সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়া, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, খরা ও নদীভাঙনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা বিপন্ন হচ্ছে। কিন্তু জলবায়ু সহনশীলতা ও দুর্যোগ মোকাবেলার আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো প্রায় উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে—যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার (এসআরএইচআর)।
জলবায়ুজনিত দুর্যোগ সবার ওপর সমান প্রভাব ফেলে না। নারী, কিশোরী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষত মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে দীর্ঘ সময় (তিন মাস বা তারও বেশি) অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রে বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করতে বাধ্য হয়। তখন তাদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা বিলাসিতা নয়, বরং জীবনরক্ষাকারী জরুরি সেবা। গর্ভবতী নারীর নিরাপদ মাতৃসেবা ও জরুরি প্রসূতি সহায়তা প্রয়োজন হয়। কিশোরীদের প্রয়োজন মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও পরামর্শসেবা। লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতায় ভুক্তভোগীদের চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা ও সুরক্ষাও অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা, যৌনবাহিত সংক্রমণ প্রতিরোধ, নিরাপদ প্রসব ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।
দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের সঙ্গে কীভাবে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার সেবাকে কার্যকরভাবে একীভূত করা যায় তা দেখিয়েছে। ঘূর্ণিঝড় রিমালের পর খুলনার দাকোপ ও পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় পপুলেশন সার্ভিসেস অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (পিএসটিসি) জরুরি মানবিক এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দেয়। এ সেবায় নারী, কিশোরী ও যৌনকর্মীদের মতো ঝুঁকিতে থাকা এবং অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। একইভাবে কুমিল্লা, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে আকস্মিক বন্যার পর পিএসটিসি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম, মানসিক সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেয়। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে দুর্যোগ-পরবর্তী মানবিক সহায়তা কেবল খাদ্যসহায়তা ও আশ্রয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্তদের মর্যাদা, স্বাস্থ্য অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে পিএসটিসি তার ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড অ্যাডাপ্টেশন (সিসিএ) উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবেশগত স্বাস্থ্য উন্নয়নে কাজ করে আসছে। সংস্থাটি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিবেশগত ঝুঁকি হ্রাস এবং সহনশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিউনিটি-ভিত্তিক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে। সংস্থাটির উল্লেখযোগ্য উদ্যোগের মধ্যে প্রোমোটিং এনভায়রনমেন্টাল হেলথ ফর আরবান পুওর প্রকল্প (পিইএইচইউপি) একটি। এ প্রকল্প ঢাকা সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বাস্তবায়ন হয়। প্রকল্পটির মাধ্যমে অতিবৃষ্টি ও জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ক্রমবর্ধমানভাবে যুক্ত জলাবদ্ধতার সমস্যা মোকাবেলায় কাজ করা হয়। ঢাকার দোলাইরপাড় বস্তিতে সংস্থাটি ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত করে এবং আশপাশের ফুটপাত উন্নয়ন করে, ফলে ঘন ঘন বন্যা ও জলাবদ্ধতার প্রভাব মোকাবেলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
পিএসটিসি আরো বাস্তবায়ন করেছে ফিচারিং গ্রিন আর্থ প্রজেক্ট, যা ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত ওয়ার্ডগুলোয় পরিচালিত হয়। এ প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশগত স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, যেমন বস্তি ও সড়কপথের পাশে বৃক্ষরোপণ, ছাদবাগান ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আর্থ ক্লাবসের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব তুলার ব্যাগ ব্যবহারের প্রচলন, কমিউনিটি-নেতৃত্বাধীন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উদ্যোগ, এবং পরিবেশবান্ধব উপকরণ ব্যবহার করে নারীবান্ধব স্নানাগার নির্মাণ।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, জলবায়ুসম্পর্কিত দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পিএসটিসি ২০২৪ সালে সাইক্লোন রিমাল এবং ইস্টার্ন ফ্লাডসের পর জরুরি সাড়া প্রদান করে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো বিশেষ করে বাণিশান্তা, নোয়াখালী এবং লক্ষ্মীপুরে জরুরি স্বাস্থ্য ক্যাম্প পরিচালনা করা হয়, যেখানে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা দেয়।
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পিএসটিসি বাণিশান্তায় প্রান্তিক ও ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর জন্য কি পপুলেশন ক্লিনিক (কেপি ক্লিনিক) স্থাপন করেছে, যা জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ একটি উপকূলীয় এলাকা। এছাড়া সংস্থাটি যশোরে একটি কি পপুলেশন ক্লিনিক (কেপি ক্লিনিক) পরিচালনা করছে, যেখানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার জোরদার করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পিএসটিসি বাংলাদেশজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে অব্যাহতভাবে অবদান রেখে চলেছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনায় এখনো এসআরএইচআর যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ত্রাণ কার্যক্রম খাদ্য, আশ্রয় ও অবকাঠামো পুনর্গঠনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে নারী ও কিশোরীরা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ, বাল্যবিবাহ, যৌন নির্যাতন, অনিরাপদ প্রসব ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে।
বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও সহনশীলতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এরই মধ্যে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ক্রমবর্ধমান তীব্রতা ও ঘনত্ব আমাদের আরো সমন্বিত এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে, যেখানে জলবায়ু কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য অধিকার।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে আমাদের উপলব্ধি করতে হবে জলবায়ু ন্যায়বিচার কখনো পূর্ণতা পাবে না, যদি তার সঙ্গে স্বাস্থ্য ন্যায়বিচার ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিত না হয়। পরিবেশ রক্ষা মানে কেবল গাছপালা ও প্রকৃতি রক্ষা নয়; বরং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্য অধিকার সংরক্ষণও।
সরকার, উন্নয়ন সহযোগী, মানবিক সংস্থা ও নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে, যাতে দুর্যোগকালীন এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুত পরিস্থিতিতেও নিরবচ্ছিন্ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য এবং অধিকার সেবা নিশ্চিত করা যায়। জলবায়ু সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা, যুববান্ধব সহায়তা ও কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ এখন আর বিকল্প নয়—এটি সময়ের দাবি।
জলবায়ু পরিবর্তন যখন প্রতিনিয়ত মানুষের জীবনকে নতুনভাবে বিপন্ন করছে, তখন আমাদের প্রতিক্রিয়াও হতে হবে মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অধিকারভিত্তিক। কোনো নারী, কিশোরী বা ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ যেন দুর্যোগের কারণে স্বাস্থ্যসেবা, সুরক্ষা ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত না হয়; সেই অঙ্গীকারই হোক এবারের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল বার্তা। এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার।





