মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চিত্র। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাটির এ অবক্ষয় দীর্ঘমেয়াদে শুধু ফসলের ফলনই কমাবে না, কৃষি উৎপাদনের ব্যয়ও বাড়িয়ে দেবে।
এসআরডিআই নমুনায়ন পদ্ধতিতে দেশের ৫০টি উপজেলার ২৮ হাজার ৯১২টি স্থানের মাটি পরীক্ষা করে এ প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, দেশের ৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ জমি অত্যন্ত তীব্র অম্লীয় ও ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ জমি তীব্র অম্লীয় অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ মোট ৩৯ শতাংশ জমি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যা কৃষি উৎপাদনের জন্য উদ্বেগজনক। এছাড়া ২৪ দশমিক ১১ শতাংশ জমি সামান্য অম্লীয়। অন্যদিকে মাত্র ১৫ দশমিক ৯২ শতাংশ জমির মাটি নিরপেক্ষ অবস্থায় রয়েছে।
মাটির অম্লতা নির্ধারণে ব্যবহার হয় পিএইচ মান। কোনো মাটির পিএইচ ৪ দশমিক ৫-এর নিচে নেমে গেলে তাকে অত্যন্ত তীব্র অম্লীয় বলা হয়। ৪ দশমিক ৬ থেকে ৫ দশমিক ৫ পর্যন্ত মানকে তীব্র অম্লীয় ধরা হয়। কৃষিবিজ্ঞানীদের মতে, মাটির পিএইচ কমে গেলে উদ্ভিদের শিকড়ের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয় এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গ্রহণের ক্ষমতা কমে যায়। ফলে ফসলের বৃদ্ধি ও ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বিভাগভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি অম্লীয় মাটি রয়েছে সিলেট বিভাগে। সেখানে ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ জমি অত্যন্ত তীব্র ও ৫৭ দশমিক ৬২ শতাংশ জমি তীব্র অম্লতায় আক্রান্ত। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে রংপুর বিভাগ, যেখানে ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ জমি অত্যন্ত তীব্র ও ৫২ দশমিক ৯১ শতাংশ জমি তীব্র অম্লীয়। ঢাকা বিভাগেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক; সেখানে ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ জমি অত্যন্ত তীব্র ও ৪৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ জমি তীব্র অম্লতায় আক্রান্ত। তুলনামূলকভাবে খুলনা ও বরিশাল বিভাগে তীব্র অম্লতার হার কম হলেও সেখানে ক্ষারীয় মাটির উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাটির অম্লতা বৃদ্ধির পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় কারণ কাজ করছে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে মাটি থেকে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষারীয় উপাদান ধুয়ে যায়। পাশাপাশি অধিক মাত্রায় ইউরিয়া ও সালফার সার ব্যবহারের ফলে মাটির অম্লতা দ্রুত বাড়ে। কৃষি উৎপাদন বাড়াতে নিবিড় চাষাবাদ এবং বছরে একাধিক ফসল উৎপাদনের প্রবণতাও এ সমস্যাকে আরো তীব্র করছে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আমীর মো. জাহিদের মতে, মাটির পিএইচ ৫ দশমিক ৫ বা তার নিচে নেমে গেলে চুন প্রয়োগের মাধ্যমে অম্লতা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন। সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে অম্লীয় মাটির প্রভাব সরাসরি ফসল উৎপাদনে পড়ে। মাটির অম্লতা বৃদ্ধির আরেকটি বড় প্রভাব হলো মাটির জৈবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। অ্যালুমিনিয়াম ও আয়রনের মতো কিছু উপাদান তখন বিষাক্ত রূপ ধারণ করতে পারে। একই সঙ্গে উপকারী অণুজীবের কার্যক্রম কমে যায়, যা মাটির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
এসআরডিআইয়ের প্রতিবেদনে আরো উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে মাটির জৈব পদার্থ বা অর্গানিক ম্যাটারের ক্ষেত্রে। দেশের ১৫ দশমিক ৪০ শতাংশ জমিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি খুবই নিম্ন এবং ৪২ দশমিক ৬৯ শতাংশ জমিতে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৫৮ শতাংশ জমি জৈব পদার্থের ঘাটতিতে ভুগছে। বিপরীতে মাত্র ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ জমিতে জৈব পদার্থের উপস্থিতি উচ্চ এবং ১ দশমিক ২৭ শতাংশ জমিতে অতি উচ্চমাত্রায় পাওয়া গেছে। মাটির জৈব পদার্থ মাটির প্রাণশক্তির অন্যতম উৎস। এটি মাটির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়, পুষ্টি উপাদান ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং উপকারী অণুজীবের কার্যক্রমকে সক্রিয় রাখে। জৈব পদার্থ কমে গেলে মাটির গঠন দুর্বল হয়ে পড়ে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু জৈব পদার্থ নয়, প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতিও বাড়ছে।










