ফ্রিজকে আগে মনে করা হতো আভিজাত্যের প্রতীক। ব্যবহার হতো শুধু উচ্চবিত্তের ঘরে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বাণিজ্যিকভাবে ফ্রিজ উৎপাদন শুরুর পর ফ্রিজের দাম এখন নিম্নবিত্তের হাতের নাগালে। প্রায় সব শ্রেণী, পেশা ও আয়ের লোকের ঘরে পৌঁছে গেছে ফ্রিজ। দিন দিন বাড়ছে ব্যবহার। বিশেষ করে ঈদের সময়টাকে ফ্রিজ বিক্রির প্রধান মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সারা বছরের ফ্রিজ বিক্রির প্রায় ৭০ ভাগ বিক্রি হয় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার সময়ে।

এক দশক আগেও দেশে ব্যবহৃত ফ্রিজের প্রধান অংশটাই ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে রেফ্রিজারেটরের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই পূরণ হয় দেশীয় কোম্পানির রেফ্রিজারেটর দ্বারা। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে ফ্রিজের বাজার এখন বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি এবং বার্ষিক চাহিদা ৩০ লাখ ইউনিটেরও বেশি। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশের ফ্রিজের বাজারের বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ২ শতাংশ হারে। দেশের ৫০ শতাংশের বেশি পরিবারেই পৌঁছে গেছে রেফ্রিজারেটর। দেশী উদ্যোক্তাদের ভূমিকায় স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রফতানি বাজারও প্রসারিত হচ্ছে ফ্রিজের। ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, তুরস্ক, অস্ট্রিয়াসহ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ ৪০টির বেশি দেশে ফ্রিজ ও ফ্রিজের যন্ত্রাংশ রফতানি হচ্ছে। কিছুদিন আগেও যে খাত আমদানিনির্ভর ছিল, তা এখন যথেষ্ট স্বয়ংসম্পূর্ণ।

দেশের বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে জেলা শহর থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ফ্রিজের চাহিদা বেড়েছে। অন্যদিকে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরের ক্রেতাদের মধ্যে তীব্র আকর্ষণ উপলব্ধি করা যাচ্ছে সর্বশেষ আধুনিক প্রযুক্তির প্রতি। পুরনো ফ্রিজ বদলে নতুন কেনার প্রবণতাও বেড়েছে অনেক। সব মিলিয়ে আরো বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে পণ্যটির বাজার। তবে দেশে এসব পণ্য উৎপাদনে উৎসাহিত করতে সরকার যেসব নীতিসহায়তা দিচ্ছে, সেটি আরো কয়েক বছর অব্যাহত রাখার দাবি খাতসংশ্লিষ্টদের। তাতে যেমন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা উৎসাহিত হবেন, তেমনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বিনিয়োগ তুলতে সক্ষম হবে। বর্তমানে দেশের ৯৮ শতাংশ এলাকা বিদ্যুতের আওতাভুক্ত। বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গ্রামীণ এলাকা এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে গেছে ফ্রিজ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস প্রতিবেদন ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের ৫৩ শতাংশের বেশি খানা বা পরিবারে এখন রেফ্রিজারেটর রয়েছে। ২০২১ সালে ফ্রিজ ছিল ৪৫ শতাংশের মতো পরিবারে। আর ২০২২ সালে পণ্যটি পৌঁছে যায় প্রায় ৫০ শতাংশ পরিবারের কাছে।

বিভিন্ন পণ্যের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পর্যায়ের বাজার পর্যালোচনার ভিত্তিতে নিয়মিত মার্কেট ইনসাইট প্রকাশ করছে স্ট্যাটিস্টা মার্কেট ইন্টেলিজেন্স। বৈশ্বিক ডাটাবেজটির বাংলাদেশে রেফ্রিজারেটরের বাজারসংক্রান্ত পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, টেকসই পণ্য উৎপাদনে সরকারের গৃহীত উদ্যোগ ও ভোক্তাদের মধ্যে প্রতিবেশ সচেতনতা বাড়ায় বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী রেফ্রিজারেটরের চাহিদা বাড়ছে। স্ট্যাটিস্টা মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের মতে, বাংলাদেশে ফ্রিজের বাজার ২০২৫-৩০ সালের মধ্যে সম্প্রসারণের গড় হার দাঁড়াবে ৫ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। ফ্রিজ উৎপাদন থেকে বৈশ্বিকভাবে সবচেয়ে বেশি আয় করে চীন। ২০২৫ সালে দেশটিতে পণ্যটি থেকে আয়ের আকার দাঁড়াতে পারে ৩ হাজার ৩৩২ কোটি ডলার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে খানাপ্রতি ফ্রিজের বাজার দাঁড়াবে ৭০ ডলারের বেশি।

দেশে রেফ্রিজারেটর উৎপাদনে প্রথম উদ্যোগ নেয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান ওয়ালটন। তারপর একে একে যমুনা, মিনিস্টার, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ভিশন, ট্রান্সকম, ইলেকট্রো মার্টের হাইকো, ওরিয়ন ও র‍্যানকন কারখানা স্থাপন করে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশে উৎপাদন শুরু করে বিদেশী ব্র‍্যান্ড স্যামসাং, সিঙ্গার, ওয়ার্লপুল, কনকাসহ আরো বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ড। এখন দেশী-বিদেশী ১৩টি কোম্পানি ফ্রিজ উৎপাদন করে বাজারজাত করছে। খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে দেশে ফ্রিজের বাজার ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার। বাজারে পণ্যটির মডেল রয়েছে কয়েকশ। চাহিদার কথা বিবেচনায় তৈরি হচ্ছে এসব মডেল। বছরে ২০-২৫ লাখ ইউনিট ফ্রিজ বিক্রি হচ্ছে দেশে। বাংলাদেশে ফ্রিজ উৎপাদনে অন্যতম শীর্ঘ কোম্পানি ওয়ালটন ২০০৫ সালের শেষ দিকে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে নিজস্ব জমিতে কারখানা নির্মাণ শুরু করে। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় ২০০৮ সালে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৭ সালে ফ্রিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান কম্প্রেসর উৎপাদন শুরু করে। দেশের পাশাপাশি রফতানি বাজারেও ভালো অবস্থান তৈরি করেছে ওয়ালটন।

সরকারের নীতিগত সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়েই দেশী শিল্প উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় এখন ফ্রিজের মতো পণ্যের উৎপাদন সক্ষমতা বহু গুণ বেড়েছে। ব্যবসাবান্ধব নীতির কারণে সরকার, দেশ ও জনগণ উপকৃত হচ্ছে। তবে সরকারের এসব সুবিধা অব্যাহত রাখাসহ ক্রমে আরো বাড়ানো সম্ভব হলে স্থানীয় শিল্প উৎপাদন সক্ষমতা আরো বাড়বে ভবিষ্যতে।

সাধারণত ক্রেতারা ফ্রিজ কেনার সময় দাম, স্থায়িত্ব, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, কম্প্রেসর, বিক্রয়োত্তর সেবা, নকশা ও আধুনিক প্রযুক্তির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে ফ্রিজ থেকে পানি বের হওয়া, কম্প্রেসরের বাড়তি শব্দ, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ, বেশি বরফ জমা, নির্দিষ্ট সময় পরপর কম্প্রেসরের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া নিয়ে অভিযোগ করতেও দেখা যায় অনেককে। তবে মার্কেটিং ওয়াচ বাংলাদেশের (এমডব্লিউবি) এক গবেষণা বলছে, অপেক্ষাকৃত কম দামে মোটামুটি ভালো মানের ফ্রিজ তৈরিতে সক্ষম হওয়ায় দেশীয় ব্র্যান্ডের ফ্রিজগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। দেশের বাজারে যেসব ফ্রিজের প্রবল চাহিদা রয়েছে সে তালিকায় রয়েছে যমুনা ইলেকট্রনিকস। ২০১৪ সাল থেকে ফ্রিজ বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। ঈদ সামনে রেখে প্রতিষ্ঠানটির অর্ধলক্ষ ফ্রিজ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। দেশীয় ব্র্যান্ডের পাশাপাশি বিদেশী বিভিন্ন ব্র‍্যান্ডের উৎপাদিত পণ্যও দেশের বাজারে রয়েছে। সাধারণত দেশীয় ব্র‍্যান্ডের উৎপাদিত পণ্যগুলোর চাহিদা গ্রামাঞ্চল ও উপশহরগুলোয় বেশি। অন্যদিকে বৈশ্বিক ব্র‍্যান্ডগুলোর প্রতি শহরের মানুষের আকর্ষণ বেশি দেখা যায়। বর্তমানে দেশেই উৎপাদন হচ্ছে চীনা ব্র‍্যান্ডের কনকা ফ্রিজ। তাদের পণ্য দেশে উৎপাদন করছে ইলেক্ট্রো মার্ট। সোনারগাঁয় স্থাপিত কারখানায় কনকার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি তাদের নিজস্ব ব্র‍্যান্ড হাইকোর ফ্রিজও উৎপাদন করছে।

দেশে মূলত তিন ধরনের ফ্রিজ বিক্রি হয়। এমডব্লিউবির গবেষণার তথ্য বলছে, সবচেয়ে বড় বাজার ফ্রস্ট ফ্রিজের। এর অংশ ৮৫ শতাংশের কাছাকাছি। এছাড়া নন ফ্রস্ট ৮ দশমিক ৩৩ ও চেস্ট বা ডিপ ফ্রিজ ৬ দশমিক ৭ শতাংশের মতো বিক্রি হয়। সামনেই ঈদ। আছে তীব্র গরমও। দেশী-বিদেশী সব প্রতিষ্ঠানই ক্রেতা টানতে মূল্যছাড়সহ বিভিন্ন অফার দিয়েছে। তাই এবার ফ্রিজ বিক্রি আরো বাড়বে বলে আশা খাতসংশ্লিষ্টদের।

বাংলাদেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্সের বাজার যথেষ্ট ভালো। অনেক কারখানা বেশ সাফল্য অর্জন করছে। এয়ারকন্ডিশনার ও ফ্রিজ বাদে দেশে উৎপাদিত হোম অ্যাপ্লায়েন্সের মধ্যে রয়েছে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, আয়রন, রাইস কুকার, প্রেসার কুকার, এয়ার কার্টেন, এয়ার পিউরিফায়ার, ইনডাকশন কুকার, মিকশ্চার গ্রাইন্ডার, সিলিং ফ্যান, ইলেকট্রিক কেতলি, কিচেন হুড ইত্যাদি। দেশে তৈরি পণ্য মানের দিক থেকেও যথেষ্ট এগিয়ে এসেছে। এসব পণ্যের বাজার বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার। বিদেশে তৈরি হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের সঙ্গে বর্তমানে দেশীয় পণ্যের তেমন একটা ফারাক নেই। বরং অনেক ক্ষেত্রে দেশে তৈরি পণ্য আরো ভালো মানের হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্যের বিক্রয়োত্তর সেবা বা মেরামত এবং খুচরা যন্ত্রাংশ প্রাপ্তিতে সমস্যা দেখা দেয়। এসব বিবেচনায় দেশে তৈরি মানসম্মত হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য বেশ ভালো। বিশ্লেষকরা মনে করেন, দেশে হোম অ্যাপ্লায়েন্স খাতের বাজার ভবিষ্যতে আরো দ্রুত বাড়বে।