সাতক্ষীরায় একটি প্লাস্টিক বিনিময় ক্যাম্পেইন সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। এটি শুধু একটি সচেতনতামূলক কার্যক্রম নয়, এটি বাংলাদেশের প্লাস্টিক দূষণ সংকট মোকাবেলার একটি বাস্তবসম্মত শাসন কাঠামোর পরীক্ষামূলক রূপ।

গত বছর সাতক্ষীরায় একটি সকাল শুরু হয়েছিল একটু অন্যভাবে। কেউ রাস্তা থেকে প্লাস্টিক তুলছেন, কেউ বাসায় জমানো বোতল-মোড়ক বের করছেন। নির্ধারিত সংগ্রহ কেন্দ্রে আসছিলেন হাতে যা পেয়েছেন তা-ই নিয়ে, শুধু বোতল নয়, পলিথিন ব্যাগ, মোড়ক, সব ধরনের প্লাস্টিক। বিনিময়ে পাচ্ছিলেন সাবান, লবণ বা অন্য নিত্যসামগ্রী।

মাত্র তিনদিনে সংগ্রহ হলো তিন টন প্লাস্টিক। একটাও নালায় গেল না, একটাও খালে ভাসল না। সবটুকু গেল একজন স্থানীয় উদ্যোক্তার কাছে, যিনি সেই প্লাস্টিক থেকে তৈরি করছেন রোপ, আর হার্ড প্লাস্টিক ভেঙে বানাচ্ছেন চিপস।

এত কিছুর পেছনে ছিল একটাই ঘোষণা; মাইকে জানানো হয়েছিল, প্লাস্টিক আনলে মিলবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। ঘোষণাটুকুই যথেষ্ট ছিল। এ ফলাফল অবশ্য হঠাৎ আসেনি। এর পেছনে আছে তথ্য, পরিকল্পনা এবং সঠিক অংশীদারত্বের একটি সুচিন্তিত শৃঙ্খল।

ওয়াটারএইডের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, সাতক্ষীরা পৌরসভায় প্রতি বছর ৫ হাজার ৫৫২ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। এর ৪৪ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ৪৬৮ টন পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ৯৮৮ টন সরাসরি জলাশয় ও নদীতে গিয়ে মেশে যা প্রতি বছর প্রতিটি মানুষের হিসেবে ২৩৭টি পানির বোতলের সমতুল্য। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৮৭ হাজার টন একক ব্যবহারের প্লাস্টিক ফেলা হয়, যার ৯৬ শতাংশই আসে খাদ্য ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের মোড়ক থেকে। দেশটি বিশ্বে সবচেয়ে বেশি হারে সমুদ্রে প্লাস্টিক ছড়ানো দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম, মিসম্যানেজড প্লাস্টিকের ২ দশমিক ৩২ শতাংশ সমুদ্রে গিয়ে পড়ে।

সাতক্ষীরায় এ ক্যাম্পেইনের গল্পটা শুরু হয়েছিল এ সমীক্ষা থেকেই। GO4IMPact প্রকল্পের আওতায় ওয়েস্ট ফ্লো ডায়াগ্রাম পদ্ধতিতে সাতক্ষীরার বর্জ্যপ্রবাহ মানচিত্র করা হয়। তথ্য মতে: অসংগৃহীত প্লাস্টিকের পরিমাণ বিশাল এবং সমস্যার কেন্দ্রে আছে একক ব্যবহারের প্লাস্টিক।

পরবর্তী প্রশ্ন ছিল: এই প্লাস্টিক যদি সংগ্রহও করা যায়, কে নেবে? কোথায় যাবে? এখানেই আসে উদ্যোক্তার অনুসন্ধান। GO4IMPact খুঁজে বের করে একজন স্থানীয় উদ্যোক্তাকে, যিনি এরই মধ্যে একক ব্যবহারের ও অন্যান্য প্লাস্টিক নিয়ে কাজ করছেন। তার উদ্যোগ: সংগৃহীত প্লাস্টিক থেকে রোপ তৈরি এবং হার্ড প্লাস্টিককে চিপসে রূপান্তর যা পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতের কাঁচামাল।

এরপর তৈরি হলো বিনিময়ের মডেল। পরিবারগুলোকে বলা হলো, প্লাস্টিক আলাদা করে রাখুন, সংগ্রহ কেন্দ্রে নিয়ে আসুন, বিনিময়ে পাবেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। মডেলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—এটি মানুষকে ‘পরিবেশের জন্য করুন’ বলেনি, বলেছে ‘নিজের জন্যও লাভ আছে।’ এবং সেই সঙ্গে একক ব্যবহারের প্লাস্টিকও সংগ্রহের আওতায় এল, যা সাধারণত ভাঙারিওয়ালারা নেন না, কারণ এতে তাদের লাভ কম।

ফলাফল: তিনদিনে তিন টন প্লাস্টিক। সংগৃহীত সবটুকু গেল সরাসরি ওই উদ্যোক্তার কাছে।

বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনার আলোচনায় সাধারণত দুটো পথের কথা আসে: সরকারি নিষেধাজ্ঞা বা অভিযান, অথবা জনসচেতনতামূলক প্রচারণা। দুটোই নিজের জায়গায় সীমিত। সাতক্ষীরার মডেলটি তৃতীয় একটি পথ দেখিয়েছে: সমন্বিত অংশীদারত্ব।

জেলা প্রশাসন ও পৌরসভা করেছে যা তারা সবচেয়ে ভালো পারে: বৈধতা দিয়েছে, স্থান দিয়েছে, নাগরিকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা এনে দিয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তা করেছেন তার কাজ: সংগৃহীত প্লাস্টিক কিনে নিয়ে মূল্যবান পণ্যে রূপান্তর করেছেন। যুব স্বেচ্ছাসেবী দল মাঠে থেকে সংগ্রহ কেন্দ্র পরিচালনা করেছে। আর GO4IMPact করেছে সেতুর কাজ: তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে সঠিক উদ্যোক্তা খোঁজা, পুরো মডেল ডিজাইন করা এবং সব পক্ষকে একটি কার্যকর ব্যবস্থায় আনা।

ফলাফলটি হলো এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে প্রতিটি পক্ষেরই কিছু পাওয়ার আছে এবং কিছু দেয়ার আছে। পরিবার পাচ্ছে নিত্যপণ্য। উদ্যোক্তা পাচ্ছেন বাছাই করা কাঁচামাল। পৌরসভা পাচ্ছে পরিষ্কার এলাকা। পরিবেশ পাচ্ছে কম দূষণ। এ সমন্বয়টাই মডেলের শক্তি।

এ ক্যাম্পেইনের গুরুত্ব কেবল তিন টন প্লাস্টিক সংগ্রহে নয়। GO4IMPact-এর তথ্য বলছে, এ ধরনের অভিজ্ঞতা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পরিচালন ঘাটতি বুঝতে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে পরিকল্পনা ও বাজেটের সঙ্গে যুক্ত করতে সাহায্য করছে। GO4IMPact-এর আওতায় ২৩টি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বাজেট বৃদ্ধি করেছে।

এ সংখ্যার পেছনে আছে ধারণার পরিবর্তন: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আর কোনো বাহ্যিক প্রকল্পের বিষয় নয়, এটি স্থানীয় সরকারের নিজের দায়িত্ব এবং পাঁচ বছরের উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ। সাতক্ষীরার ক্যাম্পেইন সে ধারণা পরিবর্তনের একটি বাস্তব নমুনা।

এ মডেলকে আদর্শ বলাটা ভুল হবে। তিনটি বাস্তব সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, প্রণোদনার খরচ—নিত্যপণ্য দিয়ে প্লাস্টিক কেনার ব্যবস্থাটি বাইরের অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল। স্থায়িত্বের জন্য হয় স্থানীয় সরকারের বাজেটে এটি ঢোকাতে হবে অথবা উদ্যোক্তার কাছ থেকে যথেষ্ট রাজস্ব তৈরি করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, উৎসেই আলাদা করার অভ্যাস—ক্যাম্পেইনের দিন পরিবারগুলো প্লাস্টিক আলাদা করে আনলেও প্রতিদিনের অভ্যাস তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি কাজ দরকার। GO4IMPact এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করেছে—স্কুল থেকে বাজার পর্যন্ত। কিন্তু আচরণ পরিবর্তন ধীর প্রক্রিয়া।

তৃতীয়ত, আনুষ্ঠানিক চুক্তি—পৌরসভা ও বেসরকারি সেবা প্রদানকারীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি সেবা চুক্তি এখনো পূর্ণ রূপ পায়নি। GO4IMPact স্বীকার করছে, পরবর্তী ধাপে এ চুক্তিগুলো শক্তিশালী করাই প্রধান লক্ষ্য।

বাংলাদেশে ক্লাস বি ও ক্লাস সি পৌরসভার সংখ্যা শতাধিক। এদের বেশির ভাগেরই অবকাঠামো সীমিত, বাজেট কম এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা নগণ্য। বড় শহরের জন্য তৈরি সমাধান এখানে কাজ করে না। দরকার এমন মডেল যা কম সম্পদে, স্থানীয় মানুষ ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করতে পারে।

সাতক্ষীরার মডেলটি সেই ছাঁচে ফিট করে। এখানে নতুন কোনো প্রযুক্তি নেই, নেই বিশাল বিনিয়োগ। আছে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, সঠিক উদ্যোক্তাকে চিহ্নিত করা, একটি প্রণোদনা কাঠামো এবং স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রে রেখে কাজ করার দৃষ্টিভঙ্গি। এ উপাদানগুলো অনুকরণযোগ্য।

একটি ক্যাম্পেইন দিয়ে প্লাস্টিক দূষণ সমাধান হয় না। কিন্তু একটি ভালো ক্যাম্পেইন প্রমাণ করতে পারে যে একটি ব্যবস্থা সম্ভব। সাতক্ষীরা সেই প্রমাণটাই দিয়েছে। পরিবার আগ্রহী যদি সুযোগ ও প্রণোদনা থাকে। উদ্যোক্তা প্রস্তুত যদি পরিষ্কার, বাছাই করা কাঁচামাল পাওয়া যায়। পৌরসভা নেতৃত্ব দিতে পারে যদি কাঠামো ও সহায়তা থাকে।

GO4IMPact-এর পরবর্তী লক্ষ্য হলো, এ পরীক্ষার শিক্ষাকে একটি নিয়মিত, স্থায়ী ব্যবস্থায় রূপ দেয়া—পৌরসভা ও সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি তৈরি করা, রিসাইক্লিং চেইন শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো। কারণ লক্ষ্য একটাই: বাইরের সহায়তা কমে গেলেও ব্যবস্থাটি যেন টিকে থাকে।

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমরা প্রায়ই বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রার কথা বলি। কিন্তু সাতক্ষীরার সংগ্রহ কেন্দ্রে দাঁড়ানো সেই পরিবারগুলো—হাতে প্লাস্টিক, বিনিময়ে একটুখানি স্বস্তি—মনে করিয়ে দেয় যে পরিবর্তনের শুরু সবসময় ছোট, সুনির্দিষ্ট ও স্থানীয়। তিনদিনে তিন টন প্লাস্টিক—ছোট সংখ্যা, কিন্তু বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত।