগ ফুড গ্রেড ও এফডিআই কর্তৃক সার্টিফায়েডকৃত। এছাড়া ভিটামিন ও গার্ডেন ফ্রেশ টেকনোলজির মাধ্যমে ফ্রিজের ভেতরে রাখা সবজি ও ফলমূল দীর্ঘদিন পর্যন্ত ফ্রেশ থাকে। সূর্যের আলোর মাধ্যমে বাগানে সবজি বা ফলমূল যেমন ফ্রেশ থাকে আমাদের ফ্রিজে তেমনই পাবেন। ভেজিটেবল বক্সের মধ্যে হিউমিডিটি কন্ট্রোল সিস্টেম আছে, যাতে খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ করা যায়। দরজা খুলে অনেক সময় মানুষ চলে যায় বা ভুলে যায় সেজন্য আমাদের ফ্রিজ ৬০ সেকেন্ড পর অ্যালার্ম বাজবে। বাংলাদেশে আমরাই এ প্রযুক্তি প্রথমে নিয়ে এসেছি। কনকা ফ্রিজে রয়েছে ডিজিটাল ডিসপ্লে এবং ইনভার্টার টেকনোলজি, যা বাইরে থেকেও ফ্রিজকে কন্ট্রোল করা যাবে। টেম্পারেচার এবং অন্যান্য ফাংশন বাইরে থেকে হাতের স্পর্শের মাধ্যমে কন্ট্রোল করা সম্ভব। দুই-চারদিনের জন্য বা এর চেয়ে বেশি সময়ের জন্য ঘরের বাইরে থাকলে কনকা ফ্রিজটি ইকোনমি মোডের মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। এতে বিদ্যুৎ বিল কম আসবে এবং খাবারও সতেজ থাকবে।

বাংলাদেশে ফ্রিজের বাজারের আকার ও প্রবৃদ্ধি এখন কেমন? তাতে আপনাদের হিস্যা কতখানি?

বর্তমান বাংলাদেশের প্রতিটি ফ্যামিলিতে ফ্রিজ একটি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য। এছাড়া দেশে প্রতিটি অঞ্চলের শতভাগ বিদ্যুতায়নের ফলে এ পণ্যের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশে রেফ্রিজারেটর ও ফ্রিজারের বাজার চাহিদা টাকার অংকে প্রায় সাড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা। বার্ষিক গড় বাজার সম্প্রসারণের হার প্রায় ১০-১৫ শতাংশ। বাজারে কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের চাহিদা যথেষ্ট ভালো। বাজারের একটি বৃহৎ অংশ কনকা, গ্রী ও হাইকো ব্র্যান্ডের সরবরাহ রয়েছে।

ফ্রিজেও এখন নিত্যনতুন প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে। উচ্চ প্রযুক্তির ফ্রিজে দেশের ক্রেতাদের আগ্রহ কেমন?

নতুনের প্রতি মানুষের আকর্ষণ চিরন্তন। প্রযুক্তি মানুষের জীবন ও লাইফস্টাইল প্রতিনিয়ত সহজ করে তুলছে। ফলে প্রতিনিয়ত কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের ফ্রিজে আমাদের আরঅ্যান্ডডি নতুনত্ব সংযোজন করে যাচ্ছে। উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন ফ্রিজের প্রতি মানুষের চাহিদা সবচেয়ে বেশি।

বিদ্যুতের খরচ ও বিক্রয়োত্তর সেবা নিয়ে ত্রেতারা এক ধরনের দুশ্চিন্তায় থাকেন। আপনাদের ব্র্যান্ডের ফ্রিজে এ দুটো বিষয় নিয়ে ক্রেতারা কতটা নিশ্চিন্তে থাকবেন?

বাড়তি বিদ্যুৎ বিলের কথা মাথায় রেখে কনকা ও হাইকো ফ্রিজে ইনভার্টার টেকনোলজি যুক্ত করা হয়েছে। এ প্রযুক্তি বিদ্যুৎ সাশ্রয়, শব্দদূষণ রোধ এবং দ্রুত ঠাণ্ডা হওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। যাতে ফ্রিজের স্থায়িত্ব বাড়ে। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিলেরও সাশ্রয় হয়। কনকা ও হাইকোর সব ফ্রিজ বিএসটিআইয়ের ফাইভ স্টার এনার্জি রেটিংসমৃদ্ধ, যা ৭১ শতাংশ বিদ্যুৎ খরচ কমাতে সহায়ক। আর বিক্রয়োত্তর সেবার কথা যদি বলি সেই ক্ষেত্রে সারা বাংলাদেশে প্রতিটি জেলা ও উপজেলা লেভেলে দক্ষ সার্ভিস টিমের মাধ্যমে আমরা সার্বক্ষণিক কাস্টমারকে সেবা দিয়ে থাকি। আমাদের ফ্রিজে কোনো প্রবলেম দেখা দিলে সেই প্রডাক্ট নিয়ে কাস্টমারকে কোথাও যেতে হয় না। আমাদের কল সেন্টার নাম্বার ১৬৬৪৯ তে ফোন দিয়ে সমস্যা জানালে স্বল্প সময়ের মধ্যেই আমরা কাস্টমারের প্রবলেমের সলিউশন নিশ্চিত করি।

সামনেই ঈদুল ফিতর। ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের কোনো বিশেষ সুবিধা দিচ্ছেন কি?

ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমরা একটি অফার চালু করেছি, যার নাম ‘ঘষা দিলেই গোল্ড অফার’। এ অফারে একজন কাস্টমার কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের ফ্রিজ ক্রয় করলেই একটি স্ক্র্যাচ কার্ড পাবেন, যা ঘষে পেতে পারেন বিভিন্ন গোল্ডের জুয়েলারিসহ কনকা ও হাইকো ব্র্যান্ডের নানা রকম উপহারসামগ্রী।

ফ্রিজ বাদে অন্য হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের বাজার বাংলাদেশে কেমন? টাকার মূল্যমানে তা কত?

ফ্রিজ বাদে অন্য হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার বাংলাদেশে অনেক ভালো। অনেক হোম অ্যাপ্লায়েন্স কারখানা বেশ সাফল্য অর্জন করছে। বর্তমানে এ খাতের বাজার প্রায় আড়াই থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা।

আপনারা কী কী হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য উৎপাদন করেন?

এয়ারকন্ডিশনার ও ফ্রিজ বাদে আমরা আরো বেশকিছু হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য আমরা সংযোজন ও বিপণন করি। এগুলো হলো কনকা ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, আয়রন, রাইস কুকার, প্রেসার কুকার, এয়ারকার্টেন, এয়ারপিউরিফায়ার, ইনডাকশন কুকার, মিকশ্চার গ্রাইন্ডার, সিলিং ফ্যান, ইলেকট্রিক কেতলি, কিচেন হুভ, কিচেন হুড ইত্যাদি।

দেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতের ভবিষ্যৎ কেমন দেখছেন?

বর্তমানে প্রতিটি মানুষ নিজের ও পরিবারের জীবনযাত্রাকে সহজ করে তুলতে চাচ্ছে। যার জন্য সময় সাশ্রয়ের প্রতি অধিকতর মনোযোগী সবাই। এই সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য। এখন কাপড় পরিষ্কার ও রান্নাসহ নিত্যদিনের অনেক কাজ মানুষ সহজে হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য ব্যবহার করে দ্রুত সমাধান করে নিচ্ছে। ফলে আমরা মনে করি দেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতের বাজার ভবিষ্যতে আরো দ্রুত বাড়বে।