২০২৫ সালে GO4IMPact-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ২৩টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়েছে। ১৩ হাজার ৬৫৫ জন মানুষ উন্নত পানি সরবরাহের আওতায় এসেছেন। ৪১ হাজার ৮০৮ জন নাগরিক স্থানীয় সরকারের পরিকল্পনা ও বাজেট প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন। ৩৫০টি সামাজিক কর্মপরিকল্পনা স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ সংখ্যাগুলো উৎসাহজনক। কিন্তু কর্মসূচিটি নিজেই বলছে—সংখ্যার পেছনে যে বাস্তবতা, সেটা আরো জটিল এবং সেই জটিলতা থেকেই এসেছে সবচেয়ে দামি শিক্ষাগুলো।
এক. শিকড় যখন প্রতিষ্ঠানে, তখন পরিবর্তনেও ছন্দ থাকে
স্থানীয় প্রশাসকের বদলি যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্পের জন্যই একটি পরিচিত চ্যালেঞ্জ। GO4IMPact এ বাস্তবতা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে: যেখানে কাজটি কমিটি, পদ্ধতি বা আনুষ্ঠানিক চুক্তির মধ্যে গেঁথে নেয়া হয়েছিল, সেখানে ব্যক্তি বদলালেও কাজ এগিয়েছে। ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান টেকসই—এ সত্যই এখন কর্মসূচির কৌশলের কেন্দ্রে।
এ উপলব্ধি থেকেই জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের সঙ্গে একটি এমওইউ স্বাক্ষর হয়েছে। GO4IMPact-এর শেখা পদ্ধতি, প্রশিক্ষণ উপকরণ ও মাঠের অভিজ্ঞতা এখন জাতীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মধ্যে স্থায়ীভাবে ঢুকে যাচ্ছে, প্রকল্প শেষ হলেও যেন শিক্ষাটা না হারায়।
দুই. অবকাঠামোর আগে ব্যবস্থা
উন্নয়ন প্রকল্পের একটি পরিচিত ফাঁদ হলো অবকাঠামো দিয়ে শুরু করা। নতুন ডাস্টবিন, নতুন ভ্যান, নতুন যন্ত্রপাতি—এগুলো দেখতে ভালো, প্রতিবেদনে সংখ্যা হয়, কিন্তু যদি পরিচালনার ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যে সেগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে থাকে।
GO4IMPact প্রকল্পটি একটু অন্যভাবে চিন্তা করেছে। সাতক্ষীরায় বর্জ্য সংগ্রহের ভ্যান দেয়া হয়েছে, স্কিপ বিন ও হুইল বিন বসানো হয়েছে, কিন্তু তার আগে বা একই সঙ্গে কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে, সংগ্রহের রুটিন তৈরি করা হয়েছে এবং পৌরসভার বিদ্যমান ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পৌরসভাগুলোতে অবকাঠামো বরাদ্দ দেয়। যদি সেই বরাদ্দের একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে পরিচালন সক্ষমতা তৈরিতে ব্যয় করার শর্ত যুক্ত হয়, তাহলে অবকাঠামো টেকসই হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই বাড়বে।
তিন. উদ্যোক্তা আছেন, সুযোগটা তৈরি করতে হবে
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি খাতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশে নতুন নয়। কিন্তু কার্যকর অংশগ্রহণ কেন হচ্ছে না, সে প্রশ্নের উত্তর GO4IMPact-এর মাঠ অভিজ্ঞতা থেকে বেশ স্পষ্ট হয়েছে।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো যদি বর্জ্য উদ্যোগকে সবুজ অর্থায়নের আওতায় আনে, পৌরসভাগুলো যদি মানসম্পন্ন বেসরকারি সেবা প্রদানকারীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করার সক্ষমতা পায় এবং কেন্দ্রীয় সরকার যদি এ ব্যবস্থাগুলোর জন্য নিয়ন্ত্রণ কাঠামো সহজ করে তাহলে স্থানীয় বর্জ্য খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আসা সম্ভব।
চার. নাগরিক অংশগ্রহণ তখনই কার্যকর যখন তা পরিকল্পনায় প্রতিফলিত হয়
ওয়ার্ড সভা, স্থায়ী কমিটি, নাগরিক সংলাপ—বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের এ প্লাটফর্মগুলো আইনে আছে।
GO4IMPact-এর পলিটিক্যাল ইকোনমি অ্যানালাইসিস দেখিয়েছে যে নাগরিকরা শুধু উপস্থিত থাকলেই হয় না, তাদের কণ্ঠস্বর আসলে পরিকল্পনা ও বাজেটে প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা সেটাই আসল পরীক্ষা।
ওয়াটারএইড ও পিপিআরসির যৌথ বাজেট ট্র্যাকিং উদ্যোগ এ পথ দেখাচ্ছে। স্থানীয় সরকারের বাজেটে বর্জ্য ও পানি বরাদ্দ পর্যবেক্ষণের একটি নাগরিক-চালিত ব্যবস্থা যদি সারা দেশে ছড়িয়ে দেয়া যায়, তাহলে জবাবদিহিতার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার তৈরি হবে।
পাঁচ: তৃণমূলে শিকড় থাকলে ঝড়েও কাজ থামে না
যেকোনো বড় পরিবর্তনের সময় উন্নয়ন কার্যক্রমে ধীরগতি আসে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে সিএসও নেটওয়ার্ক, যুব দল ও সামাজিক সংলাপের ভিত্তি আগে থেকেই তৈরি হয়েছিল, সেখানে নাগরিক সম্পৃক্ততা থেমে থাকেনি। ৪১ হাজার ৮০৮ জন মানুষের গভর্ন্যান্স প্লাটফর্মে অংশগ্রহণ এ প্রমাণই দেয়।
সুযোগটা এখানে সুদূরপ্রসারী: বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার সংস্কারের আলোচনা এখন জাতীয় পর্যায়ে সক্রিয়। GO4IMPact এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনে মাঠ পর্যায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সুপারিশ জমা দিয়েছে। যদি এ সুপারিশগুলো নীতিতে রূপ পায়, তাহলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকবে।
বাংলাদেশের বর্জ্য সমস্যার সমাধান বাইরে থেকে আসবে না। আসবে এ দেশের স্থানীয় সরকার, উদ্যোক্তা, নাগরিক ও নীতিনির্ধারকদের সম্মিলিত সদিচ্ছা ও কাঠামোগত পরিবর্তন থেকে।





