দেশ এরই মধ্যে প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে আর্থিকভাবে টেকসই উপায়ে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এ পরিস্থিতিতে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা অর্জনে বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে রয়েছে।

এ খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশে মোট গ্যাসের প্রায় ৩০ শতাংশ, তেলের ৯৫ ও কয়লার ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানির দামে যে ধাক্কা লেগেছে, তা দেশের আর্থিক চাপকে আরো জোরালো করে তুলেছে। বর্তমানে জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ দশমিক ১ শতাংশ, যা আমদানি ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো বাড়ছে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অতীতের ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তিগুলোও আর্থিক চাপ বাড়াচ্ছে। এগুলো কোনো সাময়িক সংকট নয়; বরং বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাই সামনে তুলে ধরছে।

তবে ইতিবাচক দিক হলো, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে বাংলাদেশের উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে তা বাস্তবায়নে একটি সুস্পষ্ট ও কার্যকর পথনকশাও।

এক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, জ্বালানি খাতের আর্থিক সক্ষমতা পুনরুদ্ধার এবং শুল্ক ও মূল্যহার সংস্কার এখন সবচেয়ে জরুরি। ব্যয় পুনরুদ্ধারে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল সরকারের আর্থিক চাপ কমাতে সহায়তা করবে।

দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের মাধ্যমে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির অবদান ৫ শতাংশের নিচে। ২০৩০ সালের মধ্যে এটিকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে দ্ব্যর্থহীনভাবে এগিয়ে যেতে হবে বাংলাদেশকে। একই সঙ্গে ভুটান ও নেপাল থেকে জলবিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ রয়েছে, যার ব্যয় দেশীয় উৎপাদনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক। এটি সাশ্রয়ী জ্বালানির একটি সম্ভাবনাময় উৎস হতে পারে।

তৃতীয়ত, দক্ষতা বৃদ্ধি, সিস্টেম লস কমানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার মতো প্রয়োজনীয় নমনীয়তা অর্জনে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর আধুনিকায়ন জরুরি।

চতুর্থত, গ্যাসের ভ্যালু চেইন, সঞ্চালন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বড় পরিসরে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বেসরকারি খাত ও বেসরকারি অর্থায়নের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের রূপান্তর সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে বিশ্বব্যাংক এ যাত্রায় দেশটির পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।