বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিকীকরণের প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়ার জন্য আপনার মূল কৌশল বা রোডম্যাপ কী?
এআইইউবির আন্তর্জাতিকীকরণের রোডম্যাপ মূলত গ্লোবাল কানেক্টিভিটি এবং উচ্চমানসম্পন্ন একাডেমিক কার্যক্রমের সমন্বয়ে প্রণীত। আমাদের মূল কৌশল হলো শিক্ষা ও গবেষণাকে ভৌগোলিক সীমানার বাইরে নিয়ে যাওয়া। আমরা তিনটি স্তরে কাজ করে আসছি। প্রথমত, পাঠ্যক্রমের আন্তর্জাতিকীকরণ-আমরা স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত পাঠ্যক্রম প্রস্তুত করছি, যা শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক মান অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে। দ্বিতীয়ত, কৌশলগত অংশীদারত্ব—বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমাদের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) রয়েছে। তৃতীয়ত, ক্যাম্পাস ডাইভারসিটি-দেশী ও বিদেশী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে কাজ করার পরিবেশ আমরা গড়ে তুলছি। এর পাশাপাশি, আমাদের দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান ২০২৩-২০৩৩ আন্তর্জাতিকীকরণ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্য হলো এআইইউবিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে বসেই বিশ্বের সেরা মানের শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করতে কোন কোন নির্দিষ্ট সূচকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন?
আমরা কিউএস, টাইমস হায়ার এডুকেশন এবং এশিয়া-প্যাসিফিক কোয়ালিটি নেটওয়ার্ক (এপিকিউএন)-এর মতো আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সূচকগুলোকে গুরুত্ব দিই। আউটকাম-বেজড এডুকেশন (ওবিই) মডেলের ভিত্তিতে আমাদের পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। আমরা শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার দিকে সচেষ্ট, যা শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যক্তিগত মনোযোগ ও কার্যকর পরামর্শ নিশ্চিত করে। এছাড়া আমাদের গ্রন্থাগারে রয়েছে ৪৭ হাজার বই, ৭০ হাজার অনলাইন জার্নাল এবং ১ লাখ ৮০ হাজার ই-বুক, যা বিশ্বের সেরা ডাটাবেজগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত। গবেষণাগার, ভার্চুয়াল ল্যাব, থ্রিডি অ্যানিমেশন ল্যাব, রোবোটিকস ল্যাবসহ আধুনিক অবকাঠামোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। গ্র্যাজুয়েট এমপ্লয়েবিলিটি, সফট স্কিল, টেকনিক্যাল স্কিল এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন—এসবই আমাদের প্রধান সূচক।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আন্তর্জাতিকীকরণের পথে কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন?
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাত সম্পর্কে বিদেশে কিছু নেতিবাচক ধারণা থাকতে পারে। তা দূর করতে আমরা আন্তর্জাতিক অ্যাক্রেডিটেশন অর্জনে জোর দিচ্ছি। যেমন-আমাদের বিজনেস প্রোগ্রামগুলো এসিবিএসপি দ্বারা স্বীকৃত। এছাড়া আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নিয়মিত একাডেমিক সহযোগিতা আমাদের র্যাংকিং ও স্বীকৃতি অর্জনে সহায়তা করছে। তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, কোর্স অনুমোদনে বিলম্ব এবং পিএইচডি প্রোগ্রামের অনুমোদন না পাওয়া কিছু চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিদেশী শিক্ষার্থী ও গবেষকদের জন্য স্কলারশিপ ও গবেষণা অনুদানের স্বল্পতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবুও আমরা এসব সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে শিক্ষার্থীদের জন্য বৈশ্বিক মানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে সচেষ্ট।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাক্রম ও গবেষণাকে কীভাবে ডিজাইন করছেন, যাতে স্থানীয় চাহিদা ও আন্তর্জাতিক মান—উভয়ই বজায় থাকে?
আমাদের শিক্ষাক্রমের নীতি হলো দ‘গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড উইথ লোকাল রিলেভেন্স’, অর্থাৎ বৈশ্বিক প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি দেশের চাহিদার প্রতিও গুরুত্ব দেয়া। আমরা নিয়মিত ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা পরিচালনা করি। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত, বিভিন্ন শিল্পকারখানা, তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বাস্থ্য খাতের চাহিদা অনুযায়ী পাঠ্যক্রম হালনাগাদ করা হয়। সিসকো, ওরাকল ও মাইক্রোসফটের মডিউলের সঙ্গে সমন্বয় শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা প্রদান করে। ড. আনোয়ারুল আবেদীন ইনস্টিটিউট অব ইনোভেশন উদ্ভাবনী গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক শিক্ষাক্রম উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য সেমিনার, ওয়ার্কশপ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্যুর ও গবেষণার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়।
আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রকাশনা বৃদ্ধিতে বিশ্ববিদ্যালয় কী ধরনের সহায়তা দিচ্ছে?
গবেষণার জন্য আমরা পর্যাপ্ত তহবিল বরাদ্দ করি। শিক্ষকরা স্কোপাস ও ওয়েব অব সায়েন্স ইনডেক্সড জার্নালে প্রকাশনা করলে বিশেষ বোনাস ও পদোন্নতির সুযোগ পান। প্রতিটি অনুষদে রয়েছে রিসার্চ সেল এবং আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে অংশগ্রহণের জন্য পূর্ণ আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। আমাদের ড. আনোয়ারুল আবেদীন ইনস্টিটিউট অব ইনোভেশন, সেন্টার ফর সাসটেইনেবল এনার্জি রিসার্চ, সেন্টার ফর ন্যানোটেকনোলজি রিসার্চ, সেন্টার ফর বায়োমেডিকেল রিসার্চ এবং সেন্টার ফর রোবোটিকস অ্যান্ড অটোমেশন গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনা ও অনুদানও রয়েছে।
শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম কতটা অগ্রাধিকার পায়?
এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম আমাদের আন্তর্জাতিকীকরণের অন্যতম প্রধান অংশ। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করছেন। সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ক্রেডিট ট্রান্সফার সিস্টেম সহজ করা হয়েছে এবং ইরাসমুস+ প্রোগ্রামের সুবিধা নেয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক সামার স্কুল ও সাংস্কৃতিক এক্সচেঞ্জে অংশ নেয়, আর শিক্ষকরা গেস্ট লেকচারার হিসেবে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বিশ্বমানের শিক্ষাদান পদ্ধতির অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক দক্ষতার পাশাপাশি নতুন সাংস্কৃতিক ও একাডেমিক অভিজ্ঞতা লাভ করে।
আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থানকেই কি গুণগত শিক্ষার একমাত্র মানদণ্ড মনে করেন?
র্যাংকিং একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি একমাত্র মানদণ্ড নয়। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীর সাফল্য এবং কর্মজীবনে দক্ষতা অর্জন। তবে কিউএস ও টাইমস হায়ার এডুকেশনের মতো র্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান বৈশ্বিক স্বীকৃতি বৃদ্ধি করে এবং শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকর্ষণ করে। আমরা ওয়েবসাইট উন্নয়ন, ডিজিটাল ডাটাবেজ, বিদেশী ফ্যাকাল্টি নিয়োগ, আন্তর্জাতিক কনফারেন্স, সেমিনার এবং গবেষণা প্রকাশনা বৃদ্ধির মাধ্যমে র্যাংকিং উন্নয়নে কাজ করছি। এআইইউবি দেশের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কিউএস ৪-স্টার রেটিং অর্জন করেছে, যা অ্যাক্রেডিটেশনের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার মানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
আমাদের লক্ষ্য হলো এআইইউবিকে একটি রিসার্চ-ইনটেনসিভ, বিজ্ঞান, কারিগরি, ডিজিটাল ও আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে এশিয়ার শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করেছি এবং সে অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ফ্যাব ল্যাব, রোবোটিকস, টেকসই উন্নয়ন ও নবায়নযোগ্য শক্তি—এ ধরনের নতুন গবেষণা কেন্দ্র চালু করা হবে। শিক্ষার্থীরা যেন কেবল দেশের উন্নয়নেই নয়, বরং বৈশ্বিক মানবিক ও প্রযুক্তিগত কল্যাণেও অবদান রাখতে পারে সে লক্ষ্যেই আমরা সহশিক্ষা কার্যক্রম, গবেষণা, আন্তর্জাতিক এক্সচেঞ্জ ও উদ্ভাবনী পাঠ্যক্রমের মাধ্যমে ভবিষ্যতের গ্লোবাল সিটিজেন তৈরিতে কাজ করছি।










